প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ভারতে পাচারের আগে বর্তমানে দায়িত্বে থাকা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকেও টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন সেল (টিএফআই সেল) বা ‘আয়নাঘরে’ রাখা হয়েছিল, এমনটি জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
শনিবার (১ আগস্ট) সকালে র্যাবের গোপন বন্দিশালা টিএফআই সেল পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের এই তথ্য জানান।
আমিনুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যবিধির রুল ৪৬এ, রোম সংবিধির সংশ্লিষ্ট বিধান এবং দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিচারকদের ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সুযোগ রয়েছে। প্রসিকিউশনের আবেদনের ভিত্তিতে ট্রাইব্যুনাল বিচারিক পরিদর্শনের অনুমতি দিয়েছেন।
তিনি উল্লেখ করেন, এত দিন ‘আয়নাঘর’ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা হলেও, বিচারকদের শুধু নথি কিংবা সাক্ষ্যের ওপর নির্ভর না করে সরেজমিনে ঘটনাস্থল দেখানোর উদ্দেশ্যেই এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পরিদর্শনের পর্যবেক্ষণ একটি মেমোরেন্ডামে লিপিবদ্ধ হবে, যা মামলার বিচারিক নথির অংশ হিসেবে সংরক্ষিত থাকবে।
চিফ প্রসিকিউটর জানান, পরিদর্শনে ভবনের ভিতরে মোট ২২টি ছোট-বড় কক্ষের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। তিনি উল্লেখ করেন, কয়েকটি কক্ষের সাইজ এতটাই ছোট যে সেখানে একজন মানুষের স্বাভাবিকভাবে শুয়ে থাকাও সম্ভব নয়। তদন্তে পাওয়া সাক্ষ্য অনুসারে, এসব কক্ষে ব্যক্তিদের হাত ও চোখ বেঁধে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর আটকে রাখা হতো। তাদের ওপর বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন চালানোর অভিযোগও রয়েছে। পরে অনেককে বিভিন্ন মামলায় আদালতে সোপর্দ করার পরও অনেকে আর ফিরে আসেননি।
তিনি আরও বলেন, এখনও পর্যন্ত প্রায় আড়াই শতাধিক গুম হওয়া ব্যক্তির কোনো সন্ধান মেলেনি এবং তাদের মধ্যে বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলীসহ আরও অনেকে রয়েছেন। গত বছরের আগস্টের পর কয়েকজন ভুক্তভোগী ফিরে এসে যে বর্ণনা দিয়েছেন, তার সঙ্গে মিলিয়ে আয়নাঘরের কিছু নির্দিষ্ট কক্ষ শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
আমিনুল ইসলাম জানান, ব্যারিস্টার আরমানকে যে কক্ষে রাখা হয়েছিল বলে তিনি বর্ণনা দিয়েছেন, তদন্তকারীরা সেটিও শনাক্ত করেছেন। একইভাবে, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে র্যাব-১ এর এই স্থাপনায় একটি কক্ষে আটকে রাখার এবং পরে তাকে ভারতে নিয়ে যাওয়ার তথ্যও প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
আমিনুল ইসলাম আরও জানান, র্যাব-১ এর টিএফআই সেল পরিদর্শনের পর, এবার ঢাকা সেনানিবাসের ভেতরে ডিজিএফআই-সংশ্লিষ্ট কথিত আরেকটি গোপন আটককেন্দ্র, জেআইসি, পরিদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউশনের আবেদনের ভিত্তিতে, আগামী শনিবার বিচারকেরা সেখানে বিচারিক পরিদর্শনে যাবেন।
আইনগত বিষয় তুলে ধরে আমিনুল ইসলাম বলেন, সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কাউকে গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিকটস্থ ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হয় এবং গ্রেপ্তারের কারণ জানাতে হয়। একই বাধ্যবাধকতা রয়েছে ফৌজদারি কার্যবিধির ৬১ ও ১৬৭ ধারায়। কিন্তু আয়নাঘরে আটক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এসব সাংবিধানিক ও আইনগত বিধান অনুসরণ করা হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, অবৈধভাবে দীর্ঘ সময় আটকে রাখা, গুম, নির্যাতন ও হত্যার মতো অভিযোগগুলো শুধুমাত্র আইন লঙ্ঘনের বিষয় নয়; এগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। এসব অভিযোগের উপর ইতিমধ্যে বিচার চলছে এবং আরও অনেক ঘটনার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
প্রসঙ্গত, র্যাবের টিএফআই সেল পরিদর্শন করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর তিন বিচারপতি, প্রসিকিউশন টিম এবং টিএফআই সেলের গুমের মামলায় আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। সকাল সাড়ে ১০টার পরে তারা রাজধানীর উত্তরায় র্যাব-১ এর কার্যালয়ে পৌঁছান।
এছাড়া, টিএফআই সেলের গুমের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় মোট আসামি ১৭ জন রয়েছে। তাদের মধ্যে ১০ জন অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তা গ্রেফতার রয়েছে। তারা তখন র্যাবে দায়িত্ব পালন করছিলেন বলে জানা গেছে।
এ মামলার আসামি ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার সাবেক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, এম খুরশীদ হোসেন, মো. হারুন অর রশিদ এবং অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল মুহাম্মাদ খায়রুল ইসলাম পলাতক রয়েছেন।
এর আগে, ২১ জুলাই চিফ প্রসিকিউটরের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ টিএফআই সেল পরিদর্শনের আবেদন মঞ্জুর করেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন