প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
জেলায় প্রাপ্ত খনিজ গ্যাস সম্পদের সুচিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংগ্রহ করেছেন একটি ‘মাস্টারপ্ল্যান’। এই বৃহৎ গ্যাসভান্ডারের সঠিক ব্যবহারের জন্য পূর্ববর্তী সরকারের বিশৃঙ্খল চিন্তার পরিবর্তে নতুন উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু করার লক্ষ্যে একগুচ্ছ প্রকল্পের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এই প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে- সার কারখানা, বিদ্যুৎ প্লান্ট, কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়, ইলিশ সম্পদ সংরক্ষণ কেন্দ্র, গ্যাসভিত্তিক শিল্প কারখানা স্থাপনসহ একটি বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করা। এর মাধ্যমে ভোলা এবং পুরো দক্ষিণাঞ্চলকে উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় আরো সমৃদ্ধ করার কথা বলা হচ্ছে।
গত ৩ মে থেকে ৬ মে ঢাকায় জেলা প্রশাসকদের সম্মেলনে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভোলার গ্যাস সম্পদের সদ্বব্যবহারের মাধ্যমে বাস্তবসম্মত উন্নয়নের কর্মপরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। এই সম্মেলনে, ভোলার গ্যাস ব্যবহারের বিষয়টি ছিল প্রধান আলোচ্য বিষয়। সম্মেলনে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে যে, ভোলার গ্যাস, জাতীয় গ্রিডে নেয়ার পরিবর্তে ভোলাতেই ব্যবহার করা হবে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো দ্বীপ জেলা ভোলাসহ সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলে একটি পরিকল্পিত শিল্প-কলকারখানা ও সার কারখানা সহ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করা।
এদিকে, ভোলার খনিজ গ্যাস নিয়ে সরকারের পরিকল্পনার কথা বলেন তথ্য মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি গত শুক্রবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ভোলার প্রাকৃতিক গ্যাসকে কেন্দ্র করে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে পরিকল্পিতভাবে শিল্প কলকারখানা গড়ে তোলা সম্ভব। তিনি উল্লেখ করেন, ‘যেকোনো বড় বিনিয়োগের প্রথম শর্তই হলো জ্বালানি অবকাঠামো ও নিরাপত্তা। দক্ষিণাঞ্চলে জ্বালানি সম্পদ বিদ্যমান থাকায় এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক রূপান্তরের বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছে।’
দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উন্নয়নের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে তথ্য মন্ত্রী আরো বলেন, ‘আমাদের ভোলায় যে গ্যাস আছে, এই গ্যাসকে কেন্দ্র করে দক্ষিণাঞ্চলে আমরা নতুন শিল্প কলকারখানা স্থাপনের বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে চিন্তা করতে পারি। বিনিয়োগকারীরা যেকোনো অঞ্চলে বিনিয়োগ করার আগে মূলত: দু’টি জিনিস চায়- রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা। যেহেতু দক্ষিণ বাংলায় এই জ্বালানি সম্পদ রয়েছে, তাই একে পরিকল্পিতভাবে দেশের অর্থনীতি এবং কর্মসংস্থানের কাজে লাগাতে হবে।’
মন্ত্রী বলেন, এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত উন্নয়ন বিষয়গুলি কেবল রাজনৈতিক দল বা ক্ষমতাসীনদের এজেন্ডা হওয়া উচিত নয়। উন্নয়ন বিশ্লেষকগণ মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মুক্ত চিন্তাভাবনা বাস্তবায়ন হলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোর দৃশ্যপট সম্পূর্ণরূপে পাল্টে যাবে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) এর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ভোলায় বর্তমানে ১ দশমিক ৭৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাসের মজুত আছে। এই পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। ১৯৯৫ সালে ভোলায় প্রথম শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছিল। সেখান থেকে গ্যাস উৎপাদন শুরু হয় ২০০৯ সালে। ২০১৮ সালে আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্র ভোলা উত্তর এবং ২০২৩ সালে আবিষ্কৃত ইলিশা কুপ থেকে এখনো গ্যাস উৎপাদন শুরু হয়নি।
জেলা শহরতলীর দক্ষিণ চরপাতা গ্রামে তিন বছর আগে গ্যাসক্ষেত্র খুঁজে পায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)। ওই ইলিশা গ্যাসক্ষেত্রটি ইতোমধ্যেই গ্যাস উত্তোলনের জন্য প্রস্তুত হয়েছে। তবে এখনো উৎপাদন শুরু করা যাচ্ছে না। কারণ, ভোলায় বর্তমানে চাহিদার চেয়ে বেশি গ্যাস উত্তোলন হচ্ছে।
শিল্পকারখানা স্থাপনে দেশি কোম্পানিগুলি:
ভোলার গ্যাস সম্পদের সুবিধা ভোগ করতে দেশের শীর্ষ শিল্প কারখানাগুলি ইতোমধ্যে এখানে বিনিয়োগ শুরু করেছে। গত কিছু বছরে জেলা সদরে জমি অধিগ্রহণ করে শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলেছে, শেলটেক, কাজী গ্রুপ, উর্মি গ্রুপ এবং আর এফ এল কোম্পানিসহ ছোট বড় মিলিয়ে কমপক্ষে ডজনখানেক কোম্পানি।
জানা গিয়েছে, এসব কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে জেলা ও অন্য জেলায় কমপক্ষে আড়াই হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। জেলায় শিল্প-কারখানা গড়ে তুলতে বর্তমানে আরো অর্ধশত কোম্পানি জমি অধিগ্রহণ করেছে।
ভোলায় বিনিয়োগের জন্য বিদেশিরা:
গত বছরের ২৫ আগস্ট বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, গ্যাস সমৃদ্ধ দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা ভোলায় প্রায় ১শ’ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ হতে যাচ্ছে। এর ফলে ভোলায় নতুন একটি বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি হবে। চীনা বিনিয়োগে নির্মিত এই অঞ্চলে মৎস্য ও মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ, দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদন এবং কৃষি-শিল্পভিত্তিক বিভিন্ন কারখানা স্থাপন হবে। নতুন এই অর্থনৈতিক অঞ্চল সম্পূর্ণরূপে চালু হলে সেখানে কর্মসংস্থান হবে প্রায় এক লাখ লোকের।
‘ভোলা ইকো-ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক জোন’ নামের এই অর্থনৈতিক অঞ্চলটি নির্মাণ করবে চীনা ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান লিজ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিজ। বেসরকারি এই অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের জন্য ইতোমধ্যে প্রাথমিক অনুমোদন বা প্রি-কোয়ালিফিকেশন লাইসেন্স পেয়েছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। গত বছরের ২৫ আগস্ট এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছিল।
বেজার সূত্রে জানা গেছে, ভোলা সদর উপজেলায় প্রাথমিকভাবে প্রায় ১০২ দশমিক ৪৬ একর জমিতে এই অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠবে। তা পরবর্তীতে বাড়িয়ে ১৫৮ একর করা হতে পারে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সেখানে বিভিন্ন খাতের প্রায় ৪০টি শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হবে।
প্রাথমিক অনুমোদন পাওয়ার পর এখন বেশ কিছু শর্ত পূরণ সাপেক্ষে চূড়ান্ত অনুমোদন পেতে হবে ভোলা ইকো-ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক জোনকে। এরপর সেখানে বিনিয়োগকারীরা শিল্পকারখানা স্থাপন করতে পারবেন। এ পর্যন্ত মোট ১৩টি বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলকে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে বেজা।
সংস্থাটি জানিয়েছে, নতুন এই অঞ্চলকে একটি পরিবেশবান্ধব, শ্রমঘন ও কৃষিভিত্তিক শিল্প এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান লিজ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিজ ইতোমধ্যে পোশাকবস্ত্রসহ বাংলাদেশে একাধিক খাতে বিনিয়োগ করেছে।
ওই সময়ে বেজার নির্বাহী সদস্য (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মেজর জেনারেল (অব.) মো. নজরুল ইসলাম বলেছেন, ভোলা ইকো-ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক জোন বরিশাল বিভাগের প্রথম অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। এই অঞ্চলটি মৎস্য ও কৃষিজ সম্পদভিত্তিক শিল্প বিকাশে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
ভোলা ইকো-ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক জোনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ঝুয়াং লাইফেং বলেন, চীনা বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বিহীনভূমি হিসেবে ভোলার গ্যাস ও কৃষিসম্পদের সুবিধা কাজে লাগিয়ে বিদেশি বিনিয়োগ আনার সম্ভাবনা রয়েছে।
জেলার নীতিনির্ধারকগণ যা বলছেন:
বিষয়টি নিয়ে কথা হয় ভোলা-১ আসনের সংসদ সদস্য এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ’র সাথে।
তিনি বাসস’কে জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে এবং দিক নির্দেশনায় ভোলায় প্রাপ্ত গ্যাস সম্পদকে কাজে লাগিয়ে উন্নয়নের বিপ্লব ঘটানো হবে। পাশাপাশি উপকূলীয় ভোলা উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় অর্থনৈতিক অঞ্চলের একটি অনন্য রোল মডেল হবে।
এ বিষয়ে ভোলার চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি এবং জেলা পরিষদ প্রশাসক গোলাম নবী আলমগীর গণমাধ্যমকে বলেন, ভোলার গ্যাস পাইপলাইনে কিংবা গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া অনেক ব্যয়বহুল। তবে, এখানেই শিল্পকারখানা তৈরি হলে গ্যাস সস্তায় ব্যবহার করা যাবে। উৎপাদিত পণ্য ভোলার পাশে নদীপথে পায়রা ও চট্টগ্রাম বন্দরে নেয়া যাবে।
দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ঝামেলামুক্ত পরিবেশে বিনিয়োগ করার সুযোগ পাবেন। এতে ভোলা এবং দক্ষিণাঞ্চলের বেকারত্ব দূর হবে।
এ বিষয়ে ভোলার জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমান বাসস’কে বলেন, সম্প্রতি শেষ হওয়া ডিসি সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ভোলার গ্যাস ভোলায় ব্যবহার করে যদি ভোলাতেই শিল্পকারখানা এবং সার কারখানা গড়ে তোলা সম্ভব হয়, তাহলে ব্যবসায়ীরা সহজেই পায়রা এবং চট্টগ্রাম বন্দরে উৎপাদিত পণ্য পৌঁছাতে পারবেন। ভোলাতে পর্যাপ্ত জমি রয়েছে। এখানে শিল্পকারখানা গড়ে উঠলে অবহেলিত ভোলা এবং দক্ষিণাঞ্চলের বেকারত্ব দূর হবে। ‘আমাদের এই সম্পদশালী জেলা উন্নয়ন সূচকে আরো কয়েক ধাপ উন্নত হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন