প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
যুক্তরাষ্ট্রকে জাতিসংঘ থেকে প্রত্যাহারের পক্ষে একটি প্রস্তাব বাস্তবায়নে ওয়াশিংটনে একটি বড় লবিং প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ করেছিল ইসরায়েলের কট্টরপন্থী একটি থিংকট্যাংক।
ওই প্রতিষ্ঠানটি ট্রাম্প প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও মার্কিন কংগ্রেসের সদস্যদের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের জাতিসংঘ ছাড়ার পক্ষে প্রতিবেদন তুলে ধরতে লবিং চালায়।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য। যুক্তরাষ্ট্রের লবিং-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করে হারেৎজ জানিয়েছে, মিসগাভ ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড জায়নিস্ট স্ট্র্যাটেজি এ প্রচারের জন্য মার্কারি পাবলিক অ্যাফেয়ার্সকে নিয়োগ দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রকে জাতিসংঘ থেকে প্রত্যাহারের পক্ষে তৈরি করা একটি প্রতিবেদন প্রচারের দায়িত্ব ছিল প্রতিষ্ঠানটির ওপর। 'ফ্রম ইউএন ব্যুরোক্রেসি টু আমেরিকান গ্লোবাল লিডারশিপ' শিরোনামের ওই প্রতিবেদনের সহলেখক সাবেক ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত গিলাদ এরদান এবং মিসগাভের নির্বাহী পরিচালক আশের ফ্রেডম্যান।
প্রতিবেদনটিতে যুক্তরাষ্ট্রকে জাতিসংঘ থেকে প্রত্যাহারের পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, নিজেদের স্বার্থ এগিয়ে নিতে ওয়াশিংটনের উচিত জাতিসংঘের বিকল্প বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থা গড়ে তোলা অথবা বিদ্যমান বিকল্পগুলোর মাধ্যমে কাজ করা।
হারেৎজ জানিয়েছে, এই প্রতিবেদন প্রচারের জন্য মিসগাভ এক মাসের একটি চুক্তিতে মার্কারিকে ৫ হাজার ডলার দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছিল। চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২৪ জুলাই।
লবিং চুক্তি অনুসারে, মার্কারির দায়িত্ব ছিল কংগ্রেসের সদস্য ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রতিবেদনটি বিতরণ করা। পাশাপাশি প্রতিবেদনটির দুই লেখককে কংগ্রেস ও ট্রাম্প প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠকের ব্যবস্থা করার দায়িত্বও ছিল প্রতিষ্ঠানটির।
এই লবিংয়ের আওতায় মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষকে লক্ষ্য করা হয়। এর মধ্যে পররাষ্ট্রবিষয়ক, সশস্ত্র বাহিনী এবং অর্থ বরাদ্দসংক্রান্ত কমিটিও ছিল। একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ, পররাষ্ট্র দপ্তর, জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের মিশন এবং হোয়াইট হাউসের অফিস অব ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড বাজেটের কর্মকর্তাদেরও লক্ষ্য করা হয়েছিল বলে হারেৎজ জানিয়েছে।
লবিং কার্যক্রমের দ্বিতীয় ধাপে, মিসগাভের প্রতিনিধিদের জন্য তিন দিনের একটি ওয়াশিংটন সফরের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ওই সফরে আইনপ্রণেতা, প্রশাসনের কর্মকর্তা, নীতিবিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন থিংকট্যাংকের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের কথা ছিল।
মিসগাভ জানিয়েছে, এই ব্যবস্থা ছিল সীমিত পরিসরের। এর উদ্দেশ্য ছিল আশের ফ্রেডম্যানকে ওয়াশিংটনে স্বল্পমেয়াদি সফরের সময় নীতিনির্ধারকদের কাছে গবেষণাটির ফলাফল তুলে ধরতে সহায়তা করা।
এই লবিং কার্যক্রম এমন সময়ে চালানো হয়, যখন ট্রাম্প প্রশাসন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে বৃহত্তর পরিসরে সরে যাওয়ার নীতি অনুসরণ করছে। একই সময়ে ইসরায়েলের সঙ্গে ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও বজায় রয়েছে। তবে গাজা ও লেবাননের সংঘাত অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত উদ্যোগ নিয়ে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ওয়াশিংটন ও ইসরায়েলি সরকারের মধ্যে মতবিরোধও বেড়েছে।
প্রতিবেদনটিতে দাবি করা হয়েছে, জাতিসংঘ কাঠামোগতভাবে অর্থবহ কোনো সংস্কার করতে অক্ষম। এতে জাতিসংঘকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করারও অভিযোগ করা হয়েছে।
হারেৎজের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লেখকদের মধ্যে উল্লেখ রয়েছে, ‘ইসরায়েলের প্রতি জাতিসংঘের আচরণের চেয়ে কোথাও সংস্থাটির রাজনীতিকরণ ও দ্বৈত মানদণ্ড এত স্পষ্ট নয়।’
জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএকেও প্রতিবেদনে টার্গেট করা হয়েছে। গাজা ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অঞ্চলে সংস্থাটির কার্যক্রম নিয়ে ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে চাপ দিয়ে আসছে।
গিলাদ এরদান ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। ওই সময়ের একটি অংশে তিনি একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রেও ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন।
জাতিসংঘে দায়িত্ব পালনকালে এরদান সংস্থাটি এবং এর মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের অন্যতম প্রধান সমালোচকে পরিণত হন। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলা এবং পরবর্তী গাজা যুদ্ধের পর তিনি জাতিসংঘ ও গুতেরেসের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য সমালোচনা আরও জোরালো করেন।
এদিকে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনেস্কো এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহারের পদক্ষেপ নেন। একই সঙ্গে তিনি ইউএনআরডব্লিউএর অর্থায়ন বন্ধ করেন এবং প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকেও যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ট্রাম্প আরও ৬৬টি আন্তর্জাতিক সংস্থা ও জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন। যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ ও অর্থায়ন পর্যালোচনার পর দেওয়া ওই নির্দেশের আওতায় জাতিসংঘ ব্যবস্থার ৩১টি সংস্থাও ছিল।
লবিংয়ের এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন এজেন্টস রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্টের আওতায় প্রকাশ করা হয়েছে। এই আইনের অধীনে বিদেশি কোনো পক্ষের হয়ে নির্দিষ্ট ধরনের রাজনৈতিক বা প্রচারমূলক কার্যক্রম পরিচালনাকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধন করতে হয় এবং তাদের কার্যক্রমের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করতে হয়।
মিসগাভ জানিয়েছে, মার্কারি কংগ্রেস ও প্রশাসনের উপদেষ্টাদের সঙ্গে প্রায় পাঁচটি বৈঠকের ব্যবস্থা করেছিল। এসব বৈঠকে ফ্রেডম্যান প্রতিবেদনটির ফলাফল উপস্থাপন করেন।
প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, মার্কারির সঙ্গে তাদের এখন আর কোনো সম্পর্ক নেই। মিসগাভের ভাষ্য, প্রতিবেদনটির মূল বিষয় ছিল জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তারা যেসব কর্মকাণ্ডকে ইসরায়েলবিরোধী, আমেরিকাবিরোধী ও পশ্চিমবিরোধী বলে মনে করে, সেগুলোর পর্যালোচনা। প্রতিবেদনে জাতিসংঘের কিছু সংস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন নতুন করে মূল্যায়নের সুপারিশও করা হয়েছে।
লবিং কার্যক্রমকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার যে কোনো ইঙ্গিত প্রত্যাখ্যান করে মিসগাভ নিজেদের ‘স্বাধীন, পেশাদার গবেষণা প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
হারেৎজের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে মিসগাভ প্রায় ৭০ লাখ ইসরায়েলি শেকেল বা প্রায় ২৩ লাখ ডলার অনুদান পেয়েছে। এই অর্থের বেশির ভাগই এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি অলাভজনক সংস্থার মাধ্যমে। তবে ওই অর্থের মূল দাতাদের পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন