প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ফেনীতে এক, দুই ও পাঁচ টাকার ধাতব মুদ্রা এবং ছোট মূল্যমানের পুরোনো নোট কার্যত লেনদেনের বাইরে চলে যাচ্ছে। বৈধ মুদ্রা থাকার পরেও দোকান, কাঁচাবাজার, গণপরিবহন, ফার্মেসি, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এই পয়সাগুলি গ্রহণ করতে অনীহা দেখা দিয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ প্রতিদিনই বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে।
অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতার হাতে বৈধ খুচরো টাকা থাকা সত্ত্বেও তা গ্রহণ না করার কারণে পণ্য কেনা অথবা ভাড়া পরিশোধে সমস্যা হচ্ছে। যে কারণে ব্যবসায়ীরাও ব্যাংকে খুচরো টাকা জমা দিতে গিয়ে নানা জটিলতার অভিযোগ করছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে অব্যবস্থাপনা, সচেতনতার অভাব এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা খুচরো টাকার সংকটকে একটি জাতীয় সমস্যায় পরিণত করেছে।
জেলার বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিদিনের ছোট ছোট লেনদেনে খুচরো টাকা নিয়ে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। দোকানদাররা অনেক সময় এক বা দুই টাকার মুদ্রা নিতে অস্বীকার করছেন। কেউ পাঁচ টাকার কয়েন নিলেও, বেশি পরিমাণে নিতে চাইছেন না। গণপরিবহনে যখন যাত্রীরা খুচরো ভাড়া দিতে যান, তখন পরিবহনকর্মীরা তা ফিরিয়ে দিচ্ছেন। যা যাত্রী এবং পরিবহনকর্মীদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক এমনকি হাতাহাতির ঘটনাও ঘটছে।
রেলগেট হকার্স মার্কেটের লোকমান স্টোরের মুদি দোকানি জানান, প্রতিদিনই তার কাছে বিপুল পরিমাণ কয়েন জমা হচ্ছে। কিন্তু পাইকারি বাজারে এসব মুদ্রা সহজে নেওয়া হচ্ছে না। ব্যাংকে জমা দিতে গিয়েও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়ে তিনি গ্রাহকদের কাছে খুচরো নিতে নিরুৎসাহিত করছেন। একই ধরনের অভিযোগ জানিয়েছেন আরও অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।
অন্যদিকে সাধারণ মানুষের অভিযোগ, বৈধ মুদ্রা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়ে ব্যবসায়ীরা আইন লঙ্ঘন করছেন। অনেকেই জানিয়েছেন, পণ্যের দাম পরিশোধের জন্য যথেষ্ট অর্থ থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র খুচরো হওয়ার কারণে তাদের টাকা ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে একদিকে যেমন ভোগান্তি বাড়ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মাঝে বৈধ মুদ্রা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
ফেনীর সোনালী ব্যাংকের প্রধান শাখার সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার পলাশ সূত্রধর বলেন, খুচরো টাকা গ্রহণে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে অধিক পরিমাণ মুদ্রা গণনা ও সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত জনবল, বিশেষায়িত যন্ত্র এবং অবকাঠামোর অভাব রয়েছে। অনেক শাখা প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কয়েন জমা হলেও দ্রুত তা প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে গ্রাহকদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে, যা অসন্তোষের সৃষ্টি করছে।
ফেনী সরকারি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আফরোজা বানু জানান, দেশের প্রচলিত সব বৈধ মুদ্রা আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য। কেউ ইচ্ছামতো বৈধ মুদ্রা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানাতে পারে না। কিন্তু বাস্তবে আইন প্রয়োগের দুর্বলতা এবং জনসচেতনতার অভাবে এই সংকট দীর্ঘদিন ধরে চলমান রয়েছে। ছোট মূল্যমানের মুদ্রা বাজারে সচল না থাকলে দৈনন্দিন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, খুচরো টাকা অচল হয়ে পড়ার আরেকটি কারণ হল বাজারে ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার। এখন অনেক প্রতিষ্ঠান খুচরো ফেরত দেওয়ার পরিবর্তে মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে অর্থ পরিশোধে উৎসাহিত করছে। তবে একটি বড় জনগোষ্ঠী এখনও নগদ লেনদেনের ওপর নির্ভরশীল, তাই খুচরো টাকার গুরুত্ব কমেনি।
ফেনী চেম্বার অব কমার্সের জুনিয়র সহসভাপতি সাঈদুর রহমান জুয়েল বলেন, ব্যাংকগুলোতে খুচরো টাকা জমা ও উত্তোলনের জন্য পৃথক কাউন্টার চালু করা, পর্যাপ্ত মুদ্রা গণনা যন্ত্র স্থাপন এবং নিয়মিতভাবে বাজারে খুচরো মুদ্রা সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে বৈধ মুদ্রা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান ব্যবসায়ীরা।
ফেনী প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, খুচরো টাকা গ্রহণে অস্বীকৃতি গ্রাহকের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। বৈধ মুদ্রা সম্পর্কে মানুষের আস্থা নষ্ট হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক, ব্যবসায়ীক সংগঠন এবং অন্যান্য সরকারি সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত হল, খুচরো মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, ব্যাংক শাখায় দ্রুত মুদ্রা গ্রহণ ও বিনিময় ব্যবস্থা চালু, বাজারে নিয়মিত খুচরো সরবরাহ এবং ব্যাপক জনসচেতনতামূলক প্রচারণা ছাড়া এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। পাশাপাশি বৈধ মুদ্রা প্রত্যাখ্যানের বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারি ও আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতিদিনের ক্ষুদ্র লেনদেন একটি দেশের অর্থনীতির ভিত্তিকে শক্তিশালী করে। বৈধ খুচরো মুদ্রা গ্রহণে অনীহার কারণে সেই লেনদেন ব্যাহত হলে, তার প্রভাব শুধু সাধারণ মানুষের পকেটে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ধীরে ধীরে তা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, বাজারব্যবস্থা এবং আর্থিক শৃঙ্খলার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই অচল হয়ে পড়া খুচরো টাকা আবার সচল করার জন্য দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন