প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সৌদি আরব এবং ১৩টি দেশ বাব এল-মান্দেব প্রণালি, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি বহুজাতিক সামুদ্রিক সামরিক জোট গঠন করার ঘোষণা দিয়েছে। সেইসাথে আরও বেশ কিছু দেশ এই জোটে যোগ দিতে পারে বলে জানা যাচ্ছে।
প্রথম পর্যায়ে বাহরাইন, বাংলাদেশ, কমোরোস, জিবুতি, মিসর, জর্ডান, কুয়েত, পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব, সোমালিয়া, সুদান, তুরস্ক ও ইয়েমেন এই জোটে যোগ দিয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, মোট ১৫টি দেশ একটি যৌথ ঘোষণায় সই করেছে। এর মধ্যে ১৩টি দেশ ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে জোটে যোগ দেওয়ার প্রক্রিয়া শেষ করেছে।
এর আগে, ৩০ জুলাই সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় একটি মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স গঠনের ঘোষণা দিয়েছিল। এর লক্ষ্য হলো, সদস্য দেশগুলোর মধ্যে যৌথ সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করা।
সৌদি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এটি একটি উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক জোট। একই লক্ষ্য ও নীতিতে বিশ্বাসী যেকোনো দেশ এতে যোগ দিতে পারবে। নতুন সদস্য হওয়ার আবেদনও গ্রহণ করা হচ্ছে।
গত ১৩ আগস্ট, সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, জোটের তৃতীয় বৈঠক জেদ্দায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। এরপর জোটটি বাস্তবে কার্যক্রম শুরু করার পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
জোটের সদস্য দেশগুলো নিজেদের মধ্যে তথ্য ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করবে, সামরিক পরিকল্পনা তৈরি করবে এবং যৌথ নৌ মহড়া ও প্রশিক্ষণ পরিচালনা করবে। এ ছাড়াও, সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং যৌথ নৌ অভিযান পরিচালনার বিষয়েও কাজ করবে।
জোটের কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে রিয়ার অ্যাডমিরাল আবদুল্লাহ বিন সালেম আল-শেহরিকে। তিনি যৌথ নৌ প্রতিরক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা, সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় এবং জোটের সনদ অনুযায়ী বিভিন্ন অভিযান তদারক করবেন।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা যখন তীব্র, ঠিক সেই সময় এই জোট গঠনের ঘোষণা এসেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের যুদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি ও বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলছে।
একই সময়ে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরেও উত্তেজনা বেড়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি বড় চাপ তৈরি হয়েছে। আগে বিশ্বব্যাপী ২০ শতাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।
অন্যদিকে, বাব এল-মান্দেব, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগর দিয়ে চলাচলকারী সৌদি পতাকাবাহী জাহাজগুলোও ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতিদের হামলার শিকার হচ্ছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইয়েমেনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আহমেদ নাগি বলেন, নতুন এই সামুদ্রিক জোট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে বাস্তবে এটি কতটা কার্যকর হয়, তার ওপরই এর গুরুত্ব নির্ভর করবে।
তার মতে, এর আগে এডেন উপসাগরে জলদস্যুতা মোকাবিলায় বেশ কয়েকটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিছু উদ্যোগ রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত ফল আনতে পারেনি।
নতুন জোটের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য হবে। রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দিতে পারলে এবং সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলে জোটটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আহমেদ নাগির মতে, এই জোটের মাধ্যমে সৌদি আরব শুধু হুতিদের নিরস্ত করতে চাচ্ছে না। একই সাথে লোহিত সাগরে হুতিদের জাহাজে হামলার বিষয়টিকে শুধুমাত্র সৌদি আরবের সমস্যা হিসেবে নয়, বরং একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা হিসেবে তুলে ধরতে চাচ্ছে।
ইরান-সমর্থিত হুতিরা ২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে। এরপর থেকে তারা বন্দরনগরী এডেনে অবস্থানরত সৌদি-সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের যুদ্ধ পুনরায় শুরু হওয়ার পর এই উত্তেজনা আরও বেড়েছে। এরপর ইরান-সমর্থিত হুতিরা লোহিত সাগরে সৌদি পতাকাবাহী জাহাজ ও তেল স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।
এই সংঘাতের ফলে বাব আল-মানদাব পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নাগি বলেন, সৌদি আরবের দৃষ্টিতে এসব হামলার দায় শুধুমাত্র রিয়াদের ওপর থাকা উচিত নয়। হুতিদের মোকাবিলা এবং লোহিত সাগরে নৌ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, আপাতত জোটটি মূলত প্রতিরক্ষামূলক জোট। হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ চালানোর কোনো পরিকল্পনার কথা এখনো জানা যায়নি। তবে হামলা অব্যাহত থাকলে সৌদি আরব নীরব থাকবে, এমনটি নিশ্চিত নয়।
যদি পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়, তাহলে রিয়াদ সরাসরি পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সেক্ষেত্রে, এই জোট সৌদি আরবকে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সমর্থন নিয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার একটি কাঠামো দিতে পারে। শেষ পর্যন্ত এই জোটের লক্ষ্য হলো, হুতিদের হামলার খরচ বাড়ানো এবং তাদের হামলা ঠেকাতে আরও শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
সৌদি আরব মূলত যে বার্তা দিতে চাইছে তা হলো, হুতিদের হামলা শুধু সৌদি স্বার্থের ওপর আঘাত নয়। এসব হামলা আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল ও বৈশ্বিক বাণিজ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাই এটি পুরো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগের বিষয়।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন