প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
প্রায় চার মাসের যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর, এখন সব পক্ষ নিজেদের জয়-পরাজয় ও লাভ-ক্ষতির হিসাব কষছে। মাঠের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করলে ইরান অবশ্যই পিছিয়ে থাকবে।
তবে যুদ্ধে টিকে থেকেও বড় এক জয়ের দেখা ইরান পেয়ে গেছে। শুরুতে ইরানের সরকার পরিবর্তন ও তাদের হাতে থাকা ইউরেনিয়াম নিয়ে যাওয়ার যে ঘোষণা ছিল, দৃশ্যমান তেমন কোনো অর্জন ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতায় আসতে বাধ্য হয়েছে। ইরানের সরকার বদল ঘটেনি, বরং যুদ্ধ তাদের আরো ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী করেছে। এই সুযোগে ইরান সরকার যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি স্বীকৃতিও আদায় করেছে।
ইরান যে সবচেয়ে বড় লাভ পাবে, তা হলো দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা কোটি কোটি ডলার এখন তাদের হাতে আসবে। এই অর্থ তাদের বিপর্যস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে। নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার কারণে ইরান তেল বিক্রি করেও অনেক বেশি লাভবান হবে।
এই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে রয়েছে ইসরায়েল। মূলত, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ফুঁসলিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এই অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধে টেনে এনেছিলেন। কিন্তু এখন তাকে ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতায় পৌঁছেছে। যুদ্ধের শুরুতে নেতানিয়াহুর মূল ভূমিকায় থাকা সত্ত্বেও পরবর্তী ঘটনাগুলিতে তার কোনও ভূমিকা নেই। বরং ট্রাম্প একাধিকবার নেতানিয়াহুর আচরণে প্রকাশ্যে উষ্মা প্রকাশ করেছেন। নেতানিয়াহু এখন সমঝোতা স্মারক ভণ্ডুল করতে উঠেপড়ে লেগেছেন। সমঝোতা স্মারকের স্বাক্ষরের পরও তিনি লেবাননে হামলা চালিয়ে শান্তি প্রক্রিয়াকে বিঘ্নিত করতে চাইছেন।
যুদ্ধে সরাসরি জড়িত না হয়েও চীন লাভের গুড়ে অনেকটা ভাগ বসাতে পেরেছে। ভারসাম্যপূর্ণ এবং কৌশলী কূটনীতি দিয়ে চীন বিশ্বের কাছে নিজেদের দায়িত্বশীল শক্তি হিসেবে পরিচিত করতে সক্ষম হয়েছে। ইরান যুদ্ধে চীনের ভাবমূর্তি দারুণ উজ্জ্বল হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে চীন বরাবরই নিজেদের যৌক্তিক অবস্থান বজায় রেখেছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের নিন্দা করেছে, আবার শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে ভূমিকাও রেখেছে। ইরান থেকে তেল কেনা বন্ধ না করেও চীন ট্রাম্পের কাছ থেকে প্রশংসা অর্জন করেছে।
বুধবার ফ্রান্সে জি৭ শীর্ষ সম্মেলনের এক সংবাদ সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্টের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমি চীন ও প্রেসিডেন্ট শি-কে ধন্যবাদ জানাতে চাই। তিনি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ছিলেন, একদম নিরপেক্ষ এবং আমি তথ্যে প্রশংসা করি।’
ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ অমান্য করতে চীনা নেতা তার দেশের নৌ-শক্তি ব্যবহার করেননি উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা সেটি করেনি। প্রেসিডেন্ট শি আমাকে সাহায্য করেছেন। তিনি সাহায্য করার চেষ্টা করেছিলেন এবং আমার মনে হয় এটি সমাধানে সম্ভবত তিনি সাহায্য করেছেন।’
এখানে বেইজিংয়ের কৌশলী কূটনীতির জয় হয়েছে। নিজেদের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখেই তারা বিশ্ব শক্তির ওপর নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং এই সংঘাতের মূল মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের নেতারা বেইজিং সফর করেছেন। এই সফরে বিশ্ব শক্তি হিসেবে চীন নিজেদের আবার ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছে। যদিও পুরো প্রক্রিয়ায় থেকেও চীন কোনো পক্ষ নেয়নি। শান্তি আলোচনার শুরুর সময়ে ইরান যে কোনো চুক্তিতে চীনকে গ্যারান্টার হিসেবে রাখতে চেয়েছিল কিন্তু চীন কৌশলে তা এড়িয়ে গিয়ে নিজেদের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতিকেই সামনে এনেছে বারবার।
যুদ্ধ শুরুর প্রতিক্রিয়ায় হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দেয়। অন্যান্য দেশের তুলনায় চীন এ সংকট মোকাবেলা করেছে দারুণ দক্ষতায়। জ্বালানি তেলের কৌশলগত বিশাল মজুদ এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহারের কারণে জ্বালানি তেলের সংকটের অভিঘাত খুব একটা লাগেনি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির ওপর।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সক্রিয় ভূমিকা পালনে প্রস্তুত রয়েছে বেইজিং। এই চুক্তির পেছনে বেইজিংয়ের কোনো ভূমিকা ছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে লিন জিয়ান নির্দিষ্ট কোনো ভূমিকার কথা নিশ্চিত করেননি। তবে যুদ্ধ বন্ধে চীনের অক্লান্ত প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করেছেন। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে চীনের শীর্ষ নেতা শি জিনপিংয়ের পেশ করা চার দফা শান্তি প্রস্তাবের বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন।
বুধবার চীনের শীর্ষ কূটনীতিক ওয়াং ই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচির সঙ্গে ফোনে কথা বলেন এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচলের বিষয়টি সঠিকভাবে সামলানোর আহ্বান জানান। ওয়াং বলেন, ‘শান্তির আলো দেখা দিয়েছে। পরবর্তী পদক্ষেপের মূল চাবিকাঠি হলো সব পক্ষের নিজেদের প্রতিশ্রুতিগুলো সত্যিকার অর্থে বাস্তবায়ন করা এবং সব দিক থেকে আসা হস্তক্ষেপ দূর করা।’
চীনের এসব ভূমিকা বিশ্বের কাছে এটি বার্তা দিয়েছে—অন্যরা যখন যুদ্ধ ছড়াচ্ছে, তখন চীন একটি দায়িত্বশীল বৈশ্বিক শক্তি এবং প্রভাবশালী মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। এই যুদ্ধ প্রতিরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতাকে সামনে এনেছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো অন্ধের মতো যুক্তরাষ্ট্র-নির্ভরতা নিয়ে এখন নতুন করে ভাবছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে চীন বিশ্বের পরাশক্তি হয়ে উঠবে কিনা, এমন আলোচনা সামনে এসেছে। তবে চীনের কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের ধাঁচের কোনো পরাশক্তি হতে চায় না।
বেইজিংয়ের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজি’র ফেলো সান চেংহাও বলেছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র এখনো সবচেয়ে শক্তিশালী বহিরাগত পক্ষ হিসেবে রয়ে গেছে। পরিবর্তনের মধ্যে আছে শুধু এটিই, সেখানে তাদের আধিপত্য বজায় রাখতে এখন অনেক বেশি রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক এবং সম্মানহানির মূল্য দিতে হচ্ছে।’
চীন বরাবরই সব দেশের সার্বভৌমত্ব, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, রাজনৈতিক সমাধান এবং উন্নয়নভিত্তিক নিরাপত্তার ওপর জোর দেয়। এবারের যুদ্ধে তাদের সেই দর্শন আবার সামনে এসেছে এবং প্রশংসিত হয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন