প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
খাইবার পাখতুনখাওয়া (কেপি) প্রদেশে গভর্নরের শাসন ও জরুরি অবস্থা জারির মাধ্যমে পাকিস্তান সরকার সংবিধানের অপব্যবহার করেছে এবং অসাংবিধানিক পদক্ষেপের আশ্রয় নিয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন জামিয়াত উলামায়ে ইসলাম-ফজল (জেইউআই-এফ) প্রধান মাওলানা ফজলুর রহমান।
ফজলুর রহমানের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, কেন্দ্র ও কেপি প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে সংঘাত কমাতে, গত ১১ অক্টোবর কেন্দ্র সরকার সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রাদেশিক সরকারের ‘অসহযোগিতার’ অজুহাত দেখিয়ে কেপিতে গভর্নরের শাসন ও জরুরি অবস্থা জারি করে। সরকারের এই সিদ্ধান্তের পর বিরোধী দলগুলোর পাশাপাশি ফজলুও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে (ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি) বুধবার দেওয়া ভাষণে মাওলানা ফজলুর রহমান উল্লেখ করেন, কেন্দ্র সরকার দাবি করছে যে তারা সংবিধান অনুযায়ী এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
সরকারের এই অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, সরকার সংবিধানের অপব্যবহার করেছে। সাধারণ আইনের অপব্যবহারের মতোই, এখানে সংবিধানের অপব্যবহার করা হয়েছে।
প্রবীণ এই রাজনীতিক জোর দিয়ে বলেন, কেপিতে গভর্নরের শাসন জারি করার মাধ্যমে জনগণের রায়ের পরিবর্তে ‘জোরপূর্বক’ ক্ষমতার হস্তান্তর ঘটানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘প্রাদেশিক সরকারের ওপর আমার নিজস্ব দ্বিমত বা ক্ষোভ থাকতে পারে, কিন্তু বিপ্লব ঘটিয়ে সবকিছু উল্টে দিয়ে পরিবর্তন আনার পথ এটি নয়। কোনো পরিবর্তনের জন্য আপনাদের অবশ্যই জনগণের কাছে ফিরে যেতে হবে।’ সংবিধান ও সংসদের পবিত্রতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফকেও দায়ী করেন।
জেইউআই-এফ প্রধানের এই অভিযোগের জবাবে সংসদবিষয়ক মন্ত্রী ড. তারিক ফজল চৌধুরী বলেন, কেপিতে গভর্নরের শাসন মাত্র ছয় মাসের জন্য দেওয়া হয়েছে এবং জরুরি অবস্থা কেবল সন্ত্রাসবাদপ্রবণ কয়েকটি নির্দিষ্ট জেলায় কার্যকর করা হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, ‘আপনাকে যেকোনো একদিকে অবস্থান নিতে হবে-হয় পাকিস্তান রাষ্ট্রের পক্ষে থাকতে হবে, না হয় তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) ও আফগানিস্তানের সমর্থক হতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, বালুচিস্তানের পরিস্থিতি কেপির চেয়ে ভিন্ন। কেপির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও পিটিআই নেতা সোহেল আফ্রিদি ইসলামাবাদের অভিমুখে লংমার্চ করতে প্রদেশের সরকারি তহবিল ও সম্পদ ব্যবহার করেছিলেন। চৌধুরীর অভিযোগ, ‘আফ্রিদি এমনকি সন্ত্রাসীদের পক্ষে সাফাইও গেয়েছেন।’
ভাষণে সরকারের তীব্র সমালোচনা করার পাশাপাশি দেশ রক্ষা ও অসাংবিধানিক পদক্ষেপ বন্ধে একটি নতুন 'মেথাক-ই-জমহুরিয়ত' (গণতন্ত্রের সনদ) স্বাক্ষরের আহ্বান জানান ফজলুর রহমান।
তিনি বলেন, ‘এই সংসদ জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান, কিন্তু সহনশীলতা দিন দিন শেষ হয়ে আসছে এবং পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে।’
কেপিতে একই সাথে গভর্নরের শাসন ও জরুরি অবস্থা জারির বিষয়টি ইতিহাসে প্রথম কোনো ঘটনা বলে মন্তব্য করেন তিনি, যেখানে পুরো প্রদেশের বদলে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় তা কার্যকর করা হয়েছে। ১২টি জেলায় বিশেষ পরিষদের মাধ্যমে পরিচালিত জরুরি অবস্থার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘প্রদেশের অর্ধেক অংশে গভর্নরের শাসন এবং বাকি অর্ধেক অংশে জরুরি অবস্থা চলছে।’
ইসলামাবাদ অভিমুখে পিটিআই-এর লংমার্চ চলাকালীন রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমনে নিজের ভূমিকার কথা স্মরণ করে ফজলু জানান, পিটিআই নেতারা তাঁকে বিষয়টি মধ্যস্থতা করার অনুরোধ করেছিলেন।
তিনি জানান, পিটিআই এবং পিএমএল-এন (পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ)-এর শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে আলোচনার পর তিনি প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সাথে বৈঠক করেন। প্রধানমন্ত্রী তখন পিটিআই-কে লংমার্চ প্রত্যাহার করার আহ্বান জানান।
ফজলু স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘পরদিন সকালে (উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী) ইসহাক দার আমাকে ফোন করে বলেন যে মন্ত্রিসভা এই প্রস্তাবে রাজি হচ্ছে না এবং কেপিতে গভর্নরের শাসন জারি করা ছাড়া উপায় নেই।’
১১ অক্টোবরের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তিনি একটি ফোন পান, যেখানে তাঁকে জানানো হয় যে মন্ত্রিসভার বৈঠকে তাঁর মধ্যস্থতার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তবে এর কিছুক্ষণ পরই কেপিতে জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
জেইউআই-এফ প্রধান বলেন, ‘সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে ইসহাক দার আবারও আমাকে ফোন করে বলেন যে মন্ত্রিসভা এই চুক্তিতে রাজি নয়। তারা যেকোনো মূল্যে সেখানে গভর্নরের শাসন জারি করতে চায়। আমি তখন বলেছিলাম, গতকাল থেকে আমাদের নেওয়া সব প্রচেষ্টা মাটি হয়ে গেল। আমি একটি রাজনৈতিক সমঝোতার আশা করেছিলাম, কিন্তু সরকার তা প্রত্যাখ্যান করল।’
নিজের সব উদ্যোগই ‘রক্তপাত এড়ানোর উদ্দেশ্যে’ ছিল উল্লেখ করে ফজলু আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিশেষ করে বালুচিস্তানে কমিশনারদের অপহরণের ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন করেন, সেখানকার পরিস্থিতি কি কেপির চেয়েও খারাপ নয়?
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তারা সফল হয়েছে-মন দাবি কেন্দ্রীয় সরকার কীভাবে করে?’
মাওলানা ফজলুর রহমান বলেন, যাঁরা তাঁর দলের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তাঁদের জানা উচিত যে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাঁর দল বিপুল ত্যাগ স্বীকার করেছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তাঁদের দলের শহীদদের এবং অবদানকে এখন নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা হচ্ছে।
কেন্দ্রে জরুরি অবস্থা জারির কয়েক দিন পর ফজলু অভিযোগ করেছিলেন যে সরকার প্রদেশগুলোকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে কেপি সরকারের অসহযোগিতার যে দাবি তোলা হয়েছে, তা নিয়েও তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে একাধিক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর তোপের মুখে পড়ার পর ফজলু স্পষ্ট করেন, সরকারের নীতির সমালোচনা কোনো প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করার জন্য নয়, বরং নীতি সংশোধনের জন্য করা হয়েছে।
তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আমার দল শহীদদের দল। আপনারা আমাদের শহীদদের দেখতে পান না, আর আমাদের ত্যাগ নিয়ে মশকরা করা হচ্ছে।’
জেইউআই-এফ প্রধান বলেন, পাকিস্তান দেশের প্রতিটি নাগরিকের, বিশেষ কোনো ব্যক্তির একচ্ছত্র সম্পত্তি নয়। খনিজ সম্পদ বণ্টন সম্পর্কিত সরকারের নীতির নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সরকারের এই ‘সংবিধান লঙ্ঘন ও আগ্রাসন’ প্রতিরোধে তাঁর দল রাজনৈতিক শক্তি সংগঠিত করছে এবং জেইউআই-এফ কখনো কোনো সীমারেখা অতিক্রম করেনি।
সরকারকে শক্তির নীতি পরিহার করার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকার যদি সংঘাতের জন্য প্রস্তুত থাকে, তবে আমরাও মুখোমুখি হতে তৈরি। আমরা মরতে রাজি আছি। আপনাদের হাতে মরতে রাজি আছি, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় অপরাধী হিসেবে মরতে রাজি নই। আপনারা যদি সংঘাত চান, তবে আমরা এখানেই প্রস্তুত হয়ে বসে আছি।’
তিনি আরও যোগ করেন, রাষ্ট্র হচ্ছে মায়ের মতো, কিন্তু এই মা তার সব সন্তানদের সাথে সমান ও ন্যায্য আচরণ করছেন না।
উল্লেখ্য, গত ১১ অক্টোবর ফেডারেল মন্ত্রিসভার সুপারিশে প্রেসিডেন্টের চূড়ান্ত অনুমোদনের পর সংবিধানের ২৩২ ও ২৩৪ অনুচ্ছেদের অধীনে কেপিতে জরুরি অবস্থা এবং গভর্নরের শাসন জারি করে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার। সরকারের এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে বিরোধী দলগুলো। ফজলুর রহমানের পাশাপাশি 'তেহরিক-ই-তাহাফুজ আইন-ই-পাকিস্তান'-এর প্রবীণ নেতা মেহমুদ খান অচাকজাই এবং রাজা নাসির আব্বাসও সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। গভর্নরের শাসন জারির আগে কারাবন্দী প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পিটিআই তাঁদের নেতার মুক্তির দাবিতে ইসলামাবাদ অভিমুখে বিক্ষোভের ডাক দিলে কেন্দ্র ও পিটিআই-পরিচালিত কেপি সরকারের মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল।
এদিকে, গত ১৬ অক্টোবর পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি ইঙ্গিতপূর্ণভাবে ফজলুর রহমানকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান কেপিতে নতুন সরকার গঠনে ভূমিকা রাখতে না পেরে এবং গভর্নর পদ না পেয়ে চরম হতাশ হয়ে পড়েছেন।’ লাহোরে সাংবাদিকদের তিনি আরও বলেন, এই রাজনীতিক নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার টিকিয়ে রাখতে কয়েক দশক ধরে ‘এস্টাবলিশমেন্টের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।’ পরদিন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের এসব বক্তব্যকে নিজের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও 'চরিত্রহনন' বলে মন্তব্য করে প্রত্যাখ্যান করেন মাওলানা ফজলুর রহমান।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন