প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের কিংবদন্তি খেলোয়াড় ও সংগঠক আবদুস সাদেকের প্রথম জানাজা আজ অনুষ্ঠিত হয়েছে। জানাজাটি শনিবার (২০ জুন) বাদ আসর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার আই ব্লকের বায়তুস সোবহান জামে মসজিদে সম্পন্ন হয়। মরহুম আবদুস সাদেকের দ্বিতীয় জানাজা আগামীকাল রবিবার সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর বনানী ওল্ড ডিওএইচএস মাঠে অনুষ্ঠিত হবে। আবদুস সাদেক শনিবার সকাল ৮টায় রাজধানীর কন্টিনেন্টাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তিনি দুরারোগ্য ক্যান্সারে ভুগছিলেন এবং মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। মরহুম আবদুস সাদেক স্ত্রী, দুই ছেলে এবং এক মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। প্রসঙ্গত, আবদুস সাদেকের ছোট ভাই, দেশের শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান, আহমেদ আকবর সোবহান। এছাড়া মরহুমের বড় ছেলে, টি স্পোর্টসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব, ইশতিয়াক সাদেক। আবদুস সাদেক ছিলেন অবিভক্ত পাকিস্তান জাতীয় হকি দলের একটি তারকা খেলোয়াড়। ফুটবল এবং ক্রিকেটেও তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী। ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ক্লাব আবাহনী ক্রীড়াচক্রের (ঢাকা আবাহনী লিমিটেড) প্রথম ফুটবল অধিনায়ক এবং হকি অধিনায়ক ছিলেন তিনি। আবদুস সাদেক ছিলেন কেবলমাত্র একজন তারকা খেলোয়াড় নয়, বরং তিনি ছিলেন সফল কোচ এবং সংগঠকও। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর, চরম দুঃসময়ে আবাহনীকে নতুন করে জাগিয়ে তুলতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে অসামান্য অবদান রাখার জন্য আবদুস সাদেক ১৯৯৬ সালে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারে ভূষিত হন। আবদুস সাদেকের বাবা, অ্যাডভোকেট আবদুস সোবহান, ব্রিটিশ আমলে ছিলেন খ্যাতনামা সাঁতারু। তাঁর ছোট ভাই, আহমেদ আকবর সোবহানও একসময় হকির তারকা খেলোয়াড় ছিলেন। পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পরপরই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের রোষানলে পড়ে পূর্ব পাকিস্তান। বাঙালির মেধা-মনন বিকাশের সুযোগ ছিল না বললেই চলে। ওই বৈরী পরিবেশের মধ্যেই আবদুস সাদেক পাকিস্তানের জাতীয় হকি দলে ডাক পান। ১৯৬৮ সালের অলিম্পিক দলেও ডাক পেয়েছিলেন, তবে ইনজুরির কারণে তিনি খেলা থেকে বিরত ছিলেন। পাকিস্তান জাতীয় হকি দলের হয়ে, তিনি ইউরোপ সফর করেন। ১৯৬৯ সালে দেড় মাসের ইউরোপ ট্যুরে আবদুস সাদেকরা জার্মানি, ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস ও ইংল্যান্ডে খেলেছেন। ফেরার পথে, মিসরের সঙ্গেও তাঁরা একটি ম্যাচ খেলেছেন। সেই ইউরোপ ট্যুরের সময় মাঠে ক্যারিশমা প্রদর্শনের কারণে আবদুস সাদেক দ্রুত পরিচিত হয়ে উঠেন। বিশেষ করে, দলের সেরা তারকা রশিদ জুনিয়রের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল। ১৯৬৮ সালের অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন পাকিস্তান দলের সেরা তারকারা ইংরেজি জানতেন না, কিন্তু আবদুস সাদেক জানতেন। এ কারণে সবার কাছে তাঁর কদর আলাদা ছিল। শুধু আবদুস সাদেকই নন, তাঁর ছোট ভাই, আহমেদ আকবর সোবহানও হকিতে বেশ নাম কুড়িয়েছিলেন। হকিতে রাইট হাফে খেলতেন তিনি। পূর্ব পাকিস্তান যুবদলে দুই ভাই একসঙ্গে খেলেছেন। স্বাধীনতার পর, জাতীয় হকি চ্যাম্পিয়নশিপে ১৯৭৩ সালে কুমিল্লা জেলা দলের অধিনায়ক ছিলেন আবদুস সাদেক। ফাইনালে, তাঁর ছোট ভাইয়ের একমাত্র গোলেই কুমিল্লা সেবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে শক্তিশালী দল হিসেবে আবির্ভাব ঘটে আবাহনী ক্রীড়াচক্রের। ক্লাব প্রতিষ্ঠাতা শেখ কামাল নতুন দলের পরিচালনার জন্য একজন সুযোগ্য নেতা খুঁজছিলেন। তিনি বাংলাদেশের সেরা তারকাকে বেছে নেন। আবদুস সাদেক, স্বাধীনতার আগে ভিক্টোরিয়া ও দিলকুশার মতো জনপ্রিয় ক্লাবে খেলে, বেশ নাম কুড়িয়েছিলেন। শেখ কামাল ঢাকা আবাহনীর ফুটবল ও হকি দলের নেতৃত্বের ভার অধিকার করেন তাঁর কাঁধে। হকিতে আবাহনীকে হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন করে আস্থার প্রতিদান দেন। ফুটবল ক্যারিয়ার ছেড়ে ১৯৭৭ সালে আবাহনী প্রশিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন আবদুস সাদেক। নতুন দায়িত্ব পেয়ে তিনি ইতিহাস সৃষ্টি করেন। সেবার, আবাহনী লিগে কোনো ম্যাচেই হারেনি। তিন ম্যাচ ড্র ছাড়া, বাকি সব ম্যাচে দাপুটে জয় অর্জন করে। বাংলাদেশে প্রথম দল হিসেবে আবাহনী অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার বিরল রেকর্ড সৃষ্টি করে। স্বাধীন বাংলাদেশে, সেবারই প্রথম কোনো দল অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। প্রশিক্ষকের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার পর আবদুস সাদেক সংগঠক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত, তিনি হকি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁরই প্রচেষ্টায়, ১৯৮৫ সালে ঢাকায় এশিয়া কাপ হকি অনুষ্ঠিত হয়। অথচ, ওই বছরের আয়োজক হওয়ার কথা ছিল জাপানের। এশিয়ার হকি ফেডারেশনের বৈঠকে, সাদেকের কথায় মুগ্ধ হয়ে পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইরানের সমর্থনে বাংলাদেশ আয়োজকের দায়িত্ব পায়। বাংলাদেশের হকি বা ফুটবলে, যখনই সমস্যা দেখা গেছে, তিনি প্রথমে এগিয়ে এসেছেন। স্বাধীনতার ৫০ বছরে, বাংলাদেশে এমন ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। ২০১৭ সালে ঢাকায়, দ্বিতীয়বারের মতো এশিয়া কাপ হকির আসর অনুষ্ঠিত হয়। এখানে, আবদুস সাদেকের বড় ভূমিকা ছিল। হকির ফ্লাডলাইট, ইলেকট্রনিক স্কোর বোর্ডসহ অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তি এসেছে তাঁর প্রচেষ্টায়। ঢাকায় আন্তর্জাতিক হকি ফেডারেশনের সভাপতি নেগ্রে আসার পর প্রথম দেখাতে আবদুস সাদেককে চিনে নেন। তিনি বলেছিলেন, ‘সাদেক একজন কিংবদন্তি হকি খেলোয়াড়। আমার বিশ্বাস, সাদেকের হাত ধরে হকির উন্নয়ন সম্ভব হবে।’ ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর, আবাহনী ক্লাবে টিকে থাকার বিষয়টি নিয়ে সংশয় দেখা দেয়। অনেকে তখন ভয়ে ক্লাবে আসতেন না। এমনকি অনেক সংগঠক বিদেশেও চলে যান। কিন্তু এই দুঃসময়ে, শেখ কামালের হাতে গড়া আবাহনীকে টিকিয়ে রাখার গুরু দায়িত্ব গ্রহণ করেন আবদুস সাদেক। ধানমণ্ডির নিজ বাসভবনে, তিনি সবাইকে নিয়ে আবাহনীকে মাঠে নামানোর নেতৃত্ব দেন। বিপদের সময় তাঁর সাহসিকতার কারণে হয়তো মাথা উঁচু করে টিকে আছে আজকের আবাহনী। আবদুস সাদেকের অসামান্য অবদানের কথা চিন্তা করে, আবাহনী লিমিটেড তাঁকে ‘আজীবন সদস্য’ ঘোষণা করে। ক্রীড়াঙ্গনের এই জীবন্ত কিংবদন্তির জন্ম হয়েছিল ১৯৪৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর, একটি সম্ভ্রান্ত ক্রীড়া পরিবারে। ১৯৭৭-৭৮ মৌসুমে, হকিতে প্রথম জাতীয় দল গঠন করা হয়। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তিন টেস্টে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেন আবদুস সাদেক। সেখানে, হকি টেস্টে, বাংলাদেশ একটিতে জয়, একটিতে ড্র এবং একটিতে পরাজিত হয়। ১৯৭৮ সালে, বাংলাদেশ প্রথম এশিয়ান গেমসে অংশ নেয়। হকিতে, আবদুস সাদেকই অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন