প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দেশভাগের পর দীর্ঘ ৭০ বছর বন্ধ থাকার পর অবশেষে সচল হলো বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক নৌপথ। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের ডিব্রুগড় থেকে নদীপথে সরাসরি বাংলাদেশে পণ্য আসা শুরু হয়েছে। স্বাধীনতার পর এই প্রথম উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যটি থেকে নদীপথে কোনো পণ্যবাহী জাহাজ সরাসরি বাংলাদেশের বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। এর ফলে দুই দেশের বাণিজ্য খাতে এক নতুন যুগের সূচনা হলো।
গত ৫ অক্টোবর ব্রহ্মপুত্র নদের বগিবিল টার্মিনাল থেকে ৫৪০ মেট্রিক টন মিথানল নিয়ে একটি কার্গো জাহাজ (বার্জ) বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। আসাম সরকারের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘আসাম পেট্রো-কেমিক্যালস লিমিটেড’ (এপিসিএল)-এর নামরুপ কারখানায় এই মিথানল তৈরি করা হয়েছে। ‘ডিএলবি পাটকাই’ নামের এই বড় জাহাজটিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ‘কুশল কোঁয়র’ নামের একটি শক্তিশালী টাগবোট (টানা-জাহাজ)।
ভারতের বন্দর, নৌপরিবহন ও জলপথ মন্ত্রণালয় এই যাত্রাকে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছে। একই সাথে এই যাত্রার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের একটি বড় পরীক্ষাও হয়ে যাচ্ছে— ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে বিশ্বের অন্যান্য বাজারে পণ্য পাঠানোর জন্য ব্রহ্মপুত্র নদ বাণিজ্যিকভাবে কতটা লাভজনক ও সাশ্রয়ী রুট হতে পারে।
এই প্রথম ডিব্রুগড় থেকে উৎপাদিত কোনো বাণিজ্যিক পণ্য এই নৌ-পথ ব্যবহার করে বাংলাদেশে আসছে। আসল পরীক্ষাটি এখন এখানেই, ‘ভারত-বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ ট্রানজিট ও বাণিজ্য প্রটোকল’-এর আওতায় এই রুটটি ব্যবসায়ীদেরকে নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য পৌঁছানোর নিশ্চয়তা এবং সাশ্রয়ী খরচ দিতে পারবে কি না।
পুরোনো নদীপথ আবার চালু
পণ্যবাহী কার্গো জাহাজটি ভারতের ব্রহ্মপুত্র নদীর ২ নম্বর জাতীয় নৌ-পথ ধরে প্রায় ৭৬৮ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে পৌঁছবে। এরপর সেখান থেকে ভারত-বাংলাদেশ প্রোটোকল রুট ধরে জাহাজটি তার যাত্রা অব্যাহত রাখবে। এরপর ভারত-বাংলাদেশ প্রোটোকল রুট ধরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এগিয়ে যাবে। বগিবিল থেকে বাংলাদেশের পানগাঁও পর্যন্ত মোট দূরত্ব প্রায় ১ হাজার ৩শ কিলোমিটার।
উল্লেখ্য, ভারতের অভ্যন্তরীণ নদী-বন্দর কর্তৃপক্ষ (আইডব্লিউএআই) আসামের সাদিয়া থেকে বাংলাদেশ সীমান্ত পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র নদের ৮৯১ কিলোমিটার দীর্ঘ অংশটিকে 'জাতীয় নৌপথ-২' হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
দেশভাগ কীভাবে আসামকে বিচ্ছিন্ন করেছিল।
এই যাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ডিব্রুগড়ের হারিয়ে যাওয়া নদীবাণিজ্যের ইতিহাসও। একসময় ব্রহ্মপুত্রের ঘাট ঘিরে পণ্য পরিবহণের ব্যস্ততা ছিল। বিশেষ করে চা পরিবহণে নদীপথের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। পরে সেই বাণিজ্য ক্রমে রেলপথের দিকে সরে যায়। শেষ পর্যন্ত ১৯৫৬ সালে ডিব্রুগড়ের পুরনো নদীঘাট বন্ধ হয়ে যায়।
হারানো সংযোগ ফিরে পেল বাংলাদেশ-আসাম নৌপথ।
আসামের জন্য বাংলাদেশ একই সাথে একটি বড় বাজার এবং বিশ্বের অন্যান্য বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়ার সহজ ট্রানজিট পথ হতে পারে।
বাংলাদেশের এই নৌপথগুলো ব্রহ্মপুত্র নদকে দক্ষিণের সমুদ্রবন্দরগুলোর সাথে সরাসরি যুক্ত করেছে।
এর ফলে শিলিগুড়ি করিডোর (চিকেনস নেক) দিয়ে সড়ক ও রেলপথে সমস্ত পণ্য পশ্চিমবঙ্গে পাঠানোর ওপর নির্ভরতা কমবে এবং একটি চমৎকার বিকল্প পথ তৈরি হবে। আর ‘ভারত-বাংলাদেশ প্রোটোকল রুট’ দুই দেশের জাহাজগুলোর জন্য এই নির্ধারিত পথ ব্যবহারের একটি আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করে দিয়েছে।
আসামের নতুন দরজা
হিমন্ত বিশ্বশর্মা এই ঘটনাকে অসমের জন্য গর্বের মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল নামরূপে উৎপাদিত পণ্য ব্রহ্মপুত্র বেয়ে সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে যাওয়ার বিষয়টি।
উত্তরপূর্ব ভারতকে পূর্বাঞ্চলের দেশগুলির সঙ্গে ভারতের যোগাযোগের প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার বৃহত্তর সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গেও এই উদ্যোগকে যুক্ত করা হয়েছে।
তবে পরিকল্পনার সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে নিয়মিত বাণিজ্যিক পরিষেবা কতটা কার্যকর হয়, তার উপর।
আগেও নজির
ব্রহ্মপুত্র ও বাংলাদেশের নৌপথ ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের নজির অবশ্য একেবারে নতুন নয়।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের জলপথ হয়ে টাটা স্টিলের পণ্যবাহী বার্জ পান্ডুতে পৌঁছেছিল। ২০২৩ সালে বারাণসী থেকে ডিব্রুগড় যাওয়ার পথে বাংলাদেশ অতিক্রম করেছিল পর্যটকবাহী ‘এমভি গঙ্গা বিলাস’।
তবে ৫ অক্টোবরের যাত্রার বিশেষত্ব হল—অসম থেকে বিদেশি বন্দরের উদ্দেশে সরাসরি বাণিজ্যিক পণ্য পাঠানো।
খরচ কমবে
এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা বিকল্প পরিবহণ পথ তৈরি করা।
নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য নৌপরিষেবা চালু হলে উৎপাদকরা পণ্য পাঠানোর সময়, খরচ এবং পরিমাণ বিবেচনা করে পরিবহণের সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। বাংলাদেশের ক্রেতাদের সঙ্গে অসমের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলির সরাসরি সরবরাহ-সম্পর্কও শক্তিশালী হতে পারে।
ফিরতি পথেও পণ্য পরিবহণের সুযোগ তৈরি হলে নৌপথটি আরও অর্থনৈতিক ভাবে কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।
তবে সেই সম্ভাবনা বাস্তবে কতটা কাজে আসে, তা বোঝার জন্য একটি চালান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ধারাবাহিক পরিষেবা এবং তার বাস্তব অভিজ্ঞতা।
শুরুটাই আসল
তাহলে সোমবারের যাত্রার ঐতিহাসিক গুরুত্বের পাশাপাশি নজর থাকবে আরও কয়েকটি বিষয়ের দিকে—বিমান নয়, নৌপথে এই পণ্য পৌঁছতে কত সময় লাগে, খালাসের প্রক্রিয়া কতটা মসৃণ হয় এবং পরবর্তী চালান কত দ্রুত শুরু হয়।
একটি কার্গো রওনা দিয়েছে। এখন লক্ষ্য সেই একক যাত্রাকে নিয়মিত বাণিজ্যপথে পরিণত করা।
সেই ধারাবাহিকতা তৈরি হলে ব্রহ্মপুত্র শুধু অসমের নদী হয়ে থাকবে না—রাজ্যের শিল্প এবং বাংলাদেশের বাজারের মধ্যে আরও কার্যকর বাণিজ্যিক সেতু হয়ে উঠতে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন