প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বুধবার ইরানে নতুন দফায় হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালীতে নৌযান চলাচলে হুমকি দেওয়ার সক্ষমতা কমানোর চেষ্টা করছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান আলোচনায় ফিরে না এলে হামলার পরিধি আরও বাড়তে পারে।
এ খবর তেহরান থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, গ্রিনিচ মান সময় ১৯০০টায় হামলা শুরু হয়েছে। এই হামলাগুলি ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে লক্ষ্যবস্তু করে পরিচালিত হয়, যা হরমুজ প্রণালী দিয়ে অবাধে চলাচলকারী জাহাজগুলোর জন্য হুমকি তৈরি করতে ব্যবহৃত হচ্ছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানায়, তাদের একটি যুদ্ধবিমান একটি খালি তেলবাহী ট্যাংকারকে হামলা করে সেটিকে অচল করে দেয়, এই ট্যাংকারটি ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করছিল। সেন্টকম জানায়, এম/টি বেলমা নামে কুরাকাওয়ের পতাকাবাহী জাহাজটির ধোঁয়া নির্গমন চিমনিতে হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের মাধ্যমে সেটিকে থামানো হয়। তাদের দেওয়া এক পোস্টে উল্লেখ করা হয়, ‘জাহাজটি আর ইরানের দিকে অগ্রসর হচ্ছে না।’
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, বিভিন্ন শহরে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে, বিশেষ করে বন্দর আব্বাস, রাস্ক এবং চাবাহার এলাকায়। এর আগেও কেশম এবং বন্দর ইমাম খোমেনিসহ দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। পরে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলায় ইরানের একমাত্র বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বুশেহরও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে ওয়াশিংটন এবং তেহরান প্রায় এক মাস আগে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করলেও দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাত আবার শুরু হয়েছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানায়, তারা বাহরাইনে অবস্থানরত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরান থেকে ছোড়া তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে।
ইরাকে কুর্দি বাহিনী জানায়, যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোট উত্তরাঞ্চলের কুর্দিস্তান অঞ্চলের রাজধানী এরবিলের আকাশে বিস্ফোরকবোঝাই আটটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। এএফপির সাংবাদিকরা বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন এবং মার্কিন কনস্যুলেটের কাছে ধোঁয়া উঠতে দেখেছেন। তবে এই ঘটনায় কোনো হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বলেন, ‘আগামী সপ্তাহ তাদের জন্য খুবই ভয়াবহ হতে পারে।’ তেহরান আলোচনার টেবিলে না ফিরলে বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সেতুতে হামলা চালানোর হুমকি দেন তিনি। নতুন সংঘর্ষ শুরুর পরেও দুই পক্ষের মধ্যস্থতাকারীর আলোচনা যেমন ছিল, তেমনই রয়ে গেছে।
তবে, ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেন, ‘সমঝোতা স্মারকের ধারাগুলো কার্যকর ও বাস্তবায়িত হলেই কেবল এর অর্থ থাকে।’ তিনি এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেন, ‘যদি ইরান সমঝোতা স্মারক থেকে কোনো সুবিধা না পায়, তাহলে সেটি মেনে চলারও আমাদের কোনো কারণ নেই।’
নতুন উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালী, যা বিশ্বে তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালী অবরোধ করে। কয়েক মাস ধরে তারা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে এই নৌপথ ব্যবহার করছে।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির পর প্রণালীটি সাময়িকভাবে খুলে দেওয়া হলে, গত সপ্তাহে তেহরান ঘোষণা দেয়, ‘যুক্তরাষ্ট্র আগ্রাসন না বন্ধ করলে’ এটি আবার বন্ধ থাকবে। এখনও পর্যন্ত এই নৌপথে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সম্প্রতি সামুদ্রিক নজরদারি প্রতিষ্ঠান ক্লেপলার জানিয়েছে, মঙ্গলবার মাত্র ২১টি জাহাজ প্রণালী অতিক্রম করেছে। সাম্প্রতিক উত্তেজনা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথে বিঘ্ন ঘটিয়ে তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।
আবারও ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ আরোপ করেছে এবং এম/টি বেলমার বিরুদ্ধে হামলার মাধ্যমে সেই অবরোধ কার্যকর করা হয়েছে। একদিকে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অবরোধ ‘এক অর্থে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারককে ভেঙে দিয়েছে।’
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কাসর-ই শিরিনের ৩১ বছর বয়সী কারুশিল্পী খাদিজেহ জানান, ‘বিস্ফোরণের শব্দে ছোট ছোট শিশুরা এতটাই ভীত যে ভোর পর্যন্ত ঘুমাতে পারে না।’ তিনি জানাচ্ছেন, ‘আল্লাহ না করুন, যদি যুদ্ধ আরও তীব্র হয়, তাহলে আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য হয়তো কয়েক প্রজন্ম লাগবে।’
ইরানের হামলার শিকার উপসাগরীয় দেশে একই ধরনের উদ্বেগ রয়েছে। কুয়েতে বসবাসকারী ৩৯ বছর বয়সী সুদানি হিসাবরক্ষক মোস্তফা মোহাম্মদ বলেন, ‘প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে ভাবি, পরিস্থিতি শান্ত হবে, নাকি আরও খারাপ হবে।’
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রয়েছে বলে দাবি করে আসছে। তারা যেসব জাহাজকে অননুমোদিত পথ ব্যবহারকারী মনে করছে, সেগুলোর ওপরও গুলি চালিয়েছে। বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বলেছে, ‘যোদ্ধাদের পাল্টা অভিযান অব্যাহত থাকবে।’ সংকট পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান এমটিআই নেটওয়ার্ক জানিয়েছে, মঙ্গলবার ভোরে ওমান উপকূলের কাছে একটি নরওয়েজীয় তেলবাহী জাহাজে বিস্ফোরণ ঘটেছে। কুয়েত জানিয়েছে, তারা ‘শত্রুপক্ষের ড্রোন হামলার’ মোকাবিলা করছে। দেশটির একটি নৌযানে হামলায় চার নাবিক আহত হয়েছেন। অন্যদিকে ট্রাম্প সোমবার বলেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর পরিকল্পিত ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত তিনি বাতিল করেছেন এবং এর পরিবর্তে উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির পথে যাওয়ার কথা জানান। ট্রাম্প বুধবার জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ইরানে আটক থাকা এক মার্কিন নাগরিক দেশটি ছেড়েছেন। তার আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই নারীর নাম ডেনা কারারি। ট্রাম্প বলেন, তিনি ‘ভালো অবস্থায়’ দেশ ছেড়েছেন। ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, ‘এই সদিচ্ছার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ধন্যবাদ জানায়।’ সরকারি মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি জানান, গত সপ্তাহ থেকে নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানে অন্তত ৩০ জন নিহত হয়েছেন। এদিকে সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, বুধবার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে হামলায় তাদের সাত সদস্য নিহত হয়েছেন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আহভাজ শহরের একটি হাসপাতাল যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার পর খালি করে রোগীদের অন্য চিকিৎসাকেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জাামিন নেতানিয়াহু, যিনি এখনও যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেয়নি, সতর্ক করে বলেছেন, ইরান হামলা চালালে ইসরাইল কঠোর জবাব দেবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন