প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা নতুন এবং অনিশ্চিত পর্যায়ে পৌঁছেছে। এ পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের রহস্যময় পারমাণবিক স্থাপনা ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’-এর ওপর হামলা চালিয়ে সেটি ধ্বংস করার হুমকি দিয়েছেন।
ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পর, আন্তর্জাতিক মহলে স্থাপনাটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। নানা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এটিকে ইরানের অন্যতম সুরক্ষিত এবং দুর্ভেদ্য পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন কোথায় অবস্থিত? ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ তেহরানের দক্ষিণে অবস্থিত একটি পাহাড়ি এলাকা, যেখানে দুটি ভূগর্ভস্থ টানেল কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়েছে পাহাড়ের গভীরে। এই স্থাপনাটি শত শত মিটার পুরু কঠিন গ্রানাইট শিলার নিচে অবস্থিত, যার কারণে প্রচলিত বাঙ্কার-ভেদী শক্তিশালী বোমা দিয়েও এটি পুরোপুরি ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন বলে মনে করা হয়।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন অনুযায়ী, পাহাড়ের গভীরে এই স্থাপনা নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য হলো বিমান হামলা থেকে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে সুরক্ষা দেওয়া।
এই স্থাপনা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-মনিটর-এর একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সন্দেহ রয়েছে যে ইরান এখানে একটি গোপন, ঘোষণাবহির্ভূত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র নির্মাণ করছে, যা দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য কৌশলগত বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
তবে তেহরান এই অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে। তাদের দাবি, ২০২০ সালে শুরু হওয়া নির্মাণকাজের উদ্দেশ্য হলো উন্নতমানের সেন্ট্রিফিউজ সংযোজন ও উৎপাদনের জন্য একটি নিরাপদ শিল্প স্থাপনা তৈরি কৰা; সেখানে গোপন পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে না।
ট্রাম্পের হুমকি সম্পর্কিত বক্তব্যে, মার্কিন রেডিও উপস্থাপক হিউ হিউইটকে এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “আমরা পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন ধ্বংস করব। ইরানিদের প্রস্তুত থাকতে বলুন।” এরপর তিনি দাবি করেন, “আমরা পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের ওপর খুব নিবিড় নজর রাখছি। সেখানে এখন কোনও উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম দেখছি না। তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। যখনই আমরা কিছু শুনি, তখনই সেটি ধ্বংস করে দিই। তাই তারা বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চায় না। খুব শিগগিরই পিকঅ্যাক্সেও হামলা হতে পারে।”
তবে ট্রাম্প তার দাবির পক্ষে কোনও প্রমাণ উপস্থাপন করেননি।
ট্রাম্পের এই হুমকির সাথে সাথে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নতুন দফায় সামরিক অভিযান শুরু করে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, টানা তৃতীয় রাতের মতো পরিচালিত এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা। সেন্টকমের দাবি, পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী অভিযানে ‘নির্ভুল নির্দেশিত’ অস্ত্র ব্যবহার করে উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঘাঁটি এবং নৌ-সামরিক স্থাপনায় হামলা করা হয়েছে।
অন্য দিকে, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তেহরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান মধ্যপ্রাচ্যে আবার অস্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনছে। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে দাবি করেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা কেবল আঞ্চলিক নিরাপত্তাই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহকেও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
এছাড়া ইরানের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, দেশের দক্ষিণাঞ্চলের একাধিক এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে, যেমন কিশ দ্বীপ, কেশম দ্বীপ, আবু মুসা দ্বীপ, বন্দর আব্বাস এবং জাম এলাকা। বার্তা সংস্থা ফার্স স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানায়, এসব এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণ ঘটেছে। মেহর নিউজ এজেন্সিও কিশ এবং কেশম দ্বীপে বিস্ফোরণের খবর নিশ্চিত করেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা ইরনা জানায়, বন্দরে অন্তত তিনটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন কিশ দ্বীপে দুটি বিস্ফোরণের কথা জানালেও ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক তথ্য দেয়নি। মেহরের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুজেস্তান প্রদেশের ওমিদিয়েহ শহরে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় অন্তত চারজন আহত হয়েছেন। এছাড়া নূর নিউজ জানিয়েছে, সোমবার রাতের হামলার পর কিশ দ্বীপের বন্দরে তিনটি নৌযানে আগুন ধরে যায়।
কূটনীতির পথ কি এখনও খোলা? সামরিক উত্তেজনা বাড়ার মধ্যে, ট্রাম্প কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেননি। হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, যুদ্ধ বন্ধে তেহরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা ‘অবশ্যই সম্ভব’। তবে, একই সময়ে ওয়াশিংটন নতুন সামরিক হামলা অব্যাহত রেখেছে এবং ইরানের বন্দরের ওপর অবরোধও পুনর্বহাল করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে সামরিক চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি আলোচনার দরজা খোলা রাখার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ‘চাপ সৃষ্টি করে সমঝোতায় বাধ্য করার’ কৌশল অনুসরণ করছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা অধিক বলেই মনে করছেন তারা।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন