প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দেশের পৌনে চার কোটি মানুষ বর্তমানে কর্মব্যস্ত রয়েছেন, তবে তাদের মধ্যে বিশাল একটা অংশ জড়িয়ে আছেন কেনাবেচা অথবা সাধারণ চাকরির মতো সেবা খাতে। এর বিপরীতে, বাংলাদেশের উৎপাদন শিল্প বা কারখানার কার্যক্রম চলছে অত্যন্ত ধীর গতিতে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ অর্থনৈতিক শুমারি এমন তথ্য প্রকাশ করেছে যা অর্থনীতিবিদদের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিবিএসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানের ৯১.২৩ শতাংশই এখন একচ্ছত্রভাবে সেবা খাতের অধীনে, যেমন দোকানপাট, শোরুম, আইটি, হোটেল-রেস্তোরাঁ। অপরদিকে, পণ্য উৎপাদনের প্রকৃত কারখানা বা ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের অবদান মাত্র ৮.৭৭ শতাংশ। একসময় যে অর্থনীতি কৃষি বা অনুচ্চ উৎপাদন খাতের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়েছিল, তা আজ নাটকীয়ভাবে চলে গেছে সেবা খাতের দখলে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, কেন আমাদের তরুণ উদ্যোক্তারা স্থায়ী কারখানা স্থাপন করার চেয়ে দোকান খুলতে বা চাকরির দিকে বেশি ঝুঁকছেন? আমাদের আগামী দিনের অর্থনীতি শুধুই কেনাবেচার প্রেক্ষাপটে থাকবে কি? কী হবে এই ২০ কোটি মানুষের বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ?
অর্থনীতির এই পরিবর্তনের পেছনে প্রকৃত কোনো প্রাকৃতিক অর্থনৈতিক বিকাশ নেই বরং এটি প্রাতিষ্ঠানিক একটি গভীর হতাশার চিত্র তুলে ধরে। আসলে, একটি দেশের শিল্পায়নের পথের সবচেয়ে বড় বাধা হলো সর্বগ্রাসী দুর্নীতি ও চরম অব্যবস্থাপনা। লাইসেন্স পাওয়ার জটিলতা, আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য, গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র সংকট এবং ঘুষের চাহিদা যখন কোনো কারখানা প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকেই বিনষ্ট করে দেয়, তখন উদ্যোক্তাদের বাধ্য হয়ে পিছু হটতে হয়; কখনও বা তারা মাঝপথে প্রকৃত পুঁজির সঙ্গে তাঁদের স্বপ্ন সবই হারিয়ে যান।
এই প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম ও নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে দেশে দীর্ঘমেয়াদি ও ভারী শিল্প গড়ে উঠছে না। তরুণ উদ্যোক্তারা উচ্চ পুঁজির বিনিয়োগের ঝুঁকি নেওয়ার পরিবর্তে কম পুঁজি দিয়ে দ্রুত মুনাফার সহজ পথ হিসেবে সেবা খাতের দিকে ঝুঁকছেন। দুর্নীতির এই সর্বগ্রাসী বিপর্যয় উস্কে দিতে পারছে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গঠনের ব্যর্থতা, যা আমাদের অজানা উদ্বেগের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
উন্নয়ন অর্থনীতির ক্লাসিক্যাল মডেল বা ফিশার-ক্লার্ক থিসিস অনুযায়ী, একটি দেশের অর্থনীতি স্বাভাবিক নিয়মে কৃষি থেকে প্রথমে শিল্পে এবং শিল্প খাতের হাত ধরে উন্নত সেবা খাতে সরে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশ এখন উল্টো রথে চড়ে চলেছে। শিল্পের পূর্ণ বিকাশ ঘটার আগেই অর্থনীতি সরাসরি সেবা খাতে লাফ দিয়েছে।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ ড্যানি রড্রিক এই অবস্থাকে ‘অকাল ডি-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন’ বা অসময়ে শিল্পায়নের স্থবির হয়ে যাওয়ার নাম দিয়েছেন। তিনি তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, যখন কোন উন্নয়নশীল দেশ পর্যাপ্ত শিল্পায়ন ছাড়াই সম্পূর্ণভাবে সেবা খাতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন এটি একদিকে অর্থনীতিকে সাময়িকভাবে প্রাণবন্ত মনে হলেও অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে ‘মধ্যম আয়ের ফাঁদে’ পড়ার প্রবল ঝুঁকি তৈরি করে। কারণ সেবা খাত মূলত অভ্যন্তরীণ চাহিদার ওপর নির্ভরশীল, ফলে এটি দেশের টেকসই অর্থনৈতিক ভিত্তিকে দিন দিন দুর্বল করে ফেলছে।
কারখানার পরিবর্তে দোকানপাটের আধিক্য আমাদের অর্থনীতিতে উৎপাদনশীলতার স্থবিরতা সৃষ্টি করছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থনৈতিক পলিসি পেপারের তথ্য অনুযায়ী, কারখানায় প্রযুক্তির ব্যবহারে উৎপাদন এক লাফে ১০ গুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব, কিন্তু সেবা খাতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করার সুযোগ অত্যন্ত কম।
শিল্প খাত মূলত পণ্য উৎপাদন করে, যা বিদেশে রপ্তানি করে দেশের জন্য মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার আয় করে। অন্যদিকে, আমাদের সেবা খাতের অধিকাংশই অ-রপ্তানিযোগ্য অভ্যন্তরীণ সেবা, যা দেশের মধ্যকার অর্থনৈতিক চক্রের ঘুরপাক খায়। ফলে, দীর্ঘমেয়াদে দেশ বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতি এবং সর্বগ্রাসী মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিতে পড়ে, যা আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) তাদের প্রতিবেদনে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেছে।
দেশের কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের নাজুক কাঠামোগত দুর্বলতার চিত্র বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডি-র সম্মানীয় ফেলো ও আত্নবিশ্বাসী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমানের বিশ্লেষণেও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি মনে করেন, আমাদের কর্মসংস্থানের বড় একটি সমস্যা হলো, নারীদের একটি বড় অংশ এবং বিপুলসংখ্যক বেকার ও প্রশিক্ষণহীন তরুণ শ্রমশক্তি এখনও কর্মসংস্থানের বাইরে রয়ে গেছেন। আবার, যারা কাজ করছেন, তাদের মধ্যে খাতের ভারসাম্যের অভাব রয়েছে। যদিও দোকানপাট বা সেবা খাত সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় নয়, তবে আমাদের ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের মাত্র নামমাত্র অবদান দেশের শিল্পায়নের একটি বড় দুর্বলতা বিশেষ করে প্রসঙ্গটিতে।
সবচেয়ে বড় সংকট ও অসঙ্গতি দৃশ্যমান হচ্ছে আমাদের অর্থনীতির শুরুতে ভিত্তি কৃষি খাতে। অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান উল্লেখ করেছেন, দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ এখনো কৃষিতে কাজ করছেন, তবে জাতীয় আয়ে এ খাতের অবদান মাত্র ১২ শতাংশ। এর সরল অর্থ হলো, কৃষিতে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি মানুষ নিয়োজিত হওয়ায় শ্রমের উৎপাদনশীলতা মারাত্মকভাবে নিম্নমানের, অর্থাৎ এখানে এক বিশাল ‘প্রচ্ছন্ন বেকারত্ব’ বা ছদ্ম বেকারত্ব উপস্থিত রয়েছে।
এই বন্ধ্যাত্ব কাটাতে হলে আমাদের মূল ভিত্তি অর্থাৎ কৃষিজাত পণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণের পাশাপাশি আধুনিক কৃষিভিত্তিক শিল্প কারখানার প্রতিষ্ঠা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করতে হবে। এই উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে একদিকে আমাদের আমদানির ওপর ক্ষতিকর নির্ভরতা কমাতে সহায়তা করবে এবং অপর দিকে গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হতে তা রপ্তানির বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি করবে।
তৈরি পোশাকের বাইরে আমাদের দেশে বড় সম্ভাবনা রয়েছে ওষুধ, সেমিকন্ডাক্টর এবং বিশেষ করে চামড়া ও জুতা শিল্পে। চামড়া খাতের নিজস্ব কাঁচামাল বা চামড়ার মান বিশ্বের অন্যতম সেরা এবং এর মূল্য সংযোজনের ক্ষমতা তৈরি পোশাকের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু আমলাতান্ত্রিকতা বা প্রাতিষ্ঠানিক অব্যবস্থাপনার কারণে এই সম্ভাবনাময় খাতটি এখন সংকটের মুখোমুখি। এই খাতের সংকট কাটাতে হলে ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও নীতিগত স্থবিরতা অবশ্যই কাটাতে হবে।
ঝুঁকি এবং সংকটের এই বিশাল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞের পেছনে দিনরাত নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন দেশের প্রায় ৩ কোটি ৭ লাখ ৬১ হাজারেরও বেশি মানুষ। এই বিশাল কর্মসংস্থানের মধ্যে পুরুষ ২ কোটি ৫৬ লাখ এবং নারী ৫১ লাখ ২৮ হাজার। একই সাথে মোট কর্মসংস্থানে প্রায় ৭৭.১০ শতাংশ মানুষই নিয়োজিত রয়েছেন বিভিন্ন স্থায়ী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে, যা প্রমাণ করে যে, সরকারি চাকরির তুলনায় বেসরকারি বিনিয়োগই বর্তমানে আমাদের মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু এই মানবসম্পদকে আমরা দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীল খাতে কাজে লাগাতে পারছি না, যা আমাদের জাতীয় অপচয়ে পরিণত হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সেবা খাতের এই একচ্ছত্র আধিপত্য বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য উচ্চ আয়ের স্থায়ী কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এক অর্থে অসম্ভব। একটি পোশাক কারখানা, ওষুধ শিল্প বা ইলেকট্রনিক উত্পাদন কেন্দ্রে যেখানে একসঙ্গে হাজার হাজার তরুণের জন্য স্থায়ী কর্মসংস্থান এবং ক্যারিয়ারের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব, সেখানে একটি সাধারণ শোরুম বা দোকানে বড়জোর ৫ থেকে ১০ জনের কর্মসংস্থান হয়, যার পরিধি খুবই সীমিত।
সেবা খাতের এই সাময়িক জয়জয়কারের মাঝে তাই নীতিনির্ধারকদের অলস বসে থাকার সুযোগ নেই। আমাদের আদি এবং মূল ভিত্তি কৃষিনির্ভর শিল্প, কিংবা বিপুল সম্ভাবনার চামড়া শিল্প গড়ে তুলতে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ নীতি সহায়তা এবং সহজ শর্তে ঋণের উপকারিতা আনতে হবে।
তবে তার চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হলো ব্যবসায়িক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতির মতো মারাত্মক ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন করে একটি স্বচ্ছ পরিবেশ তৈরি করা, যেন উদ্যোক্তারা বড় ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে সাহসী হতে পারেন। একই সাথে জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ এমন ক্ষতিকর ভারী শিল্পকে নিরুৎসাহিত করে দেওয়াল উপর আনার লাইনে পরিবেশবান্ধব, কৃষিবান্ধব ও প্রযুক্তিনির্ভর জনবান্ধব উৎপাদনের প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে।
যেদিন কাউন্টারের টেবিল এবং দোকানের ঝাঁপ ফেলার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের তরুণেরা শ্রম ও মেধা উৎপাদনমুখী কারখানার আধুনিক যন্ত্রপাতির চাকা ঘোরাতে শুরু করবেন, সেদিনই নির্মিত হবে একটি দীর্ঘমেয়াদি টেকসই অর্থনীতির মজবুত ভিত্তি। তবেই ২০ কোটি মানুষের এই বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে এগিয়ে যেতে পারবে বলে অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন