প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
টানা বৃষ্টি এবং উজান থেকে প্রবাহিত পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকার নদনদীর পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিছু এলাকায় নদীভাঙন ঘটে গেছে, আবার কিছু জায়গায় জলাবদ্ধতাও দেখা দিয়েছে। সুনামগঞ্জ, গাইবান্ধা এবং কক্সবাজারের টেকনাফে এই প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে জনজীবনে।
উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের প্রবাহ চলতে থাকায় সুনামগঞ্জের নদী ও হাওরের পানির স্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে গত রোববারের সঙ্গে তুলনা করলে ঢলের তীব্রতা কিছুটা কমেছে। সুনামগঞ্জ-তাহিরপুর সড়ক থেকেও পানি নেমে গেছে।
সোমবার (২২ জুন) পৌর শহরের ষোলঘর পয়েন্টে সুরমা নদীর উচ্চতা ছিল ৭ দশমিক ১৮ মিটার, যা বিপৎসীমার ৬২ সেন্টিমিটার নিচে অবস্থান করছে। কিন্তু ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে নদীর পানি আবারও বৃদ্ধি পেতে পারে, এটি জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার মন্তব্য করেন, আগামী কয়েক দিনে বৃষ্টি হলে নদী ও হাওরে পানি বাড়বে। কিছু কিছু জায়গায় পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে, তবে বড় ধরনের বন্যার শঙ্কা ফেলছেন না তিনি।
অন্যদিকে, তাহিরপুরের বড়দল পুরানহাটি এলাকায় পাহাড়ি ঢলের ফলে খালের পাড় ভেঙে পড়ে রুবেল মিয়া (৩০) নামে এক মানসিক ভারসাম্যহীন যুবকের মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনা ঘটে গতকাল সকাল ৯টার দিকে।
স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, খালের তীব্র স্রোতে পাড় ভেঙে পাশের একটি ঘর ধসে পড়ে। পরিবারের অন্য সদস্যরা বের হতে পারলেও ঘরের ভেতরে আটকা থাকা রুবেল মিয়া বের হতে পারেননি। প্রায় সাত ঘণ্টার উদ্ধার অভিযানের পর বিকেলে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
তাহিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম বলেন, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়ে মরদেহ উদ্ধার করেছেন।
টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে তিস্তা নদীতে ভয়াবহ ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। গত এক সপ্তাহে উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের ভোরের পাখি চর এলাকায় দেড় শতাধিক বসতভিটা এবং চার শতাধিক একর ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে, বলছেন স্থানীয় জনপ্রতिनिधিরা। স্থানীয়দের দাবি, ভাঙন ঠেকাতে ফেলা জিও ব্যাগগুলো তিস্তার তীব্র স্রোতে ভেসে গেছে। ভাঙনের মুখোমুখি থাকা পরিবারগুলো ঘরবাড়ি সরাতে হিমশিম খাচ্ছে। কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. রফিকুল ইসলাম জানান, সরকারি উদ্যোগে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলা হলেও তা কার্যকর হচ্ছে না। স্থায়ী সমাধান চেয়েছেন চরবাসী।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের তথ্য মতে, তিস্তার চরাঞ্চল বর্তমানে কৃষির সম্ভাবনাময় এলাকা হলেও প্রতিবছর ভাঙনে শত শত হেক্টর কৃষিজমি নদীতে হারিয়ে যাচ্ছে। এতে কৃষকদের উৎপাদন এবং জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম জানান, ভাঙনপ্রবণ এলাকায় জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলার কাজ চলছে। তবে নদী খনন, ড্রেজিং ও নদীশাসন ছাড়া তিস্তার ভাঙন স্থায়ীভাবে রোধ করা সম্ভব নয়।
এদিকে তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় চরাঞ্চলের নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। অনেক স্থানে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হয়ে পড়ায় নৌকাই এখন মানুষের একমাত্র ভরসা।
কক্সবাজারের টেকনাফে দুই-তিন দিন ধরে টানা ভারী বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। পাহাড় ধসের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য মাইকিং করছে।
স্থানীয় প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধিদের তথ্য অনুযায়ী, হ্নীলা, সদর ইউনিয়ন, বাহারছড়া, হোয়াইক্যং, শাহপরীর দ্বীপসহ বিভিন্ন এলাকায় হাজারো পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ফসলি জমি এবং চিংড়ি ঘেরেরও ক্ষতি হয়েছে।
গত সোমবার সকালে মাছ শিকার শেষে ফেরার পথে উত্তাল সাগরে শাহপরীর দ্বীপের দক্ষিণপাড়ার একটি ফিশিং ট্রলার ডুবে গেছে। তবে ট্রলারের মাঝিমাল্লারা সাঁতরে নিরাপদে তীরে ফিরতে সক্ষম হয়েছেন। এই ঘটনায় মোট ২০ লাখ টাকার মাছ ও জালের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, জানিয়েছে স্থানীয় সূত্র।
টেকনাফ বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা আবদুর রশিদ আহমেদ বলেন, টানা বর্ষণের ফলে পাহাড় ধসের ঝুঁকি বেড়ে গেছে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে আহ্বান করা হচ্ছে।
টেকনাফ সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান জিহাদ জানান, ভারী বর্ষণের ফলে একটি নির্মাণাধীন সেতুর অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একইসঙ্গে পাঁচ শতাধিক ঘরবাড়ি পানিবন্দি হয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষ দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছে।
আবহাওয়া ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উজানে বৃষ্টি এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তার কারণে আগামী কয়েক দিনে নদ-নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে যেহেতু এখনও বড় ধরনের বন্যার কোনও শঙ্কা নেই, তাই স্থানীয়ভাবে জলাবদ্ধতা, নদীভাঙন এবং পাহাড়ধসের ঝুঁকি অব্যাহত থাকবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন