প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
আর্থিক শৃঙ্খলা রক্ষা করাই বর্তমান সরকারের ‘টপ প্রায়োরিটি’ বা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন পুরো ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টরে এখন একটি ‘ক্লিনিং প্রসেস’ বা পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলছে। ব্যাংক এবং আর্থিক খাতে গত কয়েক বছরে সংঘটিত সব অনিয়ম, দুর্নীতি এবং লুটপাটের তদন্ত হচ্ছে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে অব্যাহত রয়েছে।
রোববার (১২ জুলাই) জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সদস্যদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
এদিন সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের অনিয়ম ও ঋণ খেলাপি নিয়ে প্রশ্ন করেন গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সালাহ উদ্দিন।
তিনি অভিযোগ করেন, বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে তদবির, ঘুষ-বাণিজ্য এবং সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লোনের নামে লুটপাট করা হয়েছে। যার ফলস্বরূপ ব্যাংকটির প্রায় ৬১ শতাংশ ঋণই এখন খেলাপি। তিনি উল্লেখ করেন যে, এখনও সেই পুরোনো সিন্ডিকেট লোন উত্তোলন ও দেওয়ার চেষ্টা করছে এবং তিনি এই সিন্ডিকেট ভাঙা ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান।
এমপি সালাউদ্দিনের এ প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, আর্থিক শৃঙ্খলা ফেরানো এ সরকারের প্রধান লক্ষ্য। আর্থিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দিকে যেতে হলে এটি নিশ্চিত করতেই হবে। কেবল একটি ব্যাংক নয়, অনেকগুলো ব্যাংকে কী ঘটেছে তা নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। অনেকের বিরুদ্ধে এরই মধ্যে অ্যাকশন নেওয়া হয়েছে। পুরো আর্থিক খাতের জঞ্জাল রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়, তবে এই পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চলমান থাকবে।
এরপর ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য ফারহানা সরাইল, আশুগঞ্জ এবং বিজয়নগর এলাকার কৃষিপণ্য সংরক্ষণাগার (হিমাগার) ও কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপনে স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিকল্পনার বিষয়ে জানতে চান। জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব অর্থায়নে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প স্থাপনের জন্য চলমান তহবিলের পরিমাণ ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ২ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।
এ তহবিলের আওতায় উদ্যোক্তারা ৭ শতাংশ সুদে সর্বাধিক ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা পাচ্ছেন, যেখানে গ্রামীণ এলাকা অগ্রাধিকার পাচ্ছে। এছাড়া কৃষি এবং পল্লী খাতের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার একটি পুনরর্থায়ন স্কিম গঠন করা হয়েছে; চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি খাতে ঋণ বিতরণের জন্য ৩৯ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আমদানি বিকল্প ফসল চাষে ৪ শতাংশ রেয়াতি সুদে ঋণ বিতরণ করা হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী জানান, এসব সুবিধা দেশের জন্য প্রযোজ্য হওয়ায় নির্দিষ্ট করে কোনো উপজেলার জন্য আলাদা করে ঋণ সুবিধা চালুর প্রয়োজন নেই।
এ বক্তব্যের পর একটি সম্পূরক প্রশ্ন করেন সংসদ সদস্য ফারহানা। তিনি অভিযোগ করেন, রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, রূপালী, জনতা, অগ্রণী এবং বেসিক ব্যাংকে গত ১৫ বছরে যে পরিমাণ ঋণ দেওয়া হয়েছে, তার প্রায় ৫০ থেকে ৭০ শতাংশই খেলাপি। বিশেষ করে জনতা ব্যাংকের ৭০ শতাংশ খেলাপি ঋণই এসআরএম, বেক্সিমকো, অ্যালন টেক্স গ্রুপ এবং বিসমিল্লাহ গ্রুপের মতো নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হয়েছে। যারা এ বিপুল পরিমাণ টাকা লুটপাট করে পরিশোধ করেনি, তাদের বিরুদ্ধে সরকার কী ব্যবস্থা নিচ্ছে তা জানতে চান তিনি।
জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রশ্নটি মূল বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত না হলেও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যারা দেশের টাকা লুটপাট করে বিদেশে গেছেন, তাদের ব্যাপারে এ সরকার কোনো কম্প্রোমাইজ বা আপস করবে না। অনেকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, তদন্ত চলছে এবং সম্পত্তি ক্রোকের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। সংসদে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য এর আগেই দেওয়া হয়েছে এবং এই কঠোর ধারা বজায় থাকবে বলে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন।
এরপর কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য আতিকুর রহমান মুজাহিদ তার অঞ্চলের কৃষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের দুর্বলতা ও অনিয়মের প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, এই ব্যাংকটিকে নিয়ে নানা অনিয়মের খবর প্রকাশ পায়। আগে এখানে একটি গোষ্ঠী আওয়ামী লীগের নামে লুটপাট করেছে এবং এখন তারা খোলস বদলে বিএনপির নাম ভাঙিয়ে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে। এই ব্যাংকটিকে কৃষকবান্ধব করতে এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে তদন্তের কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা তা জানতে চান তিনি।
আতিকুর রহমান মুজাহিদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, বর্তমান সরকারের অধীনে আওয়ামী লীগের পরিবর্তে বিএনপির ব্যাংক দখল প্রক্রিয়া বা প্রভাব বিস্তারের কোনো সুযোগ নেই। কোনো ব্যাংকেই এখন রাজনৈতিক বিবেচনায় কোনো নিয়োগ বা পলিটিক্যাল অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেওয়া হচ্ছে না। ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ও ম্যানেজমেন্টের সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে বর্তমানে একটি গভীর বিশ্লেষণ এবং পর্যালোচনা চলছে, যা সম্পন্ন হলে ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান হবে।
এরপর চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার যুব সমাজের কর্মসংস্থান ও তথ্য প্রযুক্তির বিকাশ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান। ডাক, টেলিযোগাযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলায় তথ্যপ্রযুক্তির শিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিতের পাশাপাশি উপজেলা সেবা ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। যুব সমাজের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারের এই আইসিটি অবকাঠামো উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রামীণ জনপদে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে বলে জানান তিনি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন