প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো (ডিআর কঙ্গো) পূর্বাঞ্চলে সম্প্রতি ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় দেশটির কবিরাজদের রয়েছে বিভিন্ন প্রচেষ্টা। দেশটির অনেক মানুষের মধ্যে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে সন্দেহ থাকলেও ভেষজ উপাদান ও প্রথাগত বিভিন্ন পদ্ধতির মাধ্যমে কবিরাজরা রোগীদের মধ্যে আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন।
বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর প্রচার করেছে।
ডিআর কঙ্গোর ইতুরি প্রদেশের বুনিয়া শহরের কবিরাজ মরিয়ম কাবিকা তার নিজস্ব বাগানে ভেষজ উপাদান খুঁজছেন। তিনি বলছেন, ‘আমি ইউক্যালিপটাস, অ্যাভোকাডো, আম ও পেঁপের পাতা খুঁজছি।’
তিনি আরও জানান, ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা করতে মরিয়ম কাবিকার মতো লোকজ কবিরাজরা বিভিন্ন ভেষজ উপাদান যেমন ইউক্যালিপটাস, অ্যাভোকাডো, আম ও পেঁপে পাতা ব্যবহার করছেন।
বিশাল আয়তনের দেশে অবস্থিত ইতুরি খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ হলেও, বহু কষ্টের মধ্যে রয়েছে। কয়েক দশকের সংঘাতে বিধ্বস্ত হওয়ায় এ অঞ্চলে সরকারি সেবার উপস্থিতি খুবই সীমিত।
গত ১৫ মে যখন ইবোলা প্রাদুর্ভাব ঘোষণা করা হয়, তখন এটি মধ্য আফ্রিকার দেশটির ১৭তম প্রাদুর্ভাব হিসেবে চিহ্নিত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৩৫৯ জনের মধ্যে ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে, এবং তাদের মধ্যে ৬১ জন মারা গেছেন।
ইবোলা মোকাবেলায় স্বাস্থ্যকর্মীরা যখন এলাকায় পৌঁছান, তখন তাদের সম্মুখীন হতে হয় স্থানীয় জনগণের অবিশ্বাসের। অন্যদিকে, স্থানীয় জনগণের আস্থাভাজন লোকজ চিকিৎসকেরা রোগটির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সামনের সারিতে রয়েছেন। ইবোলা ভাইরাস এই রোগের জন্য ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে ও আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের তরলের সরাসরি সংস্পর্শে ছড়ায়।
বর্তমান যেটি প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী তা হল বুন্ডিবুগিও ধরনের ইবোলা, যার জন্য কোনো টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। কিন্তু কাবিকা ও তার স্বামী দাউদা শিমাঙ্গা দাবি করেছেন, তারা এই রোগের চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন।
শিমাঙ্গা জানান, তাদের চিকিৎসাকেন্দ্রটি একটি খড়ের ছাউনি দেওয়া কুঁড়েঘর। সেখানে রয়েছে তাবিজ, অশুভ আত্মাদের তাড়ানোর সুগন্ধি ও ভেষজ ওষুধ। তারা বলছেন, এটি তাদের ‘পূর্বপুরুষদের গবেষণাগার।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের তৈরি ভেষজে যদি রোগী সুস্থ না হন, তাহলে আমরা তাকে এই গবেষণাগারে আনি। এরপর আমরা আত্মাদের ডাকি এবং পূর্বপুরুষদের সাহায্য চাই।’
শিমাঙ্গার দাবি, সেদ্ধ করা বিভিন্ন গাছের বাষ্প দিনে তিনবার, টানা তিন দিন গ্রহণ করলে ইবোলা থেকে মুক্তি সম্ভব। তিনি বলেন, এখনও কোনো রোগী এই চিকিৎসা গ্রহণ করেননি हालाँकि পূর্বের প্রাদুর্ভাবগুলোর সময় ‘রক্তক্ষরণ ও জ্বরে আক্রান্ত অনেক মানুষকে আমরা সুস্থ করেছি।’
তিনি আরও বলেন, এ রোগের চিকিৎসা ও প্রতিরোধ কার্যক্রমে এখনও সনাতন চিকিৎসা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তবে আমরা অবদান রাখতে প্রস্তুত।
ডিআর কঙ্গোতে এ ধরনের চিকিৎসকদের ‘ট্র্যাডি-প্র্যাকটিশনার’ হিসাবে পরিচিত করা হয়। পেশাটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত নয়, তবে এটি নিয়ন্ত্রিত এবং তাত্ত্বিকভাবে লাইসেন্সপ্রাপ্ত।
পূর্ব কঙ্গোর বহু এলাকায় স্বাস্থ্য অবকাঠামো ভেঙে পড়েছে অথবা একেবারেই নেই। এখানে এই রোগটিকে প্রায়ই শত্রু, প্রতিবেশী, সহকর্মী অথবা আত্মীয়ের বিষ প্রয়োগের ফল বলে মনে করা হয়। ফলে লোকজন সাহায্যের জন্য লোকজ চিকিৎসকদের কাছে গিয়ে থাকে।
বুনিয়ার চিকিৎসক উইলি বেইজা বলেন, ‘অনেক ইবোলা রোগী মনে করেন তারা বিষপ্রয়োগের শিকার। তাই তারা ট্যাডি-প্র্যাকটিশনারদের কাছে যান, যারা মাত্রা বা তদারকি ছাড়াই ঐতিহ্যবাহী ওষুধ প্রদান করে।’
তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, এতে রোগ নির্ণয় ও চিকিত্সা বিলম্বিত হয়। রোগীদের প্রায় সময় সংকটাপন্ন অবস্থায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়।
গত সপ্তাহের শেষে বুনিয়া সফর করে ডব্লিউএইচও’র মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রিয়াসুস জেনেভায় সাংবাদিকদের জানান, স্থানীয় জনগণের মধ্যে বিশ্বাসের পরিমাণ অনেক বেশি। তিনি বলেন, কিছু সম্প্রদায়ের নেতা তাকে বলেছেন, তারা বিশ্বাস করেন ইবোলা বলে কিছু নেই।
সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতায় অস্থির এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি অনীহাপূর্ণ এই দুর্গম অঞ্চলে কবিরাজরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
ডব্লিউএইচও’র মতে, ইবোলার বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলবার জন্য স্থানীয় জনগণের এবং তাদের আচার-অনুষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করা অত্যন্ত জরুরি।
সংস্থাটি জানায়, গত বছরের এক ইবোলা প্রাদুর্ভাবের সময় পূর্বপুরুষভিত্তিক সামাজিক রীতিনীতি স্থানীয় জনগণকে প্রতিরোধ কার্যক্রমে যুক্ত করতে সাহায্য করেছিল। যেমন, লোকজ কবিরাজরা সন্দেহভাজন রোগীদের আলাদা রাখার জন্য বিশেষ বিচ্ছিন্নকরণ আচার চালু করেছিলেন। একই সঙ্গে মৃতদেহ ধোয়া ও মৃত প্রাণী সংগ্রহ নিষিদ্ধ করেছিলেন।
তবে বর্তমান প্রাদুর্ভাব মোকাবেলা কার্যক্রম এখনও ধীরগতিতে এগোচ্ছে।
ডব্লিউএইচও জানায়, সংক্রমিত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসা লোকদের মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ৪৫ শতাংশকে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে।
আফ্রিকায় ডব্লিউএইচও’র জরুরি বিভাগের প্রধান মেরি রোজেলিন বেলিজেয়ার বলেন, ‘আমরা ট্র্যাডি-প্র্যাকটিশনারদের রোগীদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাঠাতে অনুরোধ করছি। এর পাশাপাশি তাদের মধ্যে সুরক্ষা সরঞ্জাম বিতরণের কাজও চলছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন