প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সময়ের সাথে সাথে খেলার নিয়ম-কানুনে যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে খেলোয়াড়দের সুরক্ষাকে।
একবার ভাবুন তো, ক্রিকেটে এখন ব্যাটসম্যানদের সুরক্ষা দেওয়া হয়, স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের সময় এটা থাকলে তার রান কত হলে, এবং গড় কত হতো!
ফুটবলেও খেলোয়াড়দের সুরক্ষা দিতে ফাউলের ব্যাপারে কঠোর নিয়ম আরোপ করা হয়েছে। ক্রিকেটে যেমন ডিজিশন রিভিউ সিস্টেম বা ডিআরএস চালু হয়েছে, ফুটবলেও এসেছে ভিডিও অ্যাসিস্টেন্ট রেফারি বা ভিএআর। আম্পায়ার অথবা রেফারি তাদের সিদ্ধান্ত আরো নিখুঁত করার জন্য প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে থাকেন।
ফলে, খেলোয়াড়দের সুরক্ষা যেমন নিশ্চিত হয়েছে, তেমনি ভুলের সংখ্যা কমে এসেছে।
নতুন নতুন নিয়মকে খেলোয়াড় ও দর্শকরা স্বাগত জানিয়েছেন। তবে এবারের ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপে হঠাৎই চালু হওয়া ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ নিয়ে সমালোচনার ঝড় বইছে। এতদিন ফুটবল ছিল দুই অর্ধের খেলা। ৯০ মিনিটের খেলায় মাঝখানে ১৫ মিনিটের বিরতি ছিল। কিন্তু এবার প্রতি ম্যাচে প্রথমার্ধের ২২ মিনিটে এবং দ্বিতীয়ার্ধের ৬৭ মিনিটে ৩ মিনিট করে হাইড্রেশন ব্রেক বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অর্থাৎ, দুই ভাগের ফুটবল এখন চার ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে না হলেও ভারতের আইপিএলসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ফ্র্যাঞ্চাইজি লীগে স্ট্র্যাটেজিক টাইম আউটের নিয়ম চালু রয়েছে। বাস্কেটবল ও আমেরিকান ফুটবলেও টাইমআউটের প্রচলন রয়েছে।
কিন্তু ফুটবলে বাধ্যতামূলক ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ এবারই প্রথম।
এর আগে ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডস ও মেক্সিকোর মধ্যকার নকআউট ম্যাচের ৩২ এবং ৭৬ মিনিটে ৩ মিনিট প্রাণ হালকা করে দেওয়ার জন্য কুলিং ব্রেক দিয়েছিলেন রেফারি। সেসময় ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা হলে রেফারি চাইলে কুলিং ব্রেক দিতে পারতেন। এবারের বিশ্বকাপে সেই কুলিং ব্রেক ফিরেছে হাইড্রেশন ব্রেক হিসেবে এবং তাপমাত্রা যাই হোক, এমনকি ছাদ বন্ধ শীতাতপনিয়ন্ত্রিত মাঠেও হাইড্রেশন ব্রেক বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এদিকে অনেকেই ব্যবসায়িক কারণে এই ব্রেককে সন্দেহ করছেন।
হাইড্রেশন ব্রেক চালু করার যুক্তি হিসেবে অবশ্য স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে। ফিফার দাবি, খেলোয়াড়দের পানিশূন্যতা, ক্লান্তি এবং তাপজনিত শারীরিক ঝুঁকি কমাতে এই বিরতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আধুনিক ফুটবল আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় দ্রুতগতির, খেলোয়াড়রাও মাঠে বেশি দৌড়ান। নির্দিষ্ট বিরতিতে শরীর পুনরায় হাইড্রেট করতে পারলে খেলোয়াড়দের ইনজুরি প্রবণতা কমে আসবে। সুতরাং, হাইড্রেশন ব্রেক চালুর পক্ষে যুক্তি অকাট্য। মনে হতে পারে, খেলোয়াড়দের জন্যই ফিফার চিন্তা।
তাহলে, হাইড্রেশন ব্রেক চালুর আগে কি প্রয়োজনে পানি পান করা সম্ভব ছিল না? অবশ্যই সম্ভব ছিল। আগে থ্রো-ইন, কর্নার কিক কিংবা কোনো খেলোয়াড় ইনজুরিতে পড়লে অন্য খেলোয়াড়রা প্রয়োজনে সাইডলাইনে গিয়ে পানি পান করতো। অনেক সময় কোচিং স্টাফ বা মেডিকেল টিমের সদস্যরা সাইডলাইন থেকে মাঠে বোতল ছুঁড়ে দিতেন। গোলকিপাররা সবসময় তাদের পোস্টের পেছনে পানির বোতল রাখতে পারতেন। কিন্তু আগে পানি খাওয়ার জন্য খেলা থামানো হত না। তাই পানি পান করার জন্য খেলায় কোনো বাড়তি সময় লাগতো না, আর খেলার গতিও নষ্ট হত না।
ফলে, সবার মনে হচ্ছে, খেলোয়াড়দের কথা ভেবে আসলে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যেই এই অপ্রয়োজনীয় ব্রেক বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। হাইড্রেশন ব্রেক নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র সমালোচনা হচ্ছে। এতদিন নাটক, সিনেমা এবং খবরের মধ্যে বিজ্ঞাপন বিরতি থাকতো। কিন্তু এখন খেলায় কি বিজ্ঞাপন দেখাতে হবে? সাধারণ দর্শক ছাড়া, খেলোয়াড় ও কোচরাও তাদের বিরক্তি প্রকাশ করেননি।
নেদারল্যান্ডসের অধিনায়ক ভার্জিল ফন ডাইক, গত রবিবার তাদের প্রথম ম্যাচ পরে সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘প্রতিবার যখন এই বিরতির সুযোগে টিভিতে বিজ্ঞাপন দেখানো হয়, সত্যি বলতে, এটা আমার একদমই পছন্দ নয়।’
লিভারপুলের সাবেক কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপও হাইড্রেশন ব্রেক নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, ‘স্পনসরদের সুবিধার জন্য প্রস্তুত করা এই বিরতি খেলাটির গতি নষ্ট করবে।’
ফুটবল একটি গতি এবং ছন্দের খেলা। আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণে জমে ওঠে খেলা। যখন কোনো দল আক্রমণে যায়, তখন খেলায় তারা একটি মোমেন্টাম পায়। বার বার বিরতি খেলার সেই মোমেন্টাম নষ্ট করে। আচমকা খেলার গতি থেমে যায় ও ছন্দ হারিয়ে যায়। এই বাড়তি বিরতিতে খেলোয়াড়দের ফোকাসও নষ্ট হয়ে যায়।
ফুটবল এখন যতটুকু খেলা, তারচেয়ে বেশি বাণিজ্য। টেলিভিশন ও অনলাইনে বিশ্বের প্রতিটি কোনায় সম্প্রচারিত হয় বিশ্বকাপ ফুটবল। কোটি কোটি দর্শক মহা উৎসাহে খেলা দেখেন। গ্লোবালাইজেশনের নামে ফিফা এবার ৪৮ দলের বিশ্বকাপ আয়োজন করছে। তবে গ্লোবালাইজেশনের সাথে সাথে কমার্শিয়ালাইজেশনও হচ্ছে। প্রতি ম্যাচে বাড়তি ৬ মিনিটের বিরতিতে বিজ্ঞাপন দেখানোর সুযোগ পাচ্ছে সম্প্রচারকারীরা। ফলে ফিফার আয় বাড়ছে হাজার কোটি টাকা।
সবার এখন প্রশ্ন, বাধ্যতামূলক হাইড্রেশন ব্রেকের নামে এই ৬ মিনিটের বিরতি কি পানি পানের জন্য, না বিজ্ঞাপন দেখানোর জন্য?
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন