প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ছেলেবেলা থেকে তিলির (ছদ্মনাম) স্বপ্ন ছিল সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার। স্বপ্নের পথে তিনি এগিয়েও গিয়েছিলেন, ভর্তি হয়েছিলেন যুক্তরাজ্যের আর্মি ফাউন্ডেশন কলেজ-এএফসিতে।
কিন্তু সেই প্রিয় ক্যাম্পাসেই তার স্বপ্ন সারাজীবনের দুঃস্বপ্নে বদলে গেল। সহকর্মী সেনা সদস্যের দ্বারা কয়েক ঘণ্টা ধরে গণধর্ষণের শিকার হওয়ার পর তিলির স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
বিবিসির অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে আর্মি ফাউন্ডেশন কলেজ-এএফসি’তে ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন এবং নারী বিদ্বেষী আচরণের ধারাবাহিক বিবরণ। যুক্তরাজ্যের তরুণদের অন্যতম বৃহত্তম সেনা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি যেন নারী নির্যাতন আর নারী বিদ্বেষের আখড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জুনিয়র সেনা এবং কলেজের স্টাফ সদস্যদের বিরুদ্ধে পদ্ধতিগত নারীবিদ্বেষ এবং যৌন সহিংসতার অভিযোগ উঠে এসেছে। নর্থ ইয়র্কশায়ারের হ্যারোগেটে অবস্থিত আর্মি ফাউন্ডেশন কলেজে গত পাঁচ বছরে যোগ দেওয়া অন্তত চারজন নারী বিবিসি-কে জানিয়েছেন, ১৭ বছর বয়সে তারা গণধর্ষণ, যৌন হয়রানি এবং গুপ্তকামিতার শিকার হয়েছিলেন। সেনাবাহিনী ছেড়ে দেওয়া এই নারীদের সকলেই বিবিসিকে জানিয়েছেন, এই যুদ্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারীবিদ্বেষ এবং যৌন সহিংসতার একটি বিপজ্জনক সংস্কৃতি রয়েছে, যা স্টাফ সদস্যরা উৎসাহিত করে থাকেন।
তিলি সেই ঘটনার স্মৃতিচারণ করে বলেন, “তারা বলছিল, ‘তুমি কি রুমে আসবে?’ আর আমি ১৭ বছর বয়সী এক সরল মেয়ে হওয়ায় বলেছিলাম, ‘হ্যাঁ, ঠিক আছে।’ রুমে যেতেই তারা আমার পোশাক খুলতে শুরু করে। এরপর এমন সব আচরণ করতে থাকে, যাতে আমার কোনো সম্মতি ছিল না। সেখানে অনেক মানুষ ছিল। তারা আমার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় স্পর্শ করে, আপত্তিকর মন্তব্য করে এবং মেয়ে হিসেবে দেখার বদলে একটি ‘বস্তু’ হিসেবে আখ্যা দেয়। এরপর আমি ধর্ষিত হই আমারই সমবয়সী একাধিক জুনিয়র সেনা সদস্যের দ্বারা। এটা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে চলেছিল। নিজেকে আমার একদলা মাংসের টুকরো মনে হচ্ছিল।”
ঘটনার দুই সপ্তাহ পরেই তিলি সেনাবাহিনী ত্যাগ করেন। তিলি আরো বলেন, “আমি সেখানে আর থাকতে পারছিলাম না। আমি আমার মায়ের সাথে কথা বলি এবং তিনি বলেন, ‘তোমার চাকরি ছেড়ে দেওয়া উচিত।’ আমি যদি সেখানে থাকতাম, তবে বাকি কর্মজীবনে আমি কেবল এমন এক মেয়ে হিসেবে পরিচিত হতাম, যে কিনা অনেক মানুষের সাথে শারীরিক সম্পর্ক করেছে। অথচ বাস্তবে তো তা ঘটেনি।”
তিলির অভিযোগ, একাডেমির কিছু পুরুষ ইন্সপেক্টরের মাধ্যমে নারীদের প্রতি এই ধরনের লিঙ্গবৈষম্যমূলক মনোভাবকে উৎসাহিত করা হয়। তিলি মনে করতে পারেন যে, তিনি ধর্ষিত হওয়ার পর একজন ইন্সপেক্টরকে চারদিকে ঘুরে ঘুরে বলতে শুনেছিলেন, ‘তোমরা কি সেই লম্পট মেয়েটার কথা শুনেছ, যে এই সব ছেলেদের সাথে শুয়েছে?’
তিলি বলেন, ‘একজন ইন্সপেক্টরের কাছ থেকে এমন মন্তব্য আসা অত্যন্ত অন্যায়। এটি নারীদের সম্পর্কে ভুল বার্তা দেয় এবং ছেলেদের এই মানসিকতা শেখায় যে, আমরা কেবল একটি কাজের জন্যই উপযুক্ত।’ সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, পুলিশের কাছে ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের করেও বিচার পাননি তিলি।
এএফসি হলো যুক্তরাজ্যের অনূর্ধ্ব-১৯ বয়সীদের জন্য সবচেয়ে বড় সামরিক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান। এই যুদ্ধ বিদ্যালয়টি সেনাবাহিনীর ১৬ বছর বয়সী সব রিক্রুটদের প্রশিক্ষণ দেয়। বর্তমানে এএফসিতে মোট ৮৮৯ জন প্রশিক্ষণার্থী রয়েছেন, এর মধ্যে অন্তত ৭০ জন নারী।
তিলি একা এমন পরিস্থিতির শিকার নন। মনিকা (ছদ্মনাম) অভিযোগ করেন, এক সহকর্মী সেনা সদস্য তাকে একটি রুমে আটকে রেখে তার ওপর চড়াও হয়েছিল। স্মৃতিচারণ করে মনিকা বলেন, ‘সে দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল, যাতে আমি বাইরে বের হতে না পারি। এরপর সে আমার শরীরের ওপর চেপে বসে। আমার মুখে চুমু খেতে শুরু করে এবং আমার সারা শরীরে হাত দেয়। সে আমাকে যৌন নিপীড়ন করেছিল। আমি কোনোমতে তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে সক্ষম হই। সে অত্যন্ত শক্তিশালী হওয়ায় আমি নিশ্চিত নই যে কীভাবে আমি তা পেরেছিলাম।’ চিকিৎসাজনিত কারণে এএফসি ছাড়তে হয়েছিল মনিকাকে, এখন সেটা তার কাছে স্বস্তিদায়ক মনে হচ্ছে।
অ্যামির (ছদ্মনাম) গল্পটি বিবিসিকে জানিয়েছেন তার মা চেরিল। তার ভাষ্যমতে, তার মেয়ে ট্রেনিং চলাকালে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছিল এবং প্রায় প্রতিদিন তাকে যৌন হয়রানির মুখোমুখি হতে হতো। চেরিল জানান যে, অ্যামির রুমের তালাটি নষ্ট ছিল। যার কারণে পুরুষ সেনা সদস্যদের ভেতরে ঢোকা বন্ধ করতে অ্যামি দরজার সামনে আড়াআড়িভাবে ঘুমাতো। এছাড়া অ্যামি স্টাফদের কাছ থেকে নারীবিদ্বেষী মৌখিক গালিগালাজের শিকারও হতো। চেরিল বলেন, ‘অ্যামি যখন করিডোরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকত, তখন তাকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করে চরম লম্পট বা চরিত্রহীন বলে গালি দেওয়া হতো। অ্যামিকে বলা হয়েছিল, ‘প্রতি বছরই এমন একজন থাকে যাকে সবাই পেতে চায়। দেখে মনে হচ্ছে এবছর তুমিই সেই জন।’
এলি (ছদ্মনাম) নামে আরেকজন কলেজের দুঃসহ দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে বিবিসিকে বলেন, ‘কলেজে তার প্রথম সপ্তাহেই একজন ইন্সপেক্টর রিক্রুটদের এক দলকে বলেছিলেন- সবকিছুই মেয়েদের শরীরকেন্দ্রিক এবং তোমরা এর কতটা ভোগ করতে পারো সেটাই আসল।’ তিনি জানান যে, ‘স্টাফ মেম্বাররা মেয়েদের চেহারার ওপর ১০-এর মধ্যে নম্বর দিত এবং কোনো নক করা ছাড়াই তাদের ডরমিটরিতে ঢুকে পড়ত, যেখানে আমরা হয়তো শুধু অন্তর্বাস পরা অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতাম, আর তারা কেবল তাকিয়ে থাকত।’ এলি বলেন, এএফসি-তে যা ঘটেছিল, তা তাকে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে যে সেনাবাহিনীর কর্মজীবন তার জন্য নয়।
এই মর্মান্তিক বিবরণগুলো ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এর আগে বিষয়টির ওপর দেশটির প্রথম অফিশিয়াল জরিপে দেখা গেছে যে, ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীতে কর্মরত প্রায় ৬৭ শতাংশ নারী গত এক বছরে পুরুষ সহকর্মীদের দ্বারা অন্তত একবার অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন আচরণের শিকার হয়েছেন। এএফসি-এর কার্যক্রম নিয়ে বিবিসির অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে, জুন মাস পর্যন্ত গত এক বছরে নর্থ ইয়র্কশায়ার পুলিশ কলেজটির সাথে সংশ্লিষ্ট ১৬টি যৌন অপরাধের প্রতিবেদন পেয়েছে।
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের জুন মাসের মধ্যে এই কলেজে অনুপযুক্ত যৌন আচরণের মোট ১৭৬টি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল; যার মধ্যে ৩২টি স্থায়ী স্টাফদের বিরুদ্ধে এবং ১৪৪টি জুনিয়র সৈন্যদের বিরুদ্ধে। গত পাঁচ বছরে, এএফসি-র বেশ কয়েকজন ইন্সপেক্টর সামরিক আদালতে শারীরিক ও যৌন সহিংসতার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। এক সহকর্মীকে ঘুমন্ত অবস্থায় ধর্ষণ করার অপরাধে ২০২৩ সালে কর্পোরাল ড্যানিয়েল কনওয়ে সাত বছরেরও বেশি মেয়াদের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। একই বছর, করপোরাল সাইমন বার্ট্রাম যৌন নিপীড়নের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন এবং তাকে ২০ মাসের সামরিক আটকাদেশ দেওয়া হয়।
বিবিসি-কে দেওয়া এক বিবৃতিতে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর একজন মুখপাত্র যৌন সহিংসতার এই প্রতিবেদনগুলোকে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং গুরুতর’ বলে অভিহিত করেছেন। সেনাবাহিনীর মুখপাত্র বলেন, ‘আমাদের সশস্ত্র বাহিনীতে অগ্রহণযোগ্য এবং অপরাধমূলক আচরণের কোনো স্থান নেই। মানুষ একটি চমৎকার কর্মজীবনের আশায় এখানে যোগ দেয় এবং এ ধরনের যেকোনো অভিযোগ অগ্রহণযোগ্য।’
মুখপাত্র এ ধরনের ঘটনার শিকার বা প্রত্যক্ষদর্শীদের এগিয়ে এসে অভিযোগ করার আহ্বান জানান।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন