প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এনসিপির আয়োজিত মানবাধিকার কমিশন ও গুম আইনবিষয়ক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য দেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেছেন, সরকার মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধের পূর্ববর্তী অধ্যাদেশগুলো বাতিল করে দিয়েছে। বর্তমান খসড়া আইনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কমিশনের স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। এমন বাহিনীর হাতে গুমের ঘটনায় তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ থাকতে পারে।
তিনি বলেন, সরকার বরং উল্টো পথে পা বাড়িয়ে ভালো আইন আনার পরিবর্তে।
মঙ্গলবার রাজধানীর সেগুনবাগিচা ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির আয়োজনে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ খসড়া আইন, ২০২৬: আইনি পর্যালোচনা ও করণীয় নির্ধারণ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন তিনি।
বৈঠকে আখতার হোসেন বলেন, গুমের ভুক্তভোগী কোনো পরিবার অভিযোগ করতে গেলেও, অভিযোগ যদি মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তাহলে পাঁচ বছরের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। ফলে গুমের ঘটনা ঘটলেও ভুক্তভোগী পরিবারকে ভয় দেখানোর সুযোগ তৈরি হবে। আমাদের দেশে একটি ন্যায্য ও ফেয়ার সিস্টেম প্রতিষ্ঠা চাই। একটি জবাবদিহি চাই। বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে সামনে এগিয়ে নিতে চাই।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে সাধারণ নাগরিকদের মতামতকে ধারণ করে আইনগুলো নতুনভাবে প্রণয়ন করতে হবে, শুধু আমলা ও বাহিনীর মতামতের ভিত্তিতে নয়। বর্তমান খসড়া আইন এভাবে যদি সংসদে পাস হয়, তাহলে মানবাধিকার সুরক্ষায় যে অগ্রগতি হয়েছিল, তা থেকে বাংলাদেশ আবারও পিছিয়ে যাবে।
তিনি বলেন, অতীতে বাহিনীগুলো গুম করত এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটাত, তারা দায়মুক্তি পেয়ে যেত। তবে সামনে কি আমরা আবারও এরকম দৃশ্য দেখতে চাই? অতীতের মতো দায়মুক্তির সংস্কৃতি পুনরায় ফিরিয়ে আনা উচিত নয় এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হবে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, একটি জাতি বা রাষ্ট্রের শক্ত আদর্শগত ভিত্তির প্রয়োজন রয়েছে। রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ছাড়া শুধুমাত্র রাজনৈতিক দল বা নেতৃত্বের পরিবর্তন দ্বারা কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও কার্যকর না করলে সমস্যার সমাধান হবে না। গুম প্রতিরোধ, মানবाधিকার কমিশন, এবং পুলিশ কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল বা দলীয়করণ করা হলে, এগুলো তাদের কাঙ্ক্ষিত ভূমিকায় সফল হতে পারবে না।
গুমের ঘটনায় পুলিশের ওপর তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী প্রশ্ন উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, বিএনপি তাদের প্রতিশ্রুতি ও জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে। বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন, গুম কমিশন এবং পুলিশ কমিশনের মতো স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণে আসা উচিত নয়। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বিএনপি এই ভুল পথ থেকে সরে এসে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ও জবাবদিহি নিশ্চিত করবে।
আলোকচিত্রী, লেখক ও মানবাধিকার কর্মী শহীদুল আলম বলেন, স্বৈরাচার চলে যাওয়ার পর একটি ভিন্ন বাংলাদেশ পাওয়ার প্রত্যাশা ছিল। দায়িত্বশীল রাজনীতি নিশ্চিত করা জরুরি এবং রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় গেলে জনগণের কথা যেন ভুলে না যান, তা নিশ্চিত করা জনগণের দায়িত্ব। নিরাপত্তা বাহিনী সংক্রান্ত অভিযোগে এনএইচআরসির স্বাধীন তদন্ত ক্ষমতা বহাল রাখতে হবে, কমিশনার বাছাই প্রক্রিয়ার স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে এবং গুম আইনের দুর্বলতা সংশোধন করা প্রয়োজন। নতুন সরকার অতীতের পথ থেকে সরে এসেছে, এটি শুধু কথায় নয়, কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট ও সংবিধান সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেন, মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধের মতো প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনা। জুলাই সনদ ও নির্বাচনি ইশতেহারে বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন ও সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতার বিষয়ে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি। আপনারা ভোটের আগে বলেছেন, ১১৬ অনুচ্ছেদ সংশোধন করবেন, সুপ্রিম কোর্ট স্বাধীন করবেন, মানবাধিকার স্বাধীন করবেন। নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লেখ রয়েছে যে, মানবাধিকার কমিশন স্বাধীন হবে এবং একটি গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড মেনে প্রতিষ্ঠা করা হবে। কিন্তু এই প্রতিশ্রুতির প্রতি অঙ্গীকার করছেন না।
বৈঠকে শিক্ষাবিদ ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং গুমসংক্রান্ত কমিশনের সাবেক সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক তিনটি আইনি পরিবর্তনে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা খর্ব করা হচ্ছে। মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত ক্ষমতা সীমিত করা এবং অভিযোগ অভিযুক্ত বাহিনীর কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা এর উদাহরণ। র্যাবের ক্ষেত্রেও প্রস্তাবিত তদন্ত কাঠামো স্বাধীন তদন্ত নিশ্চিত করে না।
তিনি বলেন, কর্মকর্তাদের সুরক্ষার যুক্তিতে স্বাধীন তদন্ত বন্ধ করা ঠিক নয়। দীর্ঘদিন পরও পুরোনো অপরাধের ঘটনায় কর্মকর্তারা আইনের আওতায় আসতে পারেন। এমনকি বহু বছর পরও সামান্য একটি সূত্র ধরে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ উদ্ধার করা সম্ভব। তবে সংবেদনশীল রাষ্ট্রীয় অভিযানের ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করি। এজন্য স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা বাতিল না করে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও আলাদা আইনি কাঠামো করা উচিত বলে মত দেন। তার মতে, স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা খর্ব করলে কর্মকর্তাদের প্রকৃত সুরক্ষা হবে না; বরং ভবিষ্যতে তারা বেশি ঝুঁকিতে পড়বেন।
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, বাংলাদেশে রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক দলগুলোর পুরোনো খাসলত বদলায় না কেন, এটি বোঝা জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলো অনেক কিছু ওয়াদা করে, কিন্তু বাস্তবে তা বাস্তবায়ন করে না। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে মানবিক মর্যাদার উল্লেখ রয়েছে। তবে মানুষকে অধিকার না দিলে তার মর্যাদা দেওয়া সম্ভব নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জবাবদিহির আওতায় আনতে পুলিশ কমিশনসহ বিভিন্ন সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে, তাও বাস্তবায়িত হয়নি। রাষ্ট্রের সংকট কাটাতে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রয়োজন, যার ভিত্তি হবে ক্ষমতার কাঠামো আলাদা করা, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন করা।
এনসিপির কেন্দ্রীয় সংগঠক অ্যাডভোকেট আরমান হুসাইনের সঞ্চালনায় গোলটেবিল বৈঠকে আরও অংশ নেন আইনজীবী ও সাবেক বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সদস্য তানিম হোসেন শাওন, গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরামের আহ্বায়ক ফাহিম মাশরুর, এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির উপ-প্রধান সারোয়ার তুষার, মানবাধিকার কর্মী রুবি আমাতুল্লাহ প্রমুখ।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন