প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দক্ষিণ কোরিয়ায় জন্মহার হ্রাস বর্তমানে জাতীয় সংকট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই সংকটের মোকাবেলায় সরকার বিভিন্ন আর্থিক প্রণোদনা বইছে, আবাসন সুবিধা ও ছুটি প্রদান করছে তবে কাঙ্খিত সাফল্য এখনো আসেনি। এবার দেশটির বৌদ্ধ সম্প্রদায় ভিন্ন একটি উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তরুণ ও তরুণীদের মধ্যে পরিচয়, প্রেম এবং বিয়ে উৎসাহিত করতে এই বিশেষ ‘ডেটিং রিট্রিট’ আয়োজন করা হচ্ছে যা শতাব্দীপ্রাচীন এক বৌদ্ধ মন্দিরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দেশে পালগংসান পাহাড়ের কোলে অবস্থিত প্রাচীন ডংহওয়াসা মন্দিরে এই বিশেষ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হচ্ছে। এই ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে তরুণ-তরুণীরা শুধু জীবনসঙ্গীই নয়, বরং নতুন বন্ধু এবং আত্মবিশ্বাসও খুঁজে পাচ্ছেন। অনুষ্ঠানের সূচনায় গেরুয়া কাপড় পরিহিত এক বৌদ্ধ ভিক্ষু অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশ্যে বলেন, তারা এখানে শুধু নিজেদের জন্যই আসেননি, দেশের ভবিষ্যতের জন্যও এখানে এসেছেন। তার কথায়, “আপনাদের লক্ষ্য শুধু একজন জীবনসঙ্গী খুঁজে পাওয়া নয়, ভবিষ্যতে পরিবার গঠন করে দেশের জন্মহার বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখা।” ডংহওয়াসা মন্দিরের আয়োজক ইউ চোল-জু বলেন, অতীতের বিদেশি আগ্রাসনের সময় যেমন বৌদ্ধ ভিক্ষুরা দেশের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তেমনিভাবে এখন জন্মহার হ্রাস একটি জাতীয় সংকট। তাই এই সমস্যার সমাধানে তাদেরও ভূমিকা রাখতে ইচ্ছুক। জন্মহার ব্যাপকভাবে কমে যাচ্ছে, দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বের সবচেয়ে কম জন্ম হারের দেশে একটি। ২০২৩ সালে দেশটিতে একজন নারীর গড় সন্তান জন্মদানের হার নেমে ০.৭২-এ এসেছে, যা জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ২.১ হারের অনেক নিচে। বিশ্লেষকদের মতে, আবাসন ব্যয়ের বৃদ্ধি, সন্তান পালনের উচ্চ খরচ, নারীদের কর্মজীবনে অগ্রাধিকার এবং বিয়ে নিয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন একযোগে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। এর পাশাপাশি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, তরুণদের মধ্যে প্রেম ও সামাজিক মেলামেশার প্রবণতা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ডেটিং রিট্রিটে অংশ নেওয়া সহজ নয়। আবেদনকারীদের প্রশ্নপত্র, ভিডিও সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে এবং বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার বিষয়ে তাদের আন্তরিকতা যাচাই করা হয়। এবারের আয়োজনে অংশ নিতে এক হাজার ৫৮০ জনের বেশি আবেদনকারীকে পেছনে ফেলে নির্বাচিত হয়েছেন মাত্র কয়েক ডজন তরুণ-তরুণী। উল্লেখযোগ্য যে, এই অনুষ্ঠানে অংশ নিতে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। ব্যস্ত জীবনে সঙ্গী খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। ২৮ বছর বয়সী কিম আহ-কিয়ং, যিনি ‘সুনহিয়েজি’ নামেও পরিচিত, উল্লেখ করেন যে, চাকরির কারণে রাজধানী সিউল ছেড়ে অন্য এলাকায় চলে যাওয়ার পর নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, “অফিস আর বাসা- এই দুই জায়গার মধ্যে জীবন সীমাবদ্ধ। নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগই নেই।” ৩০ বছর বয়সী কোয়ন সেউং-ওহ, যিনি এনিও নামে পরিচিত, জানান, বন্ধুদের উদ্যোগে প্রায় ১০টি ‘ব্লাইন্ড ডেট’-এ অংশ নিলেও কোন সম্পর্ক স্থায়ী হয়নি। তার কর্মস্থলে প্রায় ৯৭ শতাংশ সহকর্মীই পুরুষ। সুতরাং নতুন নারী সঙ্গী খুঁজে পাওয়া তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। দিনভর পরিচয়, আড্ডা ও নানা আয়োজন রয়েছে। ৩০ ঘণ্টার এই রিট্রিটে অংশগ্রহণকারীদের জন্য ছিল পরিচয়পর্ব, জুটি বেঁধে হাঁটা, মধ্যাহ্নভোজ, দ্রুতগতির ‘স্পিড ডেটিং’, সাংস্কৃতিক পরিবেষ্ঠনা এবং দলীয় নানা কার্যক্রম। প্রথম পরিচয়পর্বেই এনিও নিজের হাতে তৈরি ফরাসি পেস্ট্রি সবার মধ্যে বিতরণ করে উপস্থিতদের প্রশংসা অর্জন করেন। অন্যদিকে সুনহিয়েজির প্রথম সঙ্গী হন ৩২ বছর বয়সী সরকারি কর্মকর্তা মিনহো। পরে মধ্যাহ্নভোজের জন্য মিনহো বেছে নেন ২৮ বছর বয়সী ডিজাইনার রুবিকে। দিনজুড়ে অংশগ্রহণকারীরা তাদের পেশা, শখ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও ব্যক্তিগত জীবনের নানা বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন। দিনের সবচেয়ে অস্বস্তিকর কিন্তু প্রাণবন্ত আয়োজন ছিল ট্যালেন্ট শো। কেউ জনপ্রিয় কে-পপ গানের সঙ্গে নেচে, কেউ গান গেয়ে এবং কেউ স্প্যানিশ ভাষায় নিজেদের পরিচয় দেন। এক নারী অংশগ্রহণকারী বাঁশিতে কে-পপের জনপ্রিয় একটি সুর পরিবেশন করে সবার মন জয় করেন। সরকারও করছেন উৎসাহ প্রদান। দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার দীর্ঘদিন ধরেই বিয়ে ও সন্তান জন্মদানকে উৎসাহ দিতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করছে। দীর্ঘ মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটি, নবজাতকের জন্য নগদ অর্থ সহায়তা, নবদম্পতিদের জন্য ভর্তুকিযুক্ত আবাসনসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে ২০০৬ সাল থেকে প্রায় ২৫০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে সরকার। এছাড়া স্থানীয় সরকার এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন নিয়মিতভাবে ‘ম্যাচমেকিং’ আয়োজন করছে। কোথাও কাঠের কাজ শেখানোর কর্মশালা আর কোথাও নদীর তীরে সঙ্গীতানুষ্ঠান- সবকিছুর লক্ষ্য হল তরুণদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলা। ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষণও রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে জন্মহার কমতে থাকলেও ২০২৪ সাল থেকে কিছুটা উন্নতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ২০২৪ সালের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ায় একজন নারীর গড় সন্তান জন্মদানের হার ১.০-এ পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা ২০২৫ সালের ০.৮ হার থেকে কিছুটা বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধুমাত্র সরকারি উদ্যোগের ফল কি না সঠিকভাবে বলা সম্ভব না হলেও এটি সামাজিক মনোভাবের পরিবর্তনের লক্ষণ। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র দুই বছরের মধ্যে অবিবাহিতদের মধ্যে বিয়ে এবং সন্তান নেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে। রিট্রিটের শেষ পর্যন্ত মোট আটটি নতুন জুটি গড়ে ওঠে। এর মধ্যে দুটি সম্পর্ক গড়ে ওঠে অনুষ্ঠানের কর্মী এবং অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে। যাদের সঙ্গী খুঁজে পাননি, তারাও হতাশায় ফেরেননি। এনিও জানান, সুযোগ পেলে তিনি পুনরায় এই আয়োজনে অংশ নেবেন। অন্যদিকে সুনহিয়েজি বলেন, তিনি জীবনসঙ্গী না পেলেও অনেক নতুন বন্ধু পেয়েছেন। তিনি রাত তিনটা পর্যন্ত সহঅংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে গল্প করেছেন এবং ইতোমধ্যে একসঙ্গে ব্রাঞ্চ করার পরিকল্পনাও করেছেন। আয়োজকদের মতে, যদিও সবাই জীবনসঙ্গী নিয়ে ফেরেননি, তবে প্রায় প্রত্যেকেই নতুন বন্ধুত্ব, আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নতুন আশাবাদ নিয়ে মন্দির ছাড়েন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন