প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক অস্ট্রেলীয় নারীর রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে প্রভাব ফেলার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তাদের ৯০ হাজার অস্ট্রেলীয় ডলার ঘুষ প্রদান করেছেন এক ব্যক্তি। এই অভিযোগের ভিত্তিতে অস্ট্রেলিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ৫১ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে।
অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল পুলিশের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বিদেশি সরকারি কর্মকর্তাকে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে অস্ট্রেলিয়ার আদালতে মামলা ওঠার ঘটনা এটিই প্রথম।
অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ (এএফপি) নিশ্চিত করেছে, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আজ মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) ব্রিসবেন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, কুইন্সল্যান্ডের রেডব্যাঙ্ক প্লেইনসের বাসিন্দা ওই ব্যক্তি নিহত নারীর পূর্বপরিচিত ছিলেন। পুলিশ দাবি করেছে, তাঁর বিরুদ্ধে বিদেশি (বাংলাদেশি) সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়ার ষড়যন্ত্র এবং ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ বাংলাদেশে পাঠানোর প্রমাণ রয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত
ঘটনাটি শুরু হয়েছিল প্রায় দুই বছর আগে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। কুইন্সল্যান্ড পুলিশ সার্ভিস (কিউপিস) এএফপির কাছে একটি প্রতিবেদন পাঠায়, যেখানে উল্লেখ করা হয়, অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশের দ্বৈত নাগরিকত্বধারী এক নারী বাংলাদেশে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন।
রিপোর্ট পাওয়ার পরপরই আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় খোঁজ শুরু হয়। তবে পরদিনই বাংলাদেশ পুলিশ অস্ট্রেলীয় কর্তৃপক্ষকে জানায়, তারা ওই নারীর মরদেহ উদ্ধার করেছে।
পরবর্তীতে বাংলাদেশ পুলিশের ফরেনসিক পরীক্ষায় নিশ্চিত করা হয়, মৃত্যুটি স্বাভাবিক ছিল না এবং এটি একটি ‘সন্দেহজনক মৃত্যু’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
অস্ট্রেলীয় নাগরিকদের বিদেশে হত্যাকাণ্ড, অপমৃত্যু বা গুরুতর ক্ষতির শিকার হওয়ার ঘটনায় বিচারিক এখতিয়ার রয়েছে এএফপির, যা অস্ট্রেলিয়ার ‘ক্রিমিনাল কোড’ বা ফৌজদারি কার্যবিধির ১১৫ ধারা অনুযায়ী পরিচালিত হয়। এর ভিত্তিতে এএফপির বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক সংস্থাটি আলাদা তদন্ত শুরু করে, যা বাংলাদেশ পুলিশের চলমান তদন্তের পাশাপাশি চলে।
দুই বছরের পরিকল্পনা ও ৯০ হাজার ডলার লেনদেনের বিষয়টি এএফপির গোয়েন্দা তদন্তে বেরিয়ে আসে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অভিযুক্ত ব্যক্তি বাংলাদেশের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে অর্থ লেনদেনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি মোট ৯০ হাজার অস্ট্রেলীয় ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অর্থ) বাংলাদেশে পাঠান। এই অর্থের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়ে মৃত্যুর ঘটনার তদন্তকে নিজের অনুকূলে প্রভাবিত করা এবং বাংলাদেশ পুলিশের তদন্ত-সংক্রান্ত নথি ও রেকর্ড থেকে নিজের নাম পুরোপুরি বাদ দেওয়া।
তদন্ত জোরদার করতে এএফপির কর্মকর্তারা সিডনি ও ব্রিসবেনের একাধিক শীর্ষস্থানীয় আর্থিক ও ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানে আকস্মিক তল্লাশি চালান। সে সময় আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তরের গোপন রেকর্ড, ডিজিটাল ট্রানজেকশন তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব বাজেয়াপ্ত করা হয়।
দীর্ঘ দুই বছরের নজরদারি ও তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহের পর, গতকাল (২১ সেপ্টেম্বর) কুইন্সল্যান্ডের গুডনা ও রেডব্যাঙ্ক প্লেইনস এলাকায় একযোগে অভিযান চালায় এএফপির বিশেষ দল।
অভিযানকালে ওই ৫১ বছর বয়সী ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাঁর ঘর থেকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইলেকট্রনিক ডিভাইস জব্দ করে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়ার ফৌজদারি কার্যবিধির ৭০.২(১) ধারায় বিদেশি সরকারি কর্মকর্তাকে ঘুষ দেওয়ার গুরুতর অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। অস্ট্রেলীয় আইন অনুযায়ী, এই ধারার অপরাধ প্রমাণিত হলে অপরাধীকে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করতে হতে পারে।
এএফপি জানিয়েছে, ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য বিদেশি কর্মকর্তাকে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে তাদের ইতিহাসে এ ধরনের মামলা প্রথম হলেও, অপরাধটির ভয়াবহতার বিচারে এটি একটি ঐতিহাসিক আইনি দৃষ্টান্ত হতে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঘুষ ও দুর্নীতি দমনে অস্ট্রেলিয়া সরকারের সাম্প্রতিক কঠোর অবস্থান এই তদন্তে বড় ভূমিকা রেখেছে।
প্রতিবেদনে জানা যায়, ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর থেকে এএফপির বৈদেশিক ঘুষ ও দুর্নীতি দমন-সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করছে ‘টাস্কফোর্স সোলারিস’। এটি বহু বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত একটি মাল্টিডিসিপ্লিনারি দল, যা আন্তর্জাতিক স্তরে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও অর্থ পাচার রোধে কাজ করে।
এএফপি ‘ব্রাইবারি প্রিভেনশন নেটওয়ার্ক’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। এটি ব্যবসায়ী, নাগরিক সমাজ, শিক্ষাবিদ এবং সরকারি সংস্থার একটি যৌথ প্ল্যাটফর্ম, যা ব্যবসা ও সরকারি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কাজ করে।
ঘটনাটি নিয়ে এএফপির কমান্ডার স্টিফেন জয় এক কড়া বিবৃতিতে বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ায় কিংবা বিদেশে—যেকোনো জায়গাতেই বিচারিক বা তদন্তপ্রক্রিয়াকে দুর্নীতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করা একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। এএফপি এ জাতীয় কর্মকাণ্ডকে বিন্দুমাত্র সহ্য করবে না।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমরা ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিই—বিশেষ করে যখন কোনো গুরুতর অপরাধের তদন্তের ফল পরিবর্তন করার অপচেষ্টা চালানো হয়। যারা অর্থ দিয়ে বিচার ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করতে বা প্রভাব খাটাতে চাইবে, তাদের আইনগত জবাবদিহির মুখোমুখি হতেই হবে।’
কমান্ডার জয় জানান, আন্তর্জাতিক অংশীদার ও বাংলাদেশ পুলিশের সঙ্গে এএফপি নিরবচ্ছিন্ন সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছে।
অস্ট্রেলীয় পুলিশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে, নাম কাটাতে ঘুষ দেওয়ার চেষ্টার ঘটনাটির বিপরীতে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হলেও, বাংলাদেশি নারীর রহস্যজনক মৃত্যুর মূল তদন্তটি এখনো শেষ হয়নি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন