প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
পিরিয়ড ট্যাক্স প্রত্যাহার, পাকিস্তানে সামাজিক ট্যাবু ভাঙার লড়াই।
রক্ষণশীল পাকিস্তানে নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য ও পিরিয়ড বিষয়টি যেন নিষিদ্ধ। জনপরিসরে এটি নিয়ে আলোচনা করা লজ্জার বিষয়, প্রায় অপরাধের সমতুল্য।
সামাজিক ট্যাবু ভাঙার চেষ্টা করতে দেখা যাচ্ছে অধিকারকর্মীদের, যারা বছরের পর বছর ধরে কাজ করে আসছেন। তবে এই বিশাল সামাজিক অচলায়তন ভাঙা এক দিনের কাজ নয়; দিনের পর দিন চেষ্টা চালাতে হবে। প্রকৃতপক্ষে, পাহাড়েরও ঘুম ভাঙাতে একসময় আঘাত করতে হয়।
বর্তমানে, দুটি তরুণ আইনজীবী সরকারের বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জ করে সরকারের টনক কিছুটা নড়িয়েছে। ‘পিরিয়ড ট্যাক্স’ হিসেবে পরিচিত স্যানিটারি পণ্যের ওপর থেকে ১৮ শতাংশ বিক্রয় কর প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তান সরকার।
নারীদের পিরিয়ড বিষয়টি স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়া, যদি সঠিক নিয়ম মেনে এবং স্বাস্থ্যকর স্যানিটারি পণ্য ব্যবহার করা হয়, তাহলে নারীরা পিরিয়ডকালীনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র বা সংসারে স্বাভাবিকভাবে নিজেদের কাজ চালিয়ে যেতে পারেন।
ইউনিসেফের মতে, পাকিস্তানে মাত্র ১২ শতাংশ নারী বাণিজ্যিক স্যানিটারি পণ্য ব্যবহার করেন। বাকি নারী একটানা কাপড়ের টুকরা বা অস্বাস্থ্যকর ঘরোয়া সামগ্রী ব্যবহার করেন, যা তাদের জন্য স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে এবং অনেক সময় স্বাভাবিক কাজের ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করে। স্যানিটারি পণ্য ব্যবহারের এই আটকে থাকার মূল কারণ হচ্ছে এর উচ্চমূল্য। দীর্ঘদিন ধরে স্যানিটারি পণ্যকে বিলাস পণ্যের তালিকায় রাখা হয়েছিল।
দুই তরুণ আইনজীবী সরকারের বিরুদ্ধে করা এক মামলার সূত্রে সামাজিক পরিসরে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। গত বছরের অক্টোবরে ২৯ বছর বয়সী আহসান জাহাঙ্গীর খান ও ২৫ বছর বয়সী মাহনুর ওমর পিরিয়ড ট্যাক্স প্রত্যাহার করতে এবং স্যানিটারি পণ্যকে বিলাসপণ্যের বদলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য হিসেবে ঘোষণা করার দাবিতে আদালতে মামলা করেন।
মামলার আবেদনের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানে স্থানীয়ভাবে তৈরি স্যানিটারি পণ্যের ওপর ১৮ শতাংশ বিক্রয় কর এবং আমদানি করা স্যানিটারি পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ রয়েছে। ইউনিসেফের মতে, অন্যান্য কর যোগ করে নারীদের পিরিয়ড পণ্যের ওপর মোট ৪০ শতাংশ অতিরিক্ত মূল্য দিতে হয়, যা সুবিধাবঞ্চিত নারীদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এই বিষয়ে দুই আইনজীবীর অনুকূলে লড়াই ছিল। তাদের দাবি, সরকার যেন স্যানিটারি পণ্যের দাম কমিয়ে নারীদের জন্য সহজলভ্য করে।
আধিকারকর্মীরা বলছেন, পাকিস্তান সরকার নারীদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার অধিকারকে অবহেলা করছে, যা তাদের সমাজে পূর্ণ অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করছে। এটি সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন, যা লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য নিষিদ্ধ করে।
দুই আইনজীবীর মামলার পর আদালত সরকারের কাছে জবাব চায়। সরকারের দেয়া জবাবে বলা হয়, স্যানিটারি পণ্যের ওপর কর হার অতিরিক্ত বা বৈষম্যমূলক নয়, কারণ এটি রাষ্ট্রের রাজস্ব চাহিদা মেটানোর জন্য তৈরি হয়েছে। তবে বছরের শুরুতে আদালতের কাছে দেয়া জবাবে সরকার স্যানিটারি পণ্যের উপর এই করকে বৈষম্যমূলক মনে না করলেও বর্তমানে অবস্থান পরিবর্তন করেছে। দেশের জাতীয় বাজেট প্রস্তাবনায় স্যানিটারি পণ্যের ওপর থেকে ১৮ শতাংশ বিক্রয় কর প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে।
গত শুক্রবার পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রী মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব বলেন, এ ধরনের পণ্য নারীদের স্বাস্থ্য, মর্যাদা এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে পূর্ণ অংশগ্রহণের জন্য অপরিহার্য।
বিক্রয় কর প্রত্যাহারের ওই প্রস্তাবকে স্বাগত জানানো হয়েছে, তবে আবেদনকারী দুজন আইনজীবী স্যানিটারি প্যাড তৈরির কাঁচামালের ওপর অতিরিক্ত শুল্কসহ স্যানিটারি পণ্যের ওপর থাকা করব্যবস্থাটি পুরোপুরি বিলোপের দাবি জানিয়েছেন।
জাহাঙ্গীর খান বলেন, এই মামলাটি স্যানিটারি পণ্যের ওপর থাকা করব্যবস্থার অযৌক্তিকতাকে সামনে এনেছে। তিনি বলেন, 'যদি এই সাংবিধানিক পিটিশনটি না করা হতো, তবে সরকার হয়তো কখনোই বুঝতে পারত না যে বিক্রয় কর নেওয়াও ভুল ছিল।'
অধিকারকর্মীরা বলছেন, ১৮ শতাংশ বিক্রয় কর প্রত্যাহার করলেও তা সাধারণ নারীদের জন্য সহজলভ্য হবে না। পাকিস্তানের প্রায় ৪৫ শতাংশ মানুষ বৈশ্বিক দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে, তাদের দৈনিক আয় ১ হাজার ১৭৫ পাকিস্তানি রুপি। এক প্যাকেট স্যানিটারি প্যাড কিনতে তাদের এক দিনের আয়ের তিন ভাগের এক ভাগ খরচ হতে পারে।
যাহোক, দুই আইনজীবীর মামলা এবং সরকারের বোধোদয়ের কারণ হিসেবে নারীদের পিরিয়ড ও পিরিয়ডকালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে যে আলোচনা হচ্ছে, তার গুরুত্ব অনেক। পিরিয়ড নিয়ে সামাজিক ট্যাবু ভাঙতে, কুসংস্কার দূর করতে এবং এই লড়াইটিকে এগিয়ে নিতে এই আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখবে।
সরকার স্যানিটারি পণ্যের ওপর ১৮ শতাংশ বিক্রয় কর প্রত্যাহার করলেও মামলাটি এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। সরকারের জবাবের পর মামলাটি বর্তমানে চূড়ান্ত যুক্তিতর্কের জন্য প্রস্তুত। ওমর ও খানের মামলাটি সফল হলে, আদালত স্যানিটারি পণ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত সব কর—কাঁচামালের ওপর আমদানি শুল্ক ও আমদানি করা স্যানিটারি পণ্যের ওপর থেকে সকল কর প্রত্যাহারের নির্দেশ দিতে পারে।
আবেদনকারী দুই আইনজীবী জানিয়েছেন, চূড়ান্ত বিজয় না আসা পর্যন্ত তারা নিজেদের লড়াই চালিয়ে যাবেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন