প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বইয়ের ব্যাগ হাতে কেউ, আবার কেউ স্কুলের পোশাক কাঁধে নিয়ে আছে। তাদের চোখে স্বপ্ন- পড়াশোনা করে মানুষের মতো মানুষ হওয়া; কিন্তু বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর জন্য প্রতিদিন ভয় আর শঙ্কায় ভরা এক পথ পাড়ি দিতে হয়। পাকা রাস্তা কিংবা সেতুর অভাবে ড্রামের তৈরি ভেলাই তাদের একমাত্র ভরসা।
খুলনার কয়রা উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের প্রতাপ স্মরণী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাশে শাকবাড়িয়া বদ্ধ নদীর তীরে ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলায় ভেঙে যাওয়া বাঁধটি ১৭ বছরেও নির্মাণ হয়নি। প্রায় ১৭০ মিটার দীর্ঘ ভাঙা অংশটি এখন ছোট একটি নদীতে পরিণত হয়েছে। এই পানিপথ পেরিয়েই কোমলমতি শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন স্কুলে যাতায়াত করছে। দেড় যুগ ধরে চলা এই দুর্দশার মধ্যে কোনো বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ভাঙা বাঁধের এক পাশে প্রতাপ স্মরণী মাধ্যমিক বিদ্যালয়, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। অন্যপাশ থেকে বিদ্যালয়ের দিকে যেতে হলে শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের ড্রামের তৈরি ভেলায় উঠতে হয়। ভেলা যাতে স্রোতে ভেসে না যায়, তার জন্য দুই পাশে বাঁধা রশি ধরে টেনে টেনে পার হতে হয়। সামান্য অসতর্কতা কিংবা ভারসাম্য হারালেই পানিতে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ভেলায় উঠলেই বুক কাঁপে
প্রতাপ স্মরণী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাহসিন আহমেদ বলেন, "প্রতিদিন ড্রামের ভেলায় চড়ে স্কুলে যেতে হয়। ভেলায় উঠলেই ভয় লাগে কখন যে উল্টে যাই।" তবুও পড়াশোনার জন্য প্রতিদিন এই ঝুঁকি নিতে হয়। তিনি আরও বলেন, "আমরা চাই এখানে দ্রুত একটি রাস্তা নির্মাণ করা হোক।"
পূর্ব মঠবাড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদিয়া আক্তার জানায়, "ড্রামে চড়ে ওপারে স্কুলে যেতে খুব ভয় লাগে। একবার ভেলা উল্টে নদীতে পড়ে গিয়েছিলাম। বইয়ের ব্যাগসহ সবকিছু পানিতে ভিজে যায়।" তিনি বলেন, "পাশে মানুষ থাকায় কোনোমতে প্রাণে বেঁচেছি। আমরা চাই এখানে একটা রাস্তা হোক, যাতে নিরাপদে স্কুলে যেতে পারি।"
শিক্ষার্থীদের এ অবস্থার কারণে উদ্বেগে থাকেন অভিভাবকরাও। প্রতাপ স্মরণী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক হোসনেয়ারা খাতুন বলেন, "বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানোর পর খুব চিন্তায় থাকতে হয়। একবার ভেলায় পার হওয়ার সময় আমার মেয়েসহ কয়েকজন শিশু পানিতে পড়ে গিয়েছিল।" তিনি জানান, "কোনোমতে প্রাণে বেঁচেছে। আমরা চাই দ্রুত রাস্তাটি নির্মাণ করা হোক।"
তিনি আরও বলেন, "রাস্তা নির্মাণ করা না হলেও স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ড্রাম সেতু নির্মাণ করা হোক।"
স্থানীয় বাসিন্দা মো. আছাদুল ইসলাম জানান, দীর্ঘদিন ধরে বাঁধ নির্মাণের দাবি জানানো হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। বর্ষায় নদীর পানি বাড়লে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থী, নারী, শিশু ও বয়স্কদের তখন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়।
স্থানীয়দের মতে, এখানে একটি স্থায়ী বাঁধ ও নিরাপদ সড়ক নির্মাণ করা হলে শুধু দুটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগই কমবে না, আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থাও সহজ হবে।
বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমছে
প্রতাপ স্মরণী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রণজিৎ কুমার মণ্ডল বলেন, "২০০৯ সালে আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত এখানে বাঁধ নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি।" তিনি জানান, "প্রতিনিয়ত বাচ্চাদের ঝুঁকি নিয়ে ড্রামের ভেলায় পার হতে হয়। অনেক অভিভাবক যাতায়াতের সমস্যার কারণে সন্তানদের এই স্কুলে ভর্তি করাতে চান না। আমরা দ্রুত শাকবাড়িয়া বদ্ধ নদীর বাঁধ নির্মাণের দাবি জানাই।"
মহারাজপুর ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবু সাঈদ মোল্লা বলেন, "১৭০ মিটারের বেশি এই ভাঙা অংশ ইউনিয়ন পরিষদের সামান্য বরাদ্দ দিয়ে সংস্কার করা সম্ভব নয়।" তিনি উল্লেখ করেন, "জায়গাটি গভীর এবং বড় আকারের। একটি ভাসমান সেতু কিংবা স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা গেলে দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান হবে।"
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) খুলনার উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. সুলতান মাহমুদ জানান, "প্রতাপ স্মরণী মাধ্যমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন বাঁধটি পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বরাদ্দের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।" তিনি বলেন, "বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।"
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আব্দুল্লাহ আল বাকী বলেন, "বিষয়টি জানতে পেরেছি। সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"
খুলনা জেলা পরিষদের প্রশাসক এসএম মনিরুল হাসান বাপ্পী মন্তব্য করেন, "দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁধ নির্মাণ না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক।" তিনি বলেন, "বিশেষ করে শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষকে ড্রামের ভেলায় ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হতে হচ্ছে এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।" তিনি জানান, "বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন