প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
টানা চার দিনের বৈরী আবহাওয়া, ভারী বর্ষণ এবং উত্তাল সাগরের কারণে কক্সবাজারের পর্যটন শিল্প কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। পর্যটকশূন্য সৈকতের প্রভাব পড়েছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে হোটেল-রিসোর্ট মালিকসহ সকলের ওপরে। এই অবস্থায় পর্যটকরা বাতিল করেছেন তাদের হাজার হাজার রুম বুকিং। একই সঙ্গে বন্ধ হয়ে গেছে শত শত দোকানপাট ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, যার ফলে কয়েক দিনের মধ্যে কক্সবাজারের পর্যটন খাতে প্রায় শতকোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বুধবার (৮ জুলাই) টানা ভারী বর্ষণ এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতজুড়ে থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টে পর্যটকের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। যেসব পর্যটক এসেছেন, তারাও বৃষ্টির জন্য সৈকতে বেশি সময় অবস্থান না করে দ্রুত হোটেলে ফিরে যাচ্ছেন। সৈকতের অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ রয়েছে, আর খোলা দোকানগুলোও ক্রেতাশূন্য। ঝালমুড়ি, চটপটি, কিটকট, বিচ বাইক ও ঘোড়ার ব্যবসাসহ প্রায় সব ধরনের পর্যটননির্ভর কর্মকাণ্ডে দেখা যাচ্ছে স্থবিরতা।
লাবণী পয়েন্টের ঝালমুড়ি বিক্রেতা মো. আল আমিন জানান, 'টানা চার দিনের ভারী বর্ষণের কারণে সমুদ্রসৈকতে এসে ব্যবসা করতে পারিনি। জীবিকার তাগিদে বুধবার দোকান নিয়ে এলেও বৃষ্টি যেন পিছু ছাড়ছে না। দুপুর পর্যন্ত মাত্র ১০০ টাকার ঝালমুড়িও বিক্রি হয়নি। অথচ স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার টাকার বিক্রি হতো।'
বিচ বাইক চালক মহিউদ্দিন বলেন, 'সমুদ্রসৈকতে বিচ বাইক চালিয়ে আমার সংসার চলে। কিন্তু ভারী বৃষ্টিপাত এবং ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেতের কারণে পর্যটক না থাকায় ব্যবসা একেবারেই বন্ধ। তিন দিন পর সৈকতে এলেও কোনো আয় হয়নি।'
ঘোড়াওয়ালা মো. নিশান জানান, 'কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টে ৪৫ জন ঘোড়াওয়ালা রয়েছেন। কিন্তু টানা ভারী বর্ষণ ও পর্যটক সংকটের কারণে সবার আয়-রোজগার কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। জীবিকার একমাত্র অবলম্বন থমকে যাওয়ায় আমরা চরম দুর্ভোগে পড়েছি।'
কিটকট ব্যবসায়ী মফিজ বলেন, 'বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও কিছু পর্যটক সৈকতে এলেও টানা বৃষ্টির কারণে তারা বেশিক্ষণ অবস্থান না করে দ্রুত হোটেলে ফিরে যাচ্ছেন। ফলে সৈকতের কিটকটগুলো সারাদিনেই প্রায় ফাঁকা পড়ে থাকে, আর ব্যবসাও একেবারে স্থবির হয়ে গেছে।'
রাসেল চটপটির স্বত্বাধিকারী মো. আরিফ জানান, 'প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে কক্সবাজারে পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় ব্যবসায় ভয়াবহ ধস নেমেছে। আগে যেখানে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ হাজার টাকার বিক্রি হতো, সেখানে এখন সারাদিনেও এক হাজার টাকার ব্যবসা হচ্ছে না।'
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টজুড়ে থাকা সহস্রাধিক বার্মিজ পণ্যের দোকানেও নেমে এসেছে চরম স্থবিরতা। টানা বৈরী আবহাওয়ার কারণে অধিকাংশ দোকানই বন্ধ রয়েছে। যেসব দোকান খোলা আছে, সেগুলোও ক্রেতাশূন্য।
লাবণী ছাতা মার্কেটের ব্যবসায়ী মোরশেদ আলম জানান, 'এই মার্কেটে প্রায় ২০০টি বার্মিজ পণ্যের দোকান রয়েছে। কিন্তু গত চার দিন ধরে কার্যত কোনো বেচাকেনাই নেই। যেখানে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিটি দোকানে দৈনিক ৩০ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হতো, সেখানে এখন অনেক দোকানে সারাদিনে একটি পণ্যও বিক্রি হচ্ছে না।'
সী সেফ লাইফ গার্ড সংস্থার সিনিয়র কর্মী মো. ফারুক বলেছেন, 'স্বাভাবিক সময়ে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টে প্রতিদিন ৫০ হাজারেরও বেশি পর্যটকের সমাগম ঘটে। তবে টানা বৈরী আবহাওয়া ও উত্তাল সাগরের কারণে গত চার দিনে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ১০ থেকে ১৫ হাজারে। আগত পর্যটকরাও কিছুক্ষণ সৈকতে অবস্থান করে বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে হোটেলে ফিরে যাচ্ছেন। পর্যটকদের নিরাপত্তার স্বার্থে লাইফগার্ডরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন এবং কাউকে সমুদ্রে নেমে গোসল করতে দেয়া হচ্ছে না।'
মেরিন ড্রাইভ-কলাতলী হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান জানান, 'টানা বৈরী আবহাওয়ার কারণে কক্সবাজার-ঢাকা রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা ও যানজটের কারণে কক্সবাজারে যাতায়াতও কঠিন হয়ে পড়েছে। গত চার দিনে কক্সবাজারের পাঁচ শতাধিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টে প্রায় ৬০ হাজার পর্যটকের রুম বুকিং বাতিল হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার পর্যটক অবস্থান করলেও বিরূপ আবহাওয়ার কারণে তারাও নির্ধারিত সময়ের আগেই কক্সবাজার ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।'
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির মুখপাত্র আবিদ আহসান সাগর বলেন, 'টানা চার দিনের বৈরী আবহাওয়ায় কক্সবাজারে পর্যটকের আগমন আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। ফলে হোটেল-রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, সৈকতকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র ব্যবসাসহ পুরো পর্যটন শিল্পে বড় ধরনের ধস নেমেছে। গত চার দিনেই কক্সবাজারের পর্যটন খাতে প্রায় ১০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন