প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন মিত্র ইসরায়েলের কাছ থেকে গোয়েন্দা তথ্য প্রাপ্তির পর। ওই তথ্যে জানানো হয়েছিল, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ক্ষেত্রে খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
তবে, যুদ্ধ শুরুর ছয় মাস পরেও ট্রাম্প এই সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার কৌশল খুঁজে পেতে বেশ সমস্যায় পড়ছেন।
এভাবে যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা হ্রাস পেয়েছে। একসময় ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য চাপ দেওয়া ইসরায়েল, এখন আর ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাচ্ছে না।
এই পরিস্থিতিতে, গত তিন মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার দীর্ঘদিনের মিত্র ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সম্পর্কের মধ্যে টানাপোড়েন প্রকট হয়েছে।
লেবাননে ইসরায়েলের হামলা এবং ইরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায়, ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে নেতানিয়াহুর ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে জানা যায়, গোপনে তুরস্ক থেকে একটি সামরিক বিমানে করে যুক্তরাজ্যে চলে যান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইসরায়েলের গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ইরানের একটি হত্যাচেষ্টার হুমকি এড়াতে। নজিরবিহীন সেই নিরাপত্তা অভিযানে, ট্রাম্পকে একটি খাবারের ট্রলির মাধ্যমে এক বিমান থেকে অন্য বিমানে স্থানান্তরিত করা হয়। এরপর তিনি ন্যাটোর আঙ্কারা সম্মেলন থেকে গোপনে ছোট একটি সামরিক বিমানে ব্রিটেনের উদ্দেশে রওনা হন।
এদিকে, ট্রাম্পের নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইসরায়েলের দেওয়া তথ্য নিয়ে সন্দিহান ছিল। বুধবার দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, সিআইএ ওই গোয়েন্দা তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে ‘কম আস্থা’ দেখিয়েছে। এরপরও মার্কিন কর্মকর্তারা তথ্যের ভিত্তিতে নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন।
একটি সূত্র সংবাদপত্রটিকে জানায়, এই সতর্কবার্তাটি ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্যের একটি বৃহত্তর ধারার সঙ্গে মিলে যায়। ওই ধারার তথ্যগুলোকে কিছু মার্কিন কর্মকর্তা মনে করেন, শুধুমাত্র তথ্য প্রদান করার জন্য নয়, বরং মার্কিন প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলতেও দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা দ্য ইন্ডিপেনডেন্টকে জানিয়েছেন, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠতা এখন চরম চাপে পড়েছে। একই সঙ্গে দুই নেতাও ইরানকে কেন্দ্র করে নিজেদের সামরিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছেন।
১৯৭৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ছয়জন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করা মার্কিন কূটনীতিক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যৌথ হামলা ইরানের সরকার পরিবর্তনের পথ তৈরি করবে। এই বিষয়ে ইসরায়েলের ‘চরম আত্মবিশ্বাস’ ছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় ইসরায়েলের দেওয়া গোয়েন্দা তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে সন্দেহ তৈরির ঘটনা ঘটে।
তিনি বলেন, ‘নেতানিয়াহু প্রায়ই তার উদ্দেশ্য সাধনের জন্য গোয়েন্দা মূল্যায়নের সঙ্গে হেলাফেলা করেন, বিশেষ করে যখন ইরান ও হামাসের মতো গোষ্ঠীগুলোর প্রসঙ্গ আসে।’ একই সঙ্গে, ট্রাম্পের ওপর আগের ক্ষতিকর হামলার ঘটনা এবং ২০২৪ সালের নভেম্বরে তাকে হত্যার জন্য আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট একটি ষড়যন্ত্রের তথ্য প্রকাশ পাওয়ায়, ইসরায়েলের গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে সিআইএ মনে সন্দেহ থাকলেও মার্কিন সিক্রেট সার্ভিস কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে চায়নি।
চ্যাথাম হাউসের মার্কিন-ইসরায়েল সম্পর্কবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইয়োসি মেকেলবার্গ দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট-কে বলেছেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলো যে প্রথমে বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে, বাস্তবে সেগুলো হয়তো এতটা নির্ভরযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, সিআইএ মনে করে, ইরান যুদ্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তারা কিছুটা প্রভাবের বাইরে চলে গেছে এবং এখন সেই প্রভাব ফেরত পাওয়ার চেষ্টা করছে। যুদ্ধের সময় গোয়েন্দা তথ্য, বিশ্লেষণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনেক ব্যর্থতা স্পষ্ট হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ‘সিআইএ মনে করে, তারা কিছুটা উপেক্ষিত হয়ে পড়েছে এবং এখন আবার নিজেদের প্রভাব ফেরানোর চেষ্টা করছে।’ তার মতে, এ যুদ্ধে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অনেক ব্যর্থতা রেকর্ড করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ইরানের মিনাবের একটি স্কুলে হামলার কথা উল্লেখ করেন। সেই হামলায় ১৭০ জনের বেশি শিশু নিহত হয়েছিল এবং ঘটনাটি বর্তমানে মার্কিন সরকার তদন্ত করছে।
তিনি আরো বলেন, ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহুর মধ্যে উত্তপ্ত ফোনালাপের নানা তথ্য সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হয়ে গেলেও, ট্রাম্পের নেতানিয়াহুর প্রতি ‘বিশেষ দুর্বলতা’ রয়েছে বলেও তিনি মনে করেন, এটি গুরুত্বপূর্ণ। গত মাসে নেতানিয়াহু অষ্টমবারের মতো রাষ্ট্রীয় সফরে যুক্তরাষ্ট্রে যান। এ থেকে বোঝা যায়, সম্পর্কের মধ্যে কিছু টানাপোড়েন থাকলেও তাদের সম্পর্ক এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী।
বিশেষ করে লেবাননে ইসরায়েলের চলমান হামলা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে যায়নি। ইসরায়েল দাবি করছে, তারা হিজবুল্লাহকে পরাস্ত করার জন্যই লেবাননে এই অভিযান চালাচ্ছে।
অধ্যাপক মেকেলবার্গের মতে, গাজা নিয়ে ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করার পরও, ট্রাম্প এই বিষয়ে নীরব রয়েছেন। একইভাবে, নেতানিয়াহু বলেছেন, তার প্রধানমন্ত্রীত্বের সময় কোনো ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে না। এসব বিষয়ে ট্রাম্পের প্রকাশ্যে কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখানো না হওয়া দুই নেতার সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতার প্রমাণ বলে মনে করেন তিনি।
কিন্তু বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য হলো, এই সম্পর্কের ওপর সামনে আরো চাপ বাড়তে পারে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা বড় ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কার মুখে পড়তে পারে। অন্যদিকে, অক্টোবরের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ টিকিয়ে রাখতে লড়াই করছেন নেতানিয়াহু। ফলে নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহুর সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়তে পারে।
লন্ডন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক অ্যান্ড্রু মোরান মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সম্পর্কে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসছে। তিনি বলেন, ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য একসময় খুবই নির্ভরযোগ্য মনে করা হত, কিন্তু এখন যুক্তরাষ্ট্র তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। ট্রাম্পকে সম্ভাব্য হামলা থেকে সরিয়ে নেওয়া একটি সতর্কতামূলক পদক্ষেপ ছিল। তবে একই সাথে ওই গোয়েন্দা তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা, ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আগের মতো আস্থা নেই, তা প্রকাশ করে।
৭ অক্টোবরের হামলার আগাম তথ্য দিতে ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তবে অধ্যাপক মোরান মনে করেন, ট্রাম্প ইসরায়েল থেকে দূরে সরে যাবেন না। কিন্তু দুই দেশের সম্পর্ক এখন আগের চেয়ে বেশি অনিশ্চিত।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন