প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সকাল বেলা সূর্য উঠতেই রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দী উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া বাজারে ভেসে আসে আটার কলে এসে পরিচিত শব্দ। 'মেসার্স বাবুল এন্টারপ্রাইজ' নামের এই ছোট্ট আটার কলে ধান এবং গম ভাঙাতে গ্রামের মানুষ একে একে ভিড় জমান। কেউ মাথায় বস্তা নিয়ে আসে, আবার কেউ সাইকেলের ক্যারিয়ারে শস্য বোঝাই করে যেন আসেন। তবে এই আটার কলে শুধু শস্যই ভাঙা হয় না; প্রতিদিন এখানে মানুষের আস্থা, বিশ্বাস এবং জনসেবার এক অনন্য গল্প গড়ে ওঠে।
কলের ভেতরে সাধারণ পোশাকে ব্যস্ত হয়ে কাজ করতে দেখা যায় মো. বাবুল মল্লিককে। তিনি নিজের হাতে ধান-গম ভাঙছেন, এবং মাঝে মাঝে মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন। প্রথমবার দেখে বোঝার উপায় নেই, তিনিই কিন্তু বহরপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের নির্বাচিত ইউপি সদস্য। ১৯৮৯ সালের ১৫ অক্টোবর জন্ম নেওয়া বাবুল মল্লিকের পিতা মেহের মল্লিক। তবে এলাকায় তিনি নিজের নামের চেয়েও বেশি পরিচিত একটি বিশেষ পরিচয়ে, যেটি হলো ‘গরিবের মেম্বার’।
স্থানীয়দের কাছে তার আটার কল যেন একটি অঘোষিত গণশুনানির কেন্দ্র। কেউ জমির কাগজে স্বাক্ষর করতে আসেন, কেউ প্রত্যয়নপত্রের প্রয়োজন নিয়ে, কেউ পারিবারিক বিরোধের সমাধান চাইতে আসেন, আবার কেউ শুধুমাত্র একটি পরামর্শের আশায় উপস্থিত হন। তিনি নিজের কাজের ফাঁকে সবার কথা ধৈর্য সহকারে শোনেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে স্বাক্ষর করেন এবং সমস্যার সমাধানের পথ খুঁজে দেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষায়, "মেম্বার সাহেবকে খুঁজতে ইউনিয়ন পরিষদে যেতে হয় না। বাজারের আটার কলেই পাওয়া যায়।"
জনপ্রতিনিধি হওয়ার পরও বাবুল মল্লিক নিজের পেশা ছাড়েননি। প্রতিদিনের মতো এখনও সকালে দোকান খুলে নিজ হাতে কাজ করেন। তার বিশ্বাস হলো, শ্রমই মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় এবং নিজের উপার্জনের মধ্যেই রয়েছে প্রকৃত আত্মমর্যাদা।
একান্ত আলাপচারিতায় বাবুল মল্লিক বলেন, "মানুষের সেবা করার লক্ষ্য নিয়েই নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলাম। মানুষের ভালোবাসাই আমার সবচেয়ে বড় সম্পদ। এই আটার কলের আয়েই আমার সংসার চলে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে আমি কোনো অর্থ গ্রহণ করি না। মানুষের পাশে থাকতে পারলেই নিজেকে সফল মনে হয়।"
তার এই বক্তব্যটি শুধু কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; প্রতিদিনের জীবনযাপনেই তার প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়। জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি একজন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের মতো কাজ করে তিনি প্রমাণ করেছেন, জনসেবা এবং পরিশ্রম একে অপরের পরিপূরক।
বহরপুর ইউনিয়নের প্রবীণরা বলেন, "এখনও এমন জনপ্রতিনিধি আছেন, যিনি পদমর্যাদার চেয়ে মানুষের পাশে থাকাকে বেশি গুরুত্ব দেন।" অন্যদিকে তরুণদের ভাষায়, "ক্ষমতা নয়, বাবুল মেম্বারের সবচেয়ে বড় শক্তি তার সরলতা ও সততা।"
বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেও বাবুল মল্লিক ব্যতিক্রমী একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, জনসেবা মানেই বড় অফিস, জাঁকজমক বা আনুষ্ঠানিকতা নয়; একটি ছোট্ট আটার কলও হতে পারে মানুষের আস্থা, বিশ্বাস এবং সেবার নির্ভরযোগ্য ঠিকানা।
দিন শেষে আটার কলের যন্ত্রের শব্দ থেমে যায়, কিন্তু থেমে থাকে না বাবুল মল্লিকের দায়িত্ববোধ। কারণ তার কাছে জনপ্রতিনিধিত্ব হলো একটি নির্দিষ্ট সময়ের দায়িত্ব নয়; এটি মানুষের প্রতি একটি নীরব অঙ্গীকার। সম্ভবত এই কারণেই বহরপুর ইউনিয়নের মানুষের কাছে তিনি শুধু একজন ইউপি সদস্য নন, বরং একজন নির্ভরতার প্রতীক। একজন সৎ, পরিশ্রমী এবং শ্রমজীবী জনপ্রতিনিধি, যার হাতে শুধু শস্যই ভাঙে না, প্রতিদিন আরও দৃঢ় হয় মানুষের আস্থা। আর সেই আস্থার নাম হলো—‘গরিবের মেম্বার’ মুঃ বাবুল মল্লিক।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন