প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সদরঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ শরীফকে নাটকীয়ভাবে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে।
পুলিশ পরিদর্শক পদমর্যাদার হলেও সিএমপিতে তিনি অন্যতম 'ক্ষমতাধর' কর্মকর্তা হিসেবে আলোচিত ছিলেন। তবে যোগদানের মাত্র ১৭ দিনের মাথায় সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ না করেই গতকাল রবিবার রাতে সিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার ওয়াহিদুল হক চৌধুরী তাকে প্রত্যাহারের আদেশ জারি করেন।
এই আকস্মিক বদলি নিয়ে এখন নগর পুলিশের মধ্যে তোলপাড় চলছে।
নেপথ্যে প্রতিমন্ত্রীর ডিও লেটার ও গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধানে জানা গেছে, গুরুতর দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও রাজনৈতিক পক্ষপাতমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী এবং বগুড়া-২ আসনের সংসদ সদস্য মীর শাহে আলমের একটি আধা সরকারি (ডিও) লেটারের ভিত্তিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই নির্দেশনা দেয়।
গত ১ জুলাই পাঠানো ওই ডিও লেটারের (নম্বর– ৪৭.০০.০০০০.০০১.২৫.২০২৬-৫৬১) সূত্র ধরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ-২ অধিশাখার উপসচিব নাসরিন সুলতানা স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে আইজিপি-কে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
অফিস আদেশের তথ্য অনুযায়ী: মুহাম্মদ শরীফের বিরুদ্ধে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, অবৈধ আর্থিক লেনদেন, জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জন, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ হাসিলের মতো গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
উপসচিব নাসরিন সুলতানা আদেশের সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সচিব মহোদয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী চিঠি তৈরি করে পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে এবং অভিযোগগুলো তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ওসি শরীফের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে সিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার ওয়াহিদুল হক চৌধুরী জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। যেহেতু কিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে, তাই একজন উপকমিশনারকে (ডিসি) তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানা যাবে।
চট্টগ্রামের একজন ওসির বিরুদ্ধে বগুড়ার সংসদ সদস্য তথা প্রতিমন্ত্রীর ডিও লেটার পাঠানো নিয়ে সিএমপির অভ্যন্তরে নানা কৌতূহল ও গুঞ্জন তৈরি হয়েছে।
এই বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং তার সহকারী একান্ত সচিব তৌহিদুল ইসলাম টিটুর মোবাইল ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব মোহাম্মদ তাসনিমুজ্জামান জানান, "নিয়মিত অনেক ডিও লেটারই পাঠানো হয়, নির্দিষ্ট করে এটি এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না।" তিনি প্রতিমন্ত্রীর জনসংযোগ কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
মুহাম্মদ শরীফের বিরুদ্ধে বিগত সময়েও একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল। আওয়ামী লীগ কানেকশন ও গ্রেপ্তার বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে কর্ণফুলী থানার ওসি থাকাকালীন ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে দহরম-মহরম এবং এক ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতার মেয়ের বিয়েতে অংশ নিয়ে বিতর্কের জন্ম দেন। এছাড়া আসামি ধরে গাড়ি থেকে ছেড়ে দেওয়ার মতো 'গ্রেপ্তার বাণিজ্যের' অভিযোগও ওঠে।
ডেপুটি কমিশনার হিসেবে মৃত্যুর পর ময়নাতদন্তের নামে অর্থ আদায় ও শিশুর মাকে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে এলাকাবাসী মানববন্ধন করেছিলেন। সিআইডিতে কর্মরত থাকাকালীন বিদেশী মুদ্রা উদ্ধারের মামলার আলামত আদালতে জমা না দেওয়ার বিষয়েও তাকে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
সিএমপির অন্যান্য কর্মকর্তাদের মতে, কর্ণফুলী থানা থেকে বদলি হওয়ার পরও তিনি প্রভাব খাটাতে থাকতেন। বিভিন্ন থানায় ওসি পদায়নে পর্দার আড়াল থেকে ভূমিকা রাখতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে মুহাম্মদ শরীফ বলেছেন, "আমি সামান্য একজন ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার কর্মকর্তা। পরিকল্পিতভাবে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলা হচ্ছে। সিএমপির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত ডিআইজি) ভুল বুঝে আমার পেছনে লেগেছেন এবং তার ইন্ধনেই প্রতিমন্ত্রী মহোদয়কে দিয়ে এই ডিও লেটারটি দেওয়ানো হয়েছে।"
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের পরই এই ক্ষমতাধর কর্মকর্তার ভাগ্যে কী আছে, তা নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন