প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার বড়খারচর মহল্লায় ভৈরবের এক ব্যবসায়ীর মৃত্যুকে ঘিরে রহস্য দিন দিন জোরালো হচ্ছে। প্রথমে ঘটনাটি একটি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বলে গণ্য করা হলেও, ঘটনাস্থলের আলামত, সন্দেহভাজনদের আচরণ এবং গতিবিধি, এবং নিহত সোহেল রানার সাথে থাকা মোটা অঙ্কের টাকার ব্যাগ নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় এখন এটি 'পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড' হিসেবে চিহ্নিত করার দাবি উঠেছে।
নিহত সোহেল রানার পরিবারের অভিযোগ- এটি নিছক একটি সড়ক দুর্ঘটনা নয়, বরং সোহেল রানাকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে হত্যা করা হয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে ৮ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ৪/৫ জনকে আসামি বানিয়ে কিশোরগঞ্জ আদালতে একটি হত্যামামলা দায়ের করা হয়েছে। আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য পুলিশ ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (পিবিআই) কে দায়িত্ব দিয়েছেন।
নিহত সোহেল রানা (৩৫) ভৈরব উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের পানাউল্লাহচর এলাকার মৃত সিরাজ মিয়ার সর্বকনিষ্ঠ ছেলে। তিনি ভৈরব পৌর শহরের মুসলিমের মোড় এলাকায় “মোহাম্মদ কেমিক্যাল” নামে একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মালিক ছিলেন।
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৬ মে শনিবার রাত আনুমানিক সাড়ে ৮টার দিকে বাজিতপুর থেকে ব্যবসায়িক বকেয়া টাকা আদায় করে মোটরসাইকেলযোগে নিজ বাড়ি ভৈরবে ফিরছিলেন সোহেল রানা। এর কিছুক্ষণ পরই কুলিয়ারচর পৌরসভার বড়খারচর মহল্লার কাশ্মিরী আইডিয়াল স্কুল সংলগ্ন সড়কের পাশে তাকে রক্তাক্ত ও অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা। তার থেকে কিছু দূরে মোটরসাইকেলটিও পড়ে ছিল। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে ভাগলপুর জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর খবর পেয়ে প্রাথমিকভাবে কোন মামলা-মোকদ্দমা ছাড়া হাসপাতাল থেকে লাশ নিয়ে বাড়ি ফিরে যান স্বজনরা। পরদিন ১৭ মে রোববার সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত ছাড়া বাদ যোহর স্থানীয় শম্ভুপুর পাক্কার মাথা কবরস্থানে সোহেল রানার দাফন করা হয়।
প্রাথমিকভাবে রটেছিল, সড়কের ওপর দিয়ে নেওয়া ড্রেজার পাইপের তৈরি উঁচু আইল্যান্ডে ধাক্কা খেয়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার হন। কিন্তু দাফনের পর ঘটনার বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর তথ্য ও আলামত সামনে আসতে শুরু করলে পরিবারের সন্দেহ বৃদ্ধি পায়।
স্থানীয়দের মতে, সাধারণত উচ্চগতির সড়ক দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেলের সামনের অংশ ভেঙে যায় বা দুমড়েমুচড়ে যায়। কিন্তু বড়খারচর গ্রামের ইলিয়াস মিয়ার মুরগির ফার্ম থেকে উদ্ধার হওয়া সোহেল রানার মোটরসাইকেলটি ছিল পুরোপুরি অক্ষত।
এছাড়া, লাশ গোসল করানোর সময় স্বজনরা লক্ষ্য করেন, সোহেল রানার মাথার পেছনের মধ্যভাগে ভারী কোনো বস্তুর আঘাতের কারণে ফোলা এবং আধা ইঞ্চি পরিমাণ ছিদ্রযুক্ত জখম রয়েছে। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পড়ে গেলে মাথার পেছনে এমন আঘাত হওয়া অসম্ভব বলে দাবি স্থানীয়দের।
এই দুর্ঘটনার স্থান হিসেবে যে ড্রেজার পাইপের আইল্যান্ডের কথা বলা হচ্ছিল, গ্রামবাসীদের তথ্য অনুযায়ী সেই পাইপটি ঘটনার অন্তত এক সপ্তাহ আগে সেখান থেকে সরানো হয়েছিল। ফলে সেখানে দুর্ঘটনা ঘটার কোন সুযোগই ছিল না।
আরও বড় রহস্য হলো, সোহেল রানার সাথে থাকা টাকার ব্যাগটি নিখোঁজ হয়েছে। পরিবার জানিয়েছে, বিভিন্ন স্থান থেকে আদায় করা প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ টাকা ছিল ওই ব্যাগে। পরবর্তীতে ঘটনাস্থলের কাছ থেকে ব্যাগের কাটা ফিতার অংশ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয়দের ধারণা, পূর্ব থেকেই ওত পেতে থাকা দুর্বৃত্তরা ভারী কিছু দিয়ে সোহেল রানার মাথার পেছনে আঘাত করে। আঘাতে তিনি মোটরসাইকেলসহ কিছুটা দূরে ছিটকে পড়লে দুর্বৃত্তরা টাকা ব্যাগ কেটে নিয়ে পালিয়ে যায় এবং ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা বলে প্রচার করে।
এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চেয়ে নিহতের বড় ভাই শাহীন আহম্মেদ বাদী হয়ে গত ৩ জুন কিশোরগঞ্জের বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলগ্রহণকারী আদালত নং-০২-এ একটি পিটিশন মামলা দায়ের করেন (মামলা নং-১৬০/২০২৬)।
মামলায় কুলিয়ারচর উপজেলার বড়খারচর গ্রামের ইলিয়াছ (৫০), মজিবুর মিয়া (৪৮), এবং টুটুল মিয়া (৩৫) সহ অজ্ঞাতনামা ৪/৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। পেনাল কোডের ৩০২/২০১/৩৪ ধারায় দায়ের করা এই মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে লাশ গুমের চেষ্টা, তথ্য গোপন ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। বাদী তার অভিযোগে উল্লেখ করেছেন, আসামিরা পরিকল্পিতভাবে তার ভাইকে হত্যা করে অটোরিকশায় হাসপাতালে নিয়ে যান এবং প্রমাণ নষ্ট করতে এটিকে দুর্ঘটনা বলে প্রচার করে।
আদালতের নির্দেশে কুলিয়ারচর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কাজী আরিফ উদ্দীন গত ১৩ জুন একটি প্রতিবেদন জমা দিয়ে জানান, ইতিপূর্বে থানায় এ বিষয়ে কোনো সাধারণ ডায়েরি বা মামলা হয়নি।
ওসি'র প্রতিবেদন প্রাপ্তির পর গত ১৭ জুন বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফকরুল ইসলাম মামলাটি অধিকতর ও সুক্ষ্ম তদন্তের জন্য পুলিশ ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (পিবিআই) কিশোরগঞ্জ-কে দায়িত্ব প্রদান করেন। একই সাথে মামলার বাদী মৃত সোহেল রানার লাশ কবর থেকে উত্তোলন করে ময়নাতদন্তের জন্য যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানান।
এই নৃশংস ও রহস্যময় ঘটনার পর থেকে পুরো কুলিয়ারচর ও ভৈরব এলাকায় তীব্র ক্ষোভ, আতঙ্ক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এটি কেবল সাধারণ দুর্ঘটনা নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত অপরাধ- এমনটাই মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। দ্রুত সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত খুনিদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন এলাকার মানুষ ও নিহতের পরিবার।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন