প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ইউরোপিয়ান সংস্কৃতিতে কৃত্রিম শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই। গোটা বিশ্বে সবচেয়ে কম এসি ব্যবহারের হার ইউরোপে, যেখানে গড় মাত্র ২০ ভাগ।
যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে এসির ব্যবহার ৯০ ভাগ। ইউরোপের স্বল্পকালীন গরম, ঐতিহ্যের প্রতি বিশ্বস্ততা, প্রকৃতি সংরক্ষণে আগ্রহ, এসির উচ্চমূল্য, এবং বিদ্যুৎ ব্যয়ের কারণে ইউরোপের এসির ব্যবহার সীমিত ছিল।
এছাড়া ইউরোপের শতবর্ষী পুরনো বাড়িগুলো নির্মাণের সময় এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যে, বহু ক্ষেত্রে সেখানে এসি স্থাপনের সুযোগই নেই। অনেক ক্ষেত্রে বাড়িতে এসি লাগানোর জন্য কর্তৃপক্ষের অনুমতি লাগতে পারে।
এইসব কারণে এসির ব্যবহারে ইউরোপ বরাবর পিছিয়ে ছিল।
তবে এবারের রেকর্ডভাঙা ও প্রাণঘাতী গরম এসব অভ্যাস পাল্টে দিচ্ছে। ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের তাপমাত্রা ইউরোপীয়দের প্রকৃতি প্রেম ও ঐতিহ্যকে ভুলিয়ে দিচ্ছে। ঠাণ্ডার জন্য এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বাঁচানো। এবারের গরমে ইউরোপে প্রায় ২৮ হাজার মানুষ মারা গেছে। ফলে ইউরোপের মানুষ এখন এসির দোকানে ছুটছে।
এবং ইউরোপ যত গরম হচ্ছে, চীনের এসির বাজারও পাল্লা দিয়ে তত গরম হচ্ছে। সস্তা ও দ্রুত নতুন ডিজাইনের এসি উৎপাদনের সক্ষমতার কারণে ইউরোপের এসির বাজার এখন অনেকটাই চীনের দখলে চলে গেছে।
চীনের প্রধান এসি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো, যেমন মিডিয়া, গ্রী এবং হায়ার, বিদেশে বিশেষ করে ইউরোপে তাদের এসির বিক্রি অনেক বেড়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে।
তবে চীনাদের নির্মিত এসির বাজার বাড়াতে ফ্রান্স, জার্মানি এবং বেলজিয়ামের মতো দেশগুলো নিজেদের শিল্প খাত সুরক্ষিত রাখতে চীনা এসি আমদানির ওপর শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা করছে।
চীনের সরকারি বার্তা সংস্থা সিনহুয়ায় সম্প্রতি শুল্ক আরোপের উদ্যোগগুলোর তীব্র সমালোচনা করে বলা হয়েছে, ‘চীনের ওপর শুল্ক আরোপের জন্য ইউরোপ এখন বড্ড বেশি উত্তপ্ত। চীনা এসি আটকে দিলে ইউরোপের সমস্যার সমাধান হবে না, এটি কেবল সাধারণ মানুষের জীবনকেই আরো কঠিন করবে।’
গত বছর পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও চীনের মধ্যে প্রায় ৩৬০ বিলিয়ন ইউরো রেকর্ড বাণিজ্য ঘাটতি গঠন হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরে চীন ইলেকট্রিক ও হাইব্রিড গাড়ির মতো পণ্যের রপ্তানি ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে, যার ফলে এই ঘাটতি প্রকট হয়েছে। এখন এসির জোয়ার এই বাণিজ্য ঘাটতি আরো বাড়াবে হাঁটা হবে।
সাংহাইভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘টাইডালওয়েভ সলিউশনস’-এর সাপ্লাই চেইন বিশেষজ্ঞ ক্যামেরন জনসন ইয়োরোপের সমস্যা বুঝে বলেছেন, ‘এটি বাণিজ্য আলোচনাকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলেছে। আপনি সরকার হয়ে সাধারণ জনগণকে বলতে পারবেন না যে, দুঃখিত, আপনারা এয়ার কন্ডিশনার পাবেন না, কারণ আমরা চীনের অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা পছন্দ করছি না।’
শুধু ইউরোপ নয়, বিশ্বজুড়ে চীনা পণ্যের প্রাধান্যের মূল কারণ হচ্ছে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা ও নমনীয় সাপ্লাই চেইন। চীন গতিশীলভাবে স্থানীয় চাহিদা বুঝে সেটি অনুযায়ি সাশ্রয়ী মূল্যে এসিসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করতে সক্ষম।
যেমন, ইউরোপে এসির চাহিদা বাড়ার সাথে সাথে মিডিয়া গ্রুপ ইউরোপের বাজারের জন্য বিশেষ ডিজাইনের ‘পোর্টেবল স্প্লিট এসি’ তৈরি করেছে। এটি সহজে বহনযোগ্য, শব্দ কম করে এবং আকারে যথেষ্ট ছোট। তাই এটি ইউরোপের বাড়ির জানালাগুলোকে আটকে দেয় না। ফলে ঐতিহ্যের প্রতি কিছুটা ভালোবাসা বজায় রেখেও ইউরোপীয়রা এসি ব্যবহার করতে পারছেন।
মিডিয়া কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চলতি বছর এই মডেলটির ২ লাখেরও বেশি ইউনিট বিক্রি হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইকুয়ালওশান’ গত মাসে একটি ব্লগ পোস্টে লিখেছে, ‘ইউরোপের গৃহস্থালি সরঞ্জামের বাজার দীর্ঘদিন ধরে বশ, ইলেকট্রোলাক্স, মিলে এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠিত পশ্চিমা ব্র্যান্ডের দখলে ছিল। তবে এখন সেখানে একটি প্রতিযোগিতামূলক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যা পূরণ করার মতো কাঠামোগত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে চীনা কোম্পানিগুলো। মিডিয়ার তৈরি ‘পোর্টেবল স্প্লিট’ এসি মূলত এই পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট রূপ।’ ‘টাইডালওয়েভ সলিউশনস’-এর জনসন বলেন, ‘এটি কেবল শুরু।’
ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রে যখন মূল্যস্ফীতি বাড়তে চলেছে, তখন মানুষ পণ্যের জন্য অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে চাইছে না। তাহলে আপনি কী করবেন? স্বাভাবিকভাবেই, কিছু চীনা পণ্য বেছে নিতেই হবে।
একাধিক কারণে চীনের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কিছুটা মন্থর। তাই চীনেরও ইউরোপের বাজার দখল করা প্রয়োজন। একসময় চীনের রপ্তানির মূল তিনটি পণ্য ছিল- পোশাক, আসবাবপত্র এবং গৃহস্থালি সরঞ্জাম। ইদানীং নতুন তিনটি পণ্য নেতৃত্ব দিচ্ছে- ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং সৌরশক্তি। তবে ইউরোপের ক্রমবর্ধমান বাজার চীনের গৃহস্থালি সরঞ্জাম নির্মাতাদের জন্য পুনর্জাগরণের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
কনসালটেন্সি ফার্ম ‘রোল্যান্ড বার্গার’-এর গ্লোবাল ম্যানেজিং ডিরেক্টর ডেনিস ডেপোক্স বলেছেন, ‘ইউরোপই হলো আসল পুরস্কার। আমি যদি একজন চীনা এয়ার কন্ডিশনার উৎপাদক হতাম, তবে ইউরোপ আমার কাছে একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় বাজার হয়ে উঠতো। সেখানে চাহিদা বাড়ছে, এটি নতুন, সমৃদ্ধ এবং সেখানে লাভের অংশও বেশি।’
তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ‘দুই মাস পর মানুষ ভুলে যাবে যে গ্রীষ্মকালে এয়ার কন্ডিশনার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এটি আবার ফিরে আসবে। এটি কি একটি অর্থপূর্ণ এবং দীর্ঘস্থায়ী সুযোগ? আমি পুরোপুরি নিশ্চিত নই।’ তবে চীনের মাথায় অনেক বুদ্ধি। চীনের একজন সোর্সিং এজেন্ট ইতিমধ্যেই খুচরা বিক্রেতাদের আগামী বছরের জন্য পণ্য মজুত করতে উৎসাহিত করেছেন।
চীনের জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘উইচ্যাট’-এ প্রকাশিত একটি বিপণন ভিডিওতে তিনি শিরোনাম দিয়েছেন, ‘ইউরোপের এসির স্বর্ণালী দৌড়! তীব্র গরম থেকে টাকা কামান।’ পোর্টেবল ফ্যান এবং কুলারে ভরপুর একটি ঘরের দিকে ঘুরে এবং আঙুল নির্দেশ করে তিনি বলেন, ‘২০২৭ সালের উন্মাদনা শুরু হওয়ার আগেই বাজারে আপনার অবস্থান সুরক্ষিত করুন।’
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন