প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ভারতের একটি অচেনা শহরের একটি ছোট ফ্ল্যাটে রাতের বেলা কাজ করতেন ২২ বছর বয়সী ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতা রাজন কুমার। তিনি কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারের জন্য পোস্টার তৈরি ও ভিডিও সম্পাদনা করতেন, যা হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে ছিল। ২০২২ সালে উইলিয়াম রুটোর নির্বাচনি প্রচারে কাজ করার সময় তার তৈরি কনটেন্ট রুটোর আনুষ্ঠানিক প্রচারমাধ্যমে প্রকাশিত হয়নি। বরং, পরিচয় গোপন রাখা বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট থেকে সেগুলো ছড়িয়ে দেওয়া হতো। প্রতিদিন সাত ডলারের বিনিময়ে ৫০টি পোস্ট তৈরি করতেন রাজন।
এই কনটেন্টগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বী নেতাদের বক্তব্য বা সাক্ষাৎকারের অংশ কেটে এমনভাবে উপস্থাপন করা হতো, যাতে তাদের বক্তব্যের অর্থ পরিবর্তিত হয়ে যায়। কখনো রুটোর জনপ্রিয়তা ও জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেখানোর জন্য মিথ্যা তথ্য দিয়ে পোস্টার তৈরি করা হতো।
আলজাজিরাকে রাজন কুমার বলেন, “কোনো নারী রাজনীতিক থাকলে তার সুনাম নষ্ট করতে আমরা সহজেই তাকে কারো সঙ্গে জড়িয়ে দিই। কাউকে হেয় করার সবচেয়ে সহজ উপায়গুলোর একটি এটি।”
তিনি আরো বলেন, “সব বিতর্কিত কনটেন্ট ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য পরিচয় গোপন রাখা পেজগুলোতে পাঠানো হয়।”
২০২২ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে উইলিয়াম রুটো কেনিয়ার পঞ্চম প্রেসিডেন্ট হন।
চার বছর পর, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিকে নজর পড়েছে ভারতের এসব রাজনৈতিক পরামর্শক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারকদের। আগামী মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এর আগে গবেষকরা দেখতে পেয়েছেন, ভারতীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বট ও বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে নির্দিষ্ট কিছু নির্বাচনি প্রচারের পক্ষে ভিডিও ছড়ানো হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস প্রথম এ ধরনের প্রচারের খবর প্রকাশ করে। মিশিগানে ৪ আগস্ট অনুষ্ঠিত ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেট প্রার্থিতা বাছাইয়ের আগে দলটির রাজনীতিক হেইলি স্টিভেন্সের পক্ষে এসব ভিডিও ছড়ানো হয়েছিল। তবে ওই নির্বাচনে আবদুল আল-সাইয়েদের কাছে হেরে যান স্টিভেন্স। মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হয়েছেন আল-সাইয়েদ।
তবে যুক্তরাষ্ট্রই প্রথম দেশ নয়, যেখানে এ ধরনের ছায়া নির্বাচনি প্রচার চালানো হচ্ছে। দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা ভারতের ভাড়াটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রচারকদের কাজে লাগিয়েছেন। এ প্রতিবেদন তৈরির জন্য আলজাজিরার সঙ্গে কথা বলেছেন ভারতের প্রায় ১২ জন রাজনৈতিক পরামর্শক। তাদের ভাষ্য, এ ধরনের গোপন প্রচারের ক্ষেত্রে কোনো সীমা, নিয়ন্ত্রণ বা নৈতিক বাধা নেই।
নয়াদিল্লির রাজনৈতিক পরামর্শক তুষার গিরি বলেন, “আমরা নির্বাচনকে প্রভাবিত করছি। বিষয়টি এভাবে বলা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। নির্বাচনি গণতন্ত্রের ধারণাকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। ভোটারদের নিজেদের ইচ্ছায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। সবকিছুই প্রভাবিত করা হয়।”
গণতন্ত্রের আড়ালে ক্ষমতার গোপন উৎস
রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনীতিক ও নির্বাচনি প্রচার দলকে জনসমর্থন এবং ভোট পাওয়ার কৌশল ঠিক করে দেয়। রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারকে সেবা হিসেবে বিক্রি করা এ ধরনের বিশেষায়িত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয় ১৯৩০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ভোটারদের প্রভাবিত করতে অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও নানা কৌশল ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে মেটা ও গুগলের প্ল্যাটফর্মে নির্দিষ্ট শ্রেণির ভোটারদের লক্ষ্য করে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে লাখ লাখ ভোটারের কাছে নির্বাচনী বার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়। এর আগে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের প্রভাবিত করতে রাশিয়াও একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করেছে।
নির্বাচনি প্রচারের সময় যেসব কনটেন্ট আনুষ্ঠানিক অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করা বিতর্কিত বলে মনে করা হয়, সেগুলো ছড়ানোর কৌশল বিভিন্ন রকম। কোনো রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মেটা বা গুগলে আগে থেকে থাকা কোনো দলের গোপন পেজের দায়িত্ব নেয়। কখনো নতুন পেজ তৈরি করে, আবার কখনো পুরোনো পেজের নাম ও পরিচয় বদলে নির্বাচনী প্রচারের উপযোগী করে তোলে। ভাড়ায় পাওয়া পেজও ব্যবহার করা হয়।
২০২৪ সালে ভারতের জাতীয় নির্বাচনের আগে আলজাজিরার এক অনুসন্ধানে মেটা ও গুগলের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে এমন অসংখ্য গোপন পেজের সন্ধান পাওয়া যায়। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউবে এসব পেজ বিক্রির জন্যও রাখা হয়েছিল। ভোটারদের প্রভাবিত করতে লক্ষ্যভিত্তিক বিজ্ঞাপনের অপব্যবহার ঠেকাতে এসব প্ল্যাটফর্মের যে নীতিমালা রয়েছে, তা এভাবে পাশ কাটানো হচ্ছিল।
রাশিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনলাইন প্রভাব বিস্তারের অভিযান অনুসন্ধান ও প্রকাশ করে অজ্ঞাতনামা গবেষক দল অ্যান্টিবটফোরনাভালনি। দলটি আলজাজিরাকে জানিয়েছে, মিশিগানে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থিতা বাছাইয়ে হেইলি স্টিভেন্সের পক্ষে ভিডিও ছড়ানো অন্তত ২৮টি এক্স অ্যাকাউন্ট তারা শনাক্ত করেছে। এসব ভিডিও সাত মিলিয়নের বেশি বার দেখা হয়েছে।
আলজাজিরার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, শনাক্ত হওয়া অ্যাকাউন্টগুলোর অন্তত ১৫টি থেকে ভারতে বসে পোস্ট করা হচ্ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্লেমসন বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া ফরেনসিক হাবের গবেষকেরাও স্টিভেন্সের পক্ষে একই ধরনের প্রচারে ভারতীয় ভাড়াটে অ্যাকাউন্ট ও পেজ ব্যবহারের প্রমাণ পেয়েছেন।
ভারতের রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম নিয়ে ‘ব্যাকস্টেজ অব ডেমোক্রেসি’ বই লিখেছেন অমোঘ ধর শর্মা। তার মতে, নির্বাচনের আগে রাজনীতিকেরা চান ভোটারদের মনোযোগ যেন জনসমক্ষে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর ওপর থাকে।
আলজাজিরাকে তিনি বলেন, “কিন্তু কখনো কখনো প্রকৃত ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয় সম্পূর্ণ আড়ালে থেকে।”
রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, গণতন্ত্রে এ ধরনের গোপন ক্ষমতার উৎস তৈরি হওয়া বড় নৈতিক উদ্বেগের বিষয়।
পদচিহ্ন মুছে কাজ করার পরামর্শ
ভারতে এখন নির্বাচনি প্রচারের মেরুদণ্ড হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলো। দেশটির নির্বাচনে তাদের কাজের অভিজ্ঞতাকে অন্য দেশের রাজনীতিকদের আকৃষ্ট করার প্রচার উপকরণ হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে।
নয়াদিল্লির পরামর্শক তুষার গিরি বলেন, “ভারতের মতো জটিল নির্বাচনি গণতন্ত্রে কাঙ্ক্ষিত ফল দেওয়ার প্রমাণিত অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে। এ কারণেই এখন বিদেশি নির্বাচনি প্রচারগুলোও আমাদের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে।”
ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটার নীতিমালায় অ্যাকাউন্ট বিক্রি, কেনা বা বিনিময় করা নিষিদ্ধ। একইভাবে ভুয়া বা চুরি করা পরিচয়ে অ্যাকাউন্ট পরিচালনারও অনুমতি নেই। মেটা ও গুগলের নীতিমালা অনুযায়ী, রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনদাতাদের সাধারণত নিজেদের পরিচয় যাচাই করতে হয় এবং নির্বাচনি বিজ্ঞাপনের অর্থ কে দিয়েছে, তা প্রকাশ করতে হয়। তবে দেশভেদে এ-সংক্রান্ত নিয়মে পার্থক্য রয়েছে।
ভারতের রাজনৈতিক পরামর্শকেরা আলজাজিরাকে জানিয়েছেন, এসব নীতিমালা নিয়মিত লঙ্ঘন করা হয়।
তুষার গিরি বলেন, “প্ল্যাটফর্মগুলোর এসব নিয়মকানুনের তালিকা অনেক দীর্ঘ। কিন্তু ভালোভাবে খতিয়ে দেখলে সেগুলো পাশ কাটানোর বেশ কিছু ফাঁকফোকর পাওয়া যায়।”
কোনো নির্দিষ্ট দেশে কাজ করতে বাধার মুখে পড়লে এসব পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রিমিয়াম ভার্চ্যুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) ব্যবহার করে। কখনো অ্যাকাউন্টের উৎপত্তির দেশ পরিবর্তন করলেই কাজ হয়ে যায়। এতে বিদেশে বসে থাকা কেউ অন্য দেশের ভোটারদের লক্ষ্য করে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন চালাতে পারেন।
তুষার গিরি জানান, গত বছর সুরিনামের একটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচার দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তার বৈঠক হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত আলোচনা চুক্তিতে গড়ায়নি।
‘ব্যাকস্টেজ অব ডেমোক্রেসি’ বইয়ের লেখক অমোঘ ধর শর্মা জানান, গবেষণার সময় তিনি অস্ট্রেলিয়া ও জার্মানিতেও ভারতীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের সন্ধান পেয়েছেন। পরামর্শকেরা আলজাজিরাকে বলেছেন, নেপাল ও শ্রীলঙ্কাসহ ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোতেও তারা নির্বাচনি প্রচারে কাজ করেছেন।
২০২২ সালে কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রুটোর পক্ষে কাজ করা রাজন কুমার জানান, মাসিক চুক্তিতে তাকে প্রতিদিন প্রায় সাত ডলার দেওয়া হতো। কোনো কোনো দিন ১০০টি পর্যন্ত ছবি, পোস্টার ও ভিডিও তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হতো। টেলিগ্রামের বিভিন্ন গ্রুপের মাধ্যমে এসব কাজের সমন্বয় করা হতো।
রাজন বলেন, রুটোর কোনো প্রতিনিধির সঙ্গে তিনি সরাসরি কাজ করেননি। তার মতো কনটেন্ট নির্মাতাদের পুরো কাজের প্রক্রিয়ায় কারা যুক্ত, এমনকি প্রচার দলের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পরিচয়ও জানানো হয় না।
তিনি বলেন, “তারপরও সব সময় সতর্ক থাকতে হয় এবং নিজের কাজের কোনো চিহ্ন রাখতে নেই।” নিয়মিত কথোপকথন মুছে ফেলা হয় এবং সিম কার্ডও ঘন ঘন নষ্ট করা হয়।
তবে এ ধরনের কাজের ঝুঁকিও বাস্তব। ২০২২ সালের জুলাইয়ে কেনিয়ার নির্বাচনের আগে রুটোর নির্বাচনি প্রচারে কাজ করা দুই ভারতীয় রাজনৈতিক পরামর্শক জুলফিকার আহমেদ খান ও মোহাম্মদ জায়েদ সামি কিদওয়াই নাইরোবিতে নিখোঁজ হন। অক্টোবরে তাদের লাশ পাওয়া যায়।
অভিযোগ রয়েছে, কেনিয়ার পুলিশের একটি বিশেষ বাহিনী তাদের অপহরণ করে হত্যা করেছিল।
নির্বাচনে জয়ের পর রুটো ওই বিশেষ বাহিনী ভেঙে দেন। এ ঘটনায় ১৫ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছিল। তবে ২০২৬ সালের আগস্টে কেনিয়ার হাইকোর্ট মামলাটির অভিযোগ খারিজ করে দেন। প্রসিকিউশন পক্ষ হত্যার তদন্ত বন্ধ করার আবেদন জানানোর পর আদালত এ সিদ্ধান্ত নেন।
অর্থ লেনদেনেও গোপন কৌশল
রাজনৈতিক পরামর্শকদের গোপন কার্যক্রমের মতো তাদের অর্থ লেনদেনের পদ্ধতিও আড়ালে রাখা হয় বলে জানিয়েছেন কয়েকজন পরামর্শক।
নিরাপত্তার আশঙ্কায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন পরামর্শক আলজাজিরাকে বলেন, “কালোটাকা রাজনৈতিক পরামর্শক ব্যবসার অন্যতম ভিত্তি।”
তার ভাষ্য, বিদেশে কিছু প্রতিষ্ঠান কাগজে-কলমে কাউকে সাধারণ কাজের জন্য নিয়োগ দেয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এসব প্রতিষ্ঠান অর্থের উৎস আড়াল করে তা নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
কয়েকটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হাওলা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে। এটি আস্থার ভিত্তিতে পরিচালিত একটি অনানুষ্ঠানিক অর্থ স্থানান্তর পদ্ধতি। এর মাধ্যমে প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা এড়িয়ে বিভিন্ন দেশের মধ্যে অর্থ পাঠানো যায়। সাধারণত মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে এ লেনদেন সম্পন্ন হয়।
অন্তত তিনজন পরামর্শক ভারতের রাজধানী দিল্লির চাঁদনি চক এলাকার রপ্তানিমুখী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এ ধরনের অর্থ লেনদেনের একটি কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আলজাজিরার সঙ্গে কথা বলা এক পরামর্শক দুই বছর আগের একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি জানান, নির্দিষ্ট সিরিয়াল নম্বরযুক্ত একটি ভারতীয় ব্যাংক নোট সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। ওই নম্বরটি ব্যবহার করে অর্থ সংগ্রহের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, “আমি দেখেছি, ১০ রুপির নোট ব্যবহার করে লাখ লাখ রুপি নগদ সংগ্রহ করা হচ্ছে। মনে হচ্ছিল, কোনো সিনেমার দৃশ্য দেখছি।” তবে ওই লেনদেনের অর্থ কোন দেশ বা নির্বাচনি প্রচার থেকে এসেছিল, তা জানাতে রাজি হননি তিনি।
নির্বাচন প্রভাবিত করার বড় বাজার ভারত
তুষার গিরির মতে, গত কয়েক বছরে ভারত এ ধরনের গোপন রাজনৈতিক প্রচার চালানোর বড় পাইকারি বাজারে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, “চীন থেকে যেমন খেলনা কেনা যায়, তেমনি ভারতের সবচেয়ে কম খরচে বিশ্বের যেকোনো দেশের নির্বাচন প্রভাবিত করা সম্ভব।”
অমোঘ ধর শর্মাও ভারতের রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিস্তারকে বৈশ্বিক আউটসোর্সিং শিল্পের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার মতে, ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এ শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
শর্মা বলেন, “এটি সম্ভবত বৈশ্বিক আউটসোর্সিং শিল্পেরই একটি সম্প্রসারণ। ২০০০-এর দশকে ভারত যেমন ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া আউটসোর্সিংয়ের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল, এখন তেমনি রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের উত্থান ঘটছে। নির্বাচনি প্রচারগুলো তাদের কম স্বচ্ছ কার্যক্রমের দায়িত্ব এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে দিয়ে দিচ্ছে।”
তিনি আরো বলেন, এসব গোপন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এবং তাদের হয়ে কাজ করা নির্বাচনি প্রচার দলের মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্ব থাকায় কার্যক্রম ফাঁস হলেও সবাই দায় অস্বীকার করার সুযোগ পান।
তুষার গিরির মতে, একটি নির্বাচনি প্রচারকে সহায়তা করতে পরামর্শকেরা কত দূর যেতে পারেন, তার ওপরই তাদের সাফল্য নির্ভর করে।
তিনি বলেন, “সীমা কোথায়? কোনো প্রতিষ্ঠান যদি ভোটারকে প্রভাবিত করতে নোংরা কৌশল প্রয়োগ করতে পারে এবং রাজনৈতিক দলের নিজস্ব কল্পনার বাইরেও চিন্তা করতে পারে, তাহলে তারা সেই অনুযায়ী পুরস্কৃত হয়। যত বেশি নোংরা কৌশল প্রয়োগ করতে পারবেন, তত বেশি অর্থ ও কাজের সুযোগ পাবেন।”
এএম
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন