প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
১৮ অক্টোবর উদ্বোধনের প্রস্তুতি, নিষেধাজ্ঞার নথি পাঠানোর পরও কার্যক্রম অব্যাহত; আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার হুঁশিয়ারি মানবাধিকার সংগঠনের
উচ্চ আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সুনির্দিষ্ট প্রজ্ঞাপনকে সরাসরি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মানিকগঞ্জের সিংগাইরে ঐতিহ্যবাহী জয়মন্টপ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে মাসব্যাপী বাণিজ্য মেলার আয়োজনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি চলছে। মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও সিংগাইর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার প্রচ্ছন্ন আশ্রয়েই আগামী ১৮ অক্টোবর এই বেআইনি মেলার ঘটা করে উদ্বোধনের আয়োজন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। সরকারি আদেশ, পরিপত্র ও আইনি বাধ্যবাধকতার সুনির্দিষ্ট প্রমাণাদি উপস্থাপন করার পরও স্থানীয় শীর্ষ প্রশাসনের এমন বেপরোয়া ও রহস্যজনক নীরবতা নিয়ে সচেতন মহল ও সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন জাগছে—প্রশাসন কি আইনের ঊর্ধ্বে?
অনুসন্ধানে জানা যায়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের (রপ্তানি-৭ শাখা) ‘মেলা পরিপত্র, ২০২২’ (স্মারক নম্বর: ২৬.০০.০০০০.১০৬.৮৬.০৮৬.১৫.১১১; তারিখ: ২৯ জুন ২০২২ / ১৫ আষাঢ় ১৪২৯)-এর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের (চ) ধারায় পরিষ্কারভাবে উল্লেখ রয়েছে—"কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠে মেলা আয়োজন করা যাবে না।"
এর পাশাপাশি, বরিশাল ‘কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজ’ প্রাঙ্গণে মেলা আয়োজনের বিরুদ্ধে মহামান্য হাই কোর্ট এক যুগান্তকারী ও স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন, যা সারা দেশের জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের জন্য সরকারি আইন ও নিয়ম অনুসরণের এক চূড়ান্ত আইনি বার্তা।
জয়মন্টপ উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠ: ঐতিহ্য, শিক্ষা ও ক্রীড়াচর্চার অবিচ্ছেদ্য অংশ
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, জয়মন্টপ খেলার মাঠটি মূলত ঐতিহ্যবাহী জয়মন্টপ উচ্চ বিদ্যালয়ের (Joymontop High School) নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক সম্পত্তি। এটি কোনো সাধারণ উন্মুক্ত বা পরিত্যক্ত চত্বর নয়; বরং সরাসরি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন এবং তাদের শিক্ষাঙ্গনেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মালিকানা ও ঐতিহ্য: বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের মূল কেন্দ্র হিসেবে এই মাঠ ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
দৈনন্দিন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহার: প্রতিটি কার্যদিবসে শিক্ষার্থীদের প্রাত্যহিক সমাবেশ (Assembly/PT), বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং টিফিনকালীন খেলাধুলার জন্য মাঠটি সম্পূর্ণ সংরক্ষিত থাকে।
এলাকাবাসীর ক্রীড়াচর্চা: স্কুলের সময়সূচির বাইরে (বিকেলে বা ছুটির দিনে) এটি স্থানীয় তরুণদের জন্য উন্মুক্ত থাকে, যেখানে ‘জয়মন্টপ প্রিমিয়ার লিগ’-সহ নানা ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।
এমন একটি প্রাণবন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠকে বাণিজ্য মেলার কোলাহল ও বাণিজ্যিক স্বার্থে লিজ বা অনুমতি দেওয়ায় চরম ক্ষুব্ধ শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও এলাকার ক্রীড়ামোদি সমাজ।
প্রজ্ঞাপন ও তথ্য-প্রমাণ দেওয়ার পরও নীরব প্রশাসন: নেপথ্যে কিসের স্বার্থ?
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ রক্ষায় এবং আইনি প্রজ্ঞাপন বাস্তবায়নে একটি মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসক এবং সিংগাইর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)-কে লিখিত নথিপত্র, ভূ-সংস্থান ও রাজস্ব দালিলিক প্রমাণ পাঠাল হলেও প্রশাসন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
এ নিয়ে সচেতন মহল প্রশ্ন তুলছে—আইনগত নিষেধাজ্ঞা এবং মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট প্রজ্ঞাপন জানা সত্ত্বেও কেন জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসন এই বেআইনি মেলার অনুমোদন বজায় রাখছে? আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার মতো গুরুতর আইনি ঝুঁকির মুখোমুখি দাঁড়িয়েও কেন স্থানীয় প্রশাসন এই মেলার কাজ অব্যাহত রাখতে এত উদগ্রীব? তবে কি কোনো অদৃশ্য ক্ষমতার চাপ কিংবা নেপথ্যের কোনো সুবিধাপ্রাপ্তি ও আর্থিক রফাদফার দায় চেপেছে প্রশাসনের ওপর—যার কারণে শতবর্ষী ঐতিহ্য ও সরকারি পরিপত্রকেও তারা তোয়াক্কা করছেন না?
মানবাধিকার সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সম্পাদক মাছুদুর রহমান আসলাম কড়া হুশিয়ারি দিয়ে জানান, জেলা প্রশাসক ও ইউএনও-কে চূড়ান্ত বার্তা দিয়ে অনুরোধ জানানো হয়েছে যেন অনতিবিলম্বে এই অবৈধ মেলার অনুমোদন বাতিল ও কার্যক্রম বন্ধ করা হয়। তিনি বলেন, "আমরা পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। প্রশাসন যদি আইন ও সরকারি আদেশ অমান্য করে আগামী ১৮ অক্টোবর মেলার শুভ উদ্বোধন ঘটায়, তবে সরকারি আদেশ অবমাননা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে আমরা অনতিবিলম্বে মহামান্য হাই কোর্টের শরণাপন্ন হব।"
হোয়াটসঅ্যাপে জেলা প্রশাসকের প্রাথমিক বক্তব্য, পরে আর জবাব মেলেনি
এ বিষয়ে মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসকের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে একাধিকবার যোগাযোগ করে মেলার আয়োজন সম্পর্কে অবহিত করা হয়। মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে পাঠানো বার্তার জবাবে জেলা প্রশাসক প্রাথমিকভাবে জানান, সংশ্লিষ্ট মাঠটি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ নয়। পরবর্তীতে সংগঠনটির পক্ষ থেকে মাঠটির পরিচয়, সরকারি খতিয়ান ও অবস্থান-সম্পর্কিত শতভাগ দালিলিক তথ্য-প্রমাণ পাঠিয়ে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানানো হয়।
সংগঠনটির দাবি, এসব সুস্পষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাঠানোর পরও জেলা প্রশাসকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও পরবর্তী বার্তাগুলোর কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। ফলে মাঠটির প্রকৃত পরিচয় জানা সত্ত্বেও মেলার অনুমোদনের আইনগত ভিত্তি এবং সরকারি বিধিবিধান লঙ্ঘনের বিষয়ে জেলা প্রশাসনের সুস্পষ্ট কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের দাপ্তরিক আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে। একই সঙ্গে সিংগাইর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং মেলার আয়োজকদের বক্তব্যও জানতে চেয়ে যোগাযোগের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন