প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দেশে নিরবচ্ছিন্ন এবং নিরাপদ জ্বালানি তেল সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে সরকার ‘বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানিপূর্বক সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন নীতিমালা-২০২৬’-এর একটি খসড়া প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিষয়টির যাচাইবাছাই করা হচ্ছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরাও এ বিষয়ে মন্তব্য করছেন যে, দেশের পুরো চাহিদা মেটানোর জন্য সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে তেল আমদানির সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল মাহমুদ গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেছেন, সারা পৃথিবীতে বেসরকারি এবং সরকারি খাতের মধ্যে প্রতিযোগিতা বিদ্যমান। ভারতে ইন্ডিয়ান ওয়েল এবং রিলায়েন্স দুটি প্রতিষ্ঠান একসাথে জ্বালানি তেল বিক্রি করছে। এর মধ্যে রিলায়েন্সের তেলের দাম বেশি এবং ইন্ডিয়ান ওয়েলের তেলের দাম কম। ফলে ক্রেতাদের কাছে কোন কোম্পানির তেল কিনবে, সে ক্ষেত্রে বিকল্প সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম সরকারের, অর্থাৎ বিপিসি ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দ্বারা নির্ধারিত হয়। এখানে তেলের দাম কমবেশি হওয়ার সুযোগ নেই। ভারতে জ্বালানি নিরাপত্তা বেশ শক্তিশালী, যেখানে সরকারি এবং বেসরকারি উভয় পক্ষই কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি বেসরকারি খাতে তেল আমদানির অনুমতি দেওয়া হবে। এই উদ্দেশ্যে একটি নীতিমালা তৈরি হচ্ছে যা সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। যাদের কাছে অর্থ আছে তারা এই নীতি অনুসরণ করে তেল আমদানি করতে পারবেন। বর্তমানে বিষয়টি যাচাইবাছাই পর্যায়ে রয়েছে। নীতিমালা তৈরি হলে এটি অর্থনৈতিক কমিটিতে যাবে, সেখানে পাস হলে পরবর্তীতে পারচেস কমিটিতে যাবে, পাস হলে তা কেবিনেটে যাবে। কেবিনেটে পাস হলে এর সঙ্গে সম্পর্কিত পলিসিগুলো ঘোষণা করা হবে। কিন্তু এর আগেই কিছু মানুষ বিষয়টি বুঝে না নিয়েই অনুমাননির্ভর মন্তব্য করছেন।
জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকে সম্প্রতি জানানো হয়েছে, দেশের জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এবং অখণ্ড সরবরাহ ব্যবস্থাকে বজায় রাখতে, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য এবং জরুরি ও সংকটকালীন পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি বেসরকারি খাতের অবকাঠামো ও বিনিয়োগকে কাজে লাগাতে এই নীতিমালা তৈরি হচ্ছে। জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত এবং পরামর্শ নিয়েই এ নীতিমালা চূড়ান্ত করা হবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) দেশের জ্বালানি তেলের আমদানি এবং বিপণন কার্যক্রম এককভাবে পরিচালনা করে থাকে। বর্তমানে সরকার দেশের জ্বালানি তেলের বিশাল চাহিদা মেটানোর জন্য এবং শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য বেসরকারি খাতকে এ কার্যক্রমে যুক্ত করার চিন্তাচিন্তা করছে। কারণ, সরকার বা বিপিসির একার পক্ষে দেশের জ্বালানি তেলের বৃহৎ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবারে বিষয়টি নিয়ে আরও স্পষ্ট হতে দেখা গেছে। সেইসাথে বিপিসির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় দুর্নীতি এবং অদক্ষতার অভিযোগও উঠেছে। এই প্রতিষ্ঠানের সিস্টেম লস ২০ শতাংশের বেশি। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্টদের মতে, বেসরকারি খাতকে জ্বালানি আমদানির সুযোগ দিলে, বাজারে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হবে। যা পরে দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হতে পারে।
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের একমাত্র জ্বালানি তেলের পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি অনেক পুরোনো। বর্তমানে এর পরিশোধন সক্ষমতা বৃদ্ধি করার জন্য কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তাই দেশের মোট চাহিদার ৭৫ শতাংশের বেশি পরিশোধিত জ্বালানি তেল উচ্চ দামে বাইরে থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। পাশের দেশ ভারতও কম দামে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে তা পরিশোধন করে নিজেদের চাহিদা পূরণ করে এবং রপ্তানি করে। এ ক্ষেত্রে দেশের বড় বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা রিফাইনারি স্থাপনে অগ্রণী ভূমিকা নিলে এ খাতের জন্য তা একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হবে। যদি বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করেন এবং সরকার জমি এবং অন্যান্য লজিস্টিক সহায়তা দিতে পারে, তাহলে বিষয়টি আরও সহজ হবে। প্রয়োজন হলে সরকার এখানে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলেও যেতে পারে। তবে এটি করতে হলে কিছু শর্ত মেনে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের তেল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের যদি নিজস্ব জেটি বা জাহাজ থাকে, তেল খালাস ও সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থাকে, নিজস্ব ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক এবং পর্যাপ্ত মূলধন থাকে, এসব বিষয়গুলোর যাচাই করা প্রয়োজন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেছেন, তেল আমদানি এবং বিপণন কার্যক্রমের ক্ষেত্রে রেগুলেশনই হচ্ছে মূল বিষয়। এ খাতে প্রতিযোগিতা করতে হলে উন্মুক্ত বাজার পদ্ধতির মাধ্যমে এটি পরিচালনা করতে হবে। এখানে প্রতিযোগিতার উপাদান রাখতে হবে। যদিও এটি বেসরকারি খাতে দেওয়া হচ্ছে, তবুও কিছু শর্ত রাখা দরকার আমাদানির জন্য। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, ভারতের ক্ষেত্রে ভারত পেট্রোলিয়াম এবং রিলায়েন্সের পাম্পও রয়েছে। ভারতে এ-সংক্রান্ত অনেক নীতিমালা বিদ্যমান।
অর্থনীতিবিদ এবং পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন বড় হচ্ছে, তখন পুরোনো কাঠামোর প্রতি নিজেদের আটকে রাখা যাবে না। জ্বালানি খাতেও এখন সময় এসেছে সরকারি একচেটিয়া নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলার। কারণ দক্ষ অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে, বিনিয়োগ প্রয়োজন এবং বিনিয়োগ আনতে হলে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দিতে হবে এবং সেই বিনিয়োগ নিরাপদ ও জনস্বার্থমুখী রাখতে হলে সরকারকে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক হিসেবে থাকতে হবে। এই সমন্বয় তাই হতে পারে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন