প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ভার্সিটিতে প্রথম পা দিয়েই কোনো সিনিয়রের গালে থাপ্পড় মারা কোনো ছেলেখেলা নয়। এটি বেশ সাহসিকতার পরিচয়। আর এই সাহসিকতার পরিচয় দিতে বুকের পাটা অনেক বড় হতে হয়, যা সবার মধ্যে থাকে না। সেই সাহসিকতার পরিচয় ইতিমধ্যেই দিয়ে দিয়েছে ফাইজা আলম ছোঁয়া। ছোঁয়া অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্রী এবং আজই তার ভার্সিটিতে প্রথম দিন।
তবে সিনিয়র বলতে কোনো ছেলে নয়, একজন মেয়ে। ছোঁয়া ইচ্ছে করে তাকে থাপ্পড় দিয়েছে—ব্যাপারটা তেমন নয়। মেয়েটি ছোঁয়ার সঙ্গে এমন কিছু করেছে, যার কারণে সিনিয়র হয়েও জুনিয়রের হাত থেকে তাকে থাপ্পড় খেতে হয়েছে।
হঠাৎ মেয়েটির গালে ছোঁয়াকে থাপ্পড় দিতে দেখে আগে-পিছে কোনো কিছু না ভেবেই ছোঁয়াকে নিজের সামনে ঘুরিয়ে একটি থাপ্পড় লাগিয়ে দেয় আদর আহমেদ চৌধুরী।
আদর এই ভার্সিটির মাস্টার্স পড়ুয়া একজন ছাত্র। ছোঁয়া ও আদর যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানেই একটি গ্রুপ বসেছিল। ছোঁয়া যে মেয়েটিকে থাপ্পড় মেরেছে, সে মেয়েটিও এই গ্রুপের একজন। আর আদর আহমেদ চৌধুরী সেই গ্রুপেরই লিডার।
এতক্ষণ কী হয়েছে, আদর কিছুই জানে না। ভার্সিটিতে ঢুকেই বন্ধুদের কাছে এগিয়ে যাচ্ছিল সে। তখনই চোখে পড়ে, আচমকা একটি মেয়ে তার বান্ধবীকে থাপ্পড় মারছে। সেটি দেখেই কোনো কিছু না ভেবে মেয়েটিকেও থাপ্পড় মেরে দেয় আদর।
এতক্ষণ ছোঁয়ার সঙ্গে যা হয়েছে, তাতে সে খুবই বিরক্ত ছিল। এখন আদরের কাছে থাপ্পড় খাওয়ায় আরও ক্ষেপে গেছে। পারছে না আদরের মাথার সব চুল টেনে ছিঁড়ে দিতে। রাগে ফোঁসফোঁস করতে করতে জিজ্ঞেস করল,
— "আমাকে মেরেছেন কেন?"
আদরও রাগান্বিত কণ্ঠে বলল,
— "আপনি ওকে মেরেছেন কেন? আপনাকে তো আগে কখনো এই ভার্সিটিতে দেখিনি। হঠাৎ এসেই একজন অপরিচিত মেয়েকে থাপ্পড় মারেন কোন সাহসে?"
আদরের চিৎকার শুনে গ্রুপের সবাই বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে গেল। আশপাশের লোকজনও থমকে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল, এখানে কী হচ্ছে।
আদরের চোখেমুখে প্রচণ্ড রাগ। রাগে কপালের রগ ফুলে উঠেছে। চোখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। চোখের মধ্যে লাল লাল রগ ভেসে উঠেছে।
আদরের এমন রাগ দেখে দৌড়ে আসে তার বন্ধুরা। এদিকে আদরের দিকে তাকিয়ে ছোঁয়ার অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। তবুও সেও কম নয়। তার রাগও আকাশচুম্বী।
আদরের বন্ধুরা তাকে ধরে বলল,
— "আদর, তুই শান্ত হ। আমরা ব্যাপারটা দেখছি। ও ফার্স্ট ইয়ারের নতুন ছাত্রী।"
ফার্স্ট ইয়ারের কথা শুনে আদরের যেন রাগ আরও বেড়ে গেল। আদর ভাবতেই পারছে না, ফার্স্ট ইয়ারের ছোট একটা মেয়ে হয়ে মাস্টার্স পড়ুয়া একজন সিনিয়রের গালে প্রথম দিনেই কীভাবে থাপ্পড় মারতে পারে!
এর একটা ব্যবস্থা করতেই হবে।
আদরের অবস্থা দেখে বন্ধুরা ছোঁয়াকে আপাতত আদরের সামনে থেকে সরিয়ে দিতে চাইছে।
— "তুমি এখন যাও এখান থেকে। তোমার সঙ্গে আমরা পরে কথা বলব।"
এদিকে ছোঁয়া তো যাওয়ার পাত্রী নয়। বিনা দোষে একটা ছেলের কাছে থাপ্পড় খেয়ে এর হেস্তনেস্ত না করে কোনোভাবেই যাবে না।
আদরের দিকে তাকিয়ে একবার দেখে নিজের ঠোঁট দুটো জিহ্বা দিয়ে ভিজিয়ে আদরের বন্ধুদের উদ্দেশে বলল,
— "কেন যাব আমি? উনি না জেনে, না বুঝে আমাকে থাপ্পড় মারবেন, আর আমি কিছু না বলেই চলে যাব? এতক্ষণ আমার সঙ্গে যা কিছু হয়েছে, সেসব কি উনি দেখেছেন? উনি না দেখে কেন আমায় মারবেন? উত্তর দিন। আপনারা তো সবই দেখেছেন, সবই জানেন।"
একটু থেমে তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে আবার বলল,
— "অবশ্য আপনাদের কাছে আর কিসের উত্তর আশা করছি আমি! যেখানে আপনারাই নতুন নতুন ছাত্র-ছাত্রীর সঙ্গে জঘন্যতম র্যাগিংয়ে মেতে উঠেছেন। র্যাগিংয়ের মাত্রা এতটাই ছিল যে, এর আনন্দ উপভোগ করতে গিয়ে নিজেদের হিতাহিত জ্ঞান পর্যন্ত হারিয়ে বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গিয়েছেন। আপনাদের জ্ঞান ফেরানোর জন্য এই একটা থাপ্পড় যথেষ্ট ছিল না। প্রয়োজন ছিল আরও কয়েকটা দেওয়ার। ফারদার আবার এমন র্যাগিং করতে দেখলে আরও কয়েকটা থাপ্পড় দিতে এই ছোঁয়ার হাত কাঁপবে না। কথাটা মাথায় রাখবেন।"
তারপর আদরের একটু কাছে এগিয়ে গিয়ে ছোঁয়া বলল,
— "আপনার বন্ধুদের জিজ্ঞেস করবেন, কেন এই থাপ্পড়টা খেতে হলো একটা জুনিয়রের হাত থেকে। অবশ্য কারণ জানতে পারলে সেটা আপনার জন্যই লজ্জাজনক হবে। আর শুনুন, এই ছোঁয়া অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয় না। সেটা নিজের বাবা হলেও না। আর সেখানে উনি তো শুধু একজন সিনিয়র। আরেকটা কথা, এই থাপ্পড়ের বদলা আপনার কাছ থেকে আমি পরে বুঝে নেব। মাইন্ড ইট!"
কথাগুলো বলে ছোঁয়া সেখান থেকে হনহন করে চলে যায়।
এদিকে ছোঁয়ার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে আদর। মাথায় শুধু ছোঁয়ার বলা "র্যাগিং" শব্দটা বারবার বাজতে থাকে।
তারপর বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
— "এই মেয়ে কী বলে গেল? কথাগুলো কি সত্যি? তোরা ওর সঙ্গে র্যাগিং করেছিস?"
বন্ধুরা সবাই চুপ। কেউ কিছু বলছে না। সবাই নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের সঙ্গে এখন কী হতে পারে, তা আন্দাজ করতে পেরে ভয়ে চুপসে গেছে।
আদর র্যাগিং পছন্দ করে না। ভার্সিটিতে কখনো কাউকে র্যাগিং করার সুযোগও দেয় না। সবাইকে কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে, যেন এই ভার্সিটিতে কোনো ধরনের র্যাগিং বা কোনো শিক্ষার্থী হয়রানির শিকার না হয়।
এত কিছু বলার পরও তারই গ্রুপের সদস্যরা এই কাজ করেছে—এটা ভাবতেই অবাক লাগছে আদরের। কোনোভাবেই বিষয়টি মানতে পারছে না সে।
আদর এই ভার্সিটির আদর্শ ছাত্র। পড়ালেখায় সব সময় টপ পজিশনে থাকে। এখন পর্যন্ত তাকে কেউ সেকেন্ড করতে পারেনি। এ কারণে প্রিন্সিপাল স্যার ও প্রফেসররা তাকে খুব পছন্দ করেন। সব সময় সবকিছুর দায়িত্ব চোখ বন্ধ করে নির্দ্বিধায় আদরকে দিয়ে চিন্তামুক্ত থাকেন ভার্সিটির প্রিন্সিপাল।
আদর পড়ালেখায় যেমন ভালো, রাজনীতিতেও তেমন সক্রিয়। পড়ালেখা ও রাজনীতি—দুটোই একসঙ্গে ব্যালেন্স করছে সে।
তার বিশাল বন্ধুমহল না থাকলেও কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবীকে নিয়েই তার জগত। তার বন্ধুদের মধ্যে আছে আদনান, রোহান, সাব্বির এবং বান্ধবীদের মধ্যে আছে তানু, মাহি ও নিশাত। এছাড়াও তার ক্লাসমেটসহ ভার্সিটির সব জুনিয়রই তাকে খুব মান্য করে। আদরের এক কথাতেই সবাই পাশে দাঁড়াতে রাজি।
ছোঁয়া যাকে থাপ্পড় মেরেছে, তার নাম তানু। তাদের সাতজনের একটি গ্রুপ হলেও নিশাত আজ আসেনি। আদর ছাড়া বাকি পাঁচজন মিলে আজ যা করেছে, তার জন্য আদর প্রচণ্ড রেগে আছে তাদের ওপর।
আদনান সবকিছু খুলে বলে আদরকে। আদর সব শুনে যেই তানুর দিকে রাগান্বিত চোখে তাকিয়েছে, অমনি আদর শান্ত হয়ে গেল।
শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল,
— "তোর গাল থেকে রক্ত বের হচ্ছে তানু। কাটল কীভাবে? মেয়েটি তো শুধু থাপ্পড় দিয়েছিল। এই থাপ্পড়ে পাঁচ আঙুলের দাগ বসার কথা, গাল তো কাটার কথা নয়।"
আদরের কথা শুনে সবাই তানুর দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠল।
তানু গালে হাত দিয়ে রক্ত দেখে বলল,
— "ওই মেয়েটি যখন থাপ্পড় মেরেছে, তখন মনে হচ্ছিল ধারালো কিছু একটা আমার গালটা এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়েছে। কিন্তু তুই ওকে থাপ্পড় মারায় এই ব্যথাটা ভুলে সেদিকেই তাকিয়ে ছিলাম। এখন আবার অনেক জ্বালা করছে।"
আদর তখন তানুর পেছনে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখল, নিচে কংক্রিটের গুঁড়া আর অনেক ছোট-বড় ভাঙা কাঁচের টুকরো পড়ে আছে। সেখানে অনেক রক্তও লেগে আছে।
আদর যেদিকে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানেও ফোঁটা ফোঁটা রক্ত পড়ে আছে এবং সেই রক্ত অনেক দূর পর্যন্ত গিয়েছে।
কিন্তু কারও সেদিকে খেয়াল নেই। সবাই তানুকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
চলবে...
লেখিকা: মমতাজ নাহার মনিকা: চট্টগ্রাম
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন