প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
এক বছর আগে ঢাকার ধামরাইয়ে নারগিস বেগম ও তার দুই সন্তানের মরদেহ উদ্ধার হওয়ার পর খাবারে বিষক্রিয়ার ধারণা উঠে এসেছিল। সেই কারণে মামলাটি অপমৃত্যুর দায়ে রুজু করা হয়েছিল। তবে একটি তথ্য পাওয়ার পর তদন্ত কর্মকর্তার মনে খটকা লাগে। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে হত্যা রহস্য উন্মোচিত হয়। বর্তমানে নারগিসের মেয়ের স্বামী মো. রবিন আসামি হয়ে বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন।
মো. রবিন (২২) বর্তমানে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। তিনি বিচারকের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। গত ১৪ জানুয়ারি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) উপ-পরিদর্শক (এসআই) মনজুর রহমান অভিযোগপত্র ঢাকার আদালতে দাখিল করেছেন। মামলাটি বর্তমানে ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, রবিন ঘরজামাই হিসেবে শ্বশুরবাড়ির ডেকোরেটরের ব্যবসা দেখভাল করতেন। শাশুড়ির সেই ব্যবসাটি বিক্রি করে দেয়ার কারণে রবিনের মধ্যে ক্ষোভ জন্মায় এবং এটি হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ বলে উল্লেখ করা হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা মনজুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, শুরুতেই এই মামলার কোনো ক্লু ছিল না। রবিন খুবই সুকৌশলে পরিস্থিতি পরিচালনা করছিলেন। মূলত একটি জিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজতে গিয়ে পুরো ব্যাপারটি উন্মোচিত হয়।
২০২৫ সালের ২ জুন দিবাগত রাতে ধামরাই উপজেলার গাঙ্গুটিয়া ইউনিয়নের রক্ষিত গ্রামে নারগিস (৪২) এবং তার দুই সন্তান মো. শামীম (১৭) ও সোলাইমানের (৮) মরদেহ উদ্ধার করা হয় তাদের ঘর থেকে।
নারগিসের মেয়ে নাসরিন আক্তার সেসময় জানিয়েছিলেন যে, তার মা ও ভাইদের মরদেহ ঘরের ভেতরে বিছানার ওপর কাঁথা দিয়ে ঢাকা ছিল। তখন পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল খাবারে বিষক্রিয়া মৃত্যু ঘটিয়েছে। আবার অভিযোগ করা হয়েছিল যে, সম্পত্তির বিরোধের কারণে শ্বশুরবাড়ির লোকজন খাবারে বিষ মিশিয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। নাসরিনের স্বামী রবিনও তখন এই দাবি করেন। তিনি দাবি করেছিলেন যে, রাতে ডিম-ভাত কিংবা জুসের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে খাইয়ে তিনজনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
পুলিশ প্রথমে খাবারে বিষক্রিয়ার সন্দেহে অপমৃত্যুর মামলা নেয়। পরবর্তীতে দুই দিন পর ৪ জুন মামলার তদন্তভার গ্রহণ করেন ঢাকা জেলার পিবিআই কর্মকর্তা মনজুর রহমান।
তদন্ত শুরু করে বিভিন্ন জনপ্রশাসকের সঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদ করতে গিয়ে মনজুর রহমান জানতে পারেন যে, সেদিন রবিন তার স্ত্রী ও শিশু সন্তানসহ নারগিসের বাড়িতে রাতের খাবার খেয়েছিলেন। তখন প্রশ্ন ওঠে যে, একটি খাবার খেয়ে কেউ মারা গেল, আর কেউ কেন বেঁচে রইল?
মনজুর রহমান বলেন, শুরু থেকে বিষক্রিয়ার বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। দেওয়া মোবাইল ফোনের অবস্থান, ঘটনাস্থলে উপস্থিত আলামত, জব্দ করা মোবাইল ফোন এবং অন্যান্য বৈজ্ঞানিক তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণের পর রবিনকে সন্দেহের তালিকায় জমা করেন। পরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যার ঘটনা স্বীকার করেন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সন্ধ্যা রাতে খাওয়ার পর রবিন স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে নিজ বাড়িতে ফিরে যান। তবে রাত ১১টা ৪৫ মিনিটে তিনি ফের শ্বশুরবাড়িতে চলে আসেন, যার বিশ্লেষণে দেখা যায়, গভীর রাতে ঘটনাস্থলে উপস্থিতি প্রমাণ হতে যাচ্ছে।
তদন্ত কর্মকর্তা জানান, রবিন কখনোই শাশুড়িকে হিসাব দিতেন না। তাই শাশুড়ি তাকে না জানিয়ে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার টাকায় ব্যবসা বিক্রি করে দেন। এই কারণে রবিন ক্ষুব্ধ হয়ে বাড়ি চলে যান এবং দীর্ঘদিন যোগাযোগ রাখেননি। আরো কিছুদিন পর তিনি শাশুড়ির দাওয়াতে ওই বাড়িতে গিয়েছিলেন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, একদিন ব্যবসা বিক্রির টাকা নিয়ে রবিনের স্ত্রী নাসরিনের সঙ্গে তার মায়ের কথা কাটাকাটি হয়। এরপর রবিনের শাশুড়ির প্রতি ক্ষোভের মাত্রা আরও বাড়ে। তিনি রাতের খাবারের পর স্ত্রীর সঙ্গে বাড়িতে ফিরে গেলেও মধ্যরাতে আবার শ্বশুরবাড়িতে ফিরে যান।
পুলিশ জানিয়েছে, রবিন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেন, তখনই তিনি প্রতিশোধ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মাঝে মাঝে ব্যবসার বিষয়ে তার বড় শ্যালক শামীমের সঙ্গে দ্বন্দ্ব ঘটতো। তাই শ্বশুরবাড়ির সবাই তার গায়ে ক্ষোভ প্রবাহিত হয়।
মামলার অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, রবিন শ্বশুরবাড়ির ডেকোরেটর ব্যবসা দেখাশোনা করে আসছিলেন। এই বিরোধ থেকে শাশুড়ি ব্যবসা বিক্রি করে দেয়ার পর তাকে হত্যা করেন শাশুড়ির প্রতি প্রতিশোধ নেয়ার লক্ষ্যে।
রবিন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানান, গভীর রাতে শ্বশুরবাড়িতে ফিরে প্রথমে বড় শ্যালক শামীমের মুখে বালিশ চাপা দিয়ে তাকে হত্যা করেন। তারপর একইভাবে নারগিস ও সোলাইমানকেও হত্যা করেন। তিনজনের মরদেহ একই খাটে কাঁথা দিয়ে ঢেকে দেন, যাতে মনে হয় তারা ঘুমিয়ে আছেন। তিনজনকে হত্যার পর ভোরের চারটার দিকে নিজের বাড়িতে চলে যান।
রবিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তদন্ত কর্মকর্তাগণ দুটি বালিশ ও তার মোবাইল ফোন উদ্ধার করেছেন।
শ্বশুরবাড়ির দূরত্ব রবিনের গ্রাম থেকে খুব বেশি নয়; মাঝে আছে দুটি গ্রাম। তার জন্য সহজেই যেতে পারার সুযোগ ছিল।
মরদেহ উদ্ধার হওয়ার পর রবিন শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিষক্রিয়ার গল্পগুলো বলাতে থাকেন। তিনি শ্বশুরের সৎভাইকেও দোষারোপ করে।
নাসরিন আক্তার এখনও সন্দিহান যে, স্বামী রবিনই কি তার মা ও ভাইদের হত্যা করেছে। নাসরিন গণমাধ্যমকে বলেন, রবিন মেরেছে কি না, আমি জানি না। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করেছি। সে আমাকে বলেছে যে সে আমার মা ও ভাইকে মারেনি। রবিন মেরেছে, আমি এ ব্যাপারে বিশ্বাস করি না। সে পুলিশ ভয়ে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে।
তবে তিনি স্বীকার করেছেন যে, ব্যবসা নিয়ে তাঁর মা ও ভাইয়ের সঙ্গে স্বামীর দ্বন্দ্ব ছিল। নাসরিন বলেন, এ কারণেই তার মা ডেকোরেটরের ব্যবসা বন্ধ করে বিক্রি করে দিয়েছিলেন।
নাসরিনের বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা মনজুর রহমান জানিয়েছেন, প্রেমের সম্পর্ক থেকে বিয়ে করেছেন নাসরিন ও রবিন। নাসরিন রবিনকে শুরু থেকেই নির্দোষ দাবি করে আসছেন। কিন্তু তদন্ত ভিন্ন তথ্য দিচ্ছে।
মামলাটি নিহত নারগিসের ভাই আবদুর রশীদ দায়ের করেছিলেন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, আমি খুনির ফাঁসি চাই। আমার বোন ওই খুনির কাছে খুব ভালোবাসতেন। কিন্তু সে (রবিন) আমার বোন এবং ভাগ্নেকে খুন করে ফেলেছে।
এই মামলার একজন সাক্ষী শাহিনুর রহমান দোষীদের শাস্তির দাবি নিয়ে বলেন, একসঙ্গে একই পরিবারের তিনজন খুন হওয়ার ঘটনায় এলাকায় ভীতি ছড়িয়ে পড়ে সেই সময়। দোষীর শাস্তি হওয়া প্রয়োজন।
তদন্ত কর্মকর্তা মনজুর রহমান জানান, ১৪ জনের সাক্ষ্য এবং তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে গত ১৪ জানুয়ারি তিনি আদালতে এই মামলার অভিযোগপত্র জমা দেন। তাতে ঘটনাটিকে হত্যাকাণ্ড উল্লেখ করে রবিনকে একমাত্র আসামি করা হয়।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন