প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সিরিয়ার সাবেক নিরাপত্তা কর্মকর্তা আতেফ নাজিবকে মৃত্যুদণ্ডের দণ্ডিত করেছেন দামেস্কের একটি আদালত। তাকে মৃত্যু দণ্ড দেওয়া হয়েছে ১৪ বছরের গৃহযুদ্ধের সময় হত্যা, নির্যাতন ও জোরপূর্বক গুমের ঘটনার জন্য।
মঙ্গলবার, নাজিবের সঙ্গে ক্ষমতাচ্যুত সিরীয় নেতা বাশার আল-আসাদ এবং তার ছোট ভাই মাহের আল-আসাদেরও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
এই রায় তাদের অনুপস্থিতিতে দেওয়া হয়েছে কারণ তারা বর্তমানে সিরিয়ার বাইরে অবস্থান করছেন। দামেস্কের চতুর্থ ফৌজদারি আদালত জানিয়েছে, ২০১১ সালে দারা প্রদেশে আসাদ সরকারের দমন-পীড়নের ঘটনাগুলোকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আসাদ সরকারের পতনের পর বাশার আল-আসাদ ও তার পরিবারের সদস্যরা রাশিয়ায় পালিয়ে যান। অন্যদিকে, নাজিবকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সিরিয়াতে আটক রাখা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিচারের সময় হত্যা, নির্যাতন ও গণহত্যাসহ অন্তত ১০টি অপরাধের অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। ২০১১ সালে দারা প্রদেশে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে তার ভূমিকা মামলায় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয়।
নাজিব তখন দারা প্রদেশে রাজনৈতিক নিরাপত্তা শাখার প্রধান হিসেবে কাজ করছিলেন। সেই সময়, বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়ন চালানোর জন্য তাকে অন্যতম প্রধান দায়ী ব্যক্তি হিসেবে মনে করা হয়।
আতেফ নাজিব সম্পর্কে কিছু তথ্য:
৬৬ বছর বয়সী আতেফ নাজিব ছিলেন সিরিয়ার ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের চাচাতো ভাই এবং দারা প্রদেশের রাজনৈতিক নিরাপত্তা শাখার প্রধান পদে ছিলেন। ২০১১ সালে সিরিয়ায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হওয়ার সময় এ তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করছিলেন। ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে স্কুল শেষ করে নাজিব হোমসের সামরিক একাডেমিতে প্রবেশ করেন, পরে তিনি দারায় রাজনৈতিক নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান হন।
তবে সরকারি নথিতে ঠিক কবে তিনি এই কাঠামোতে প্রবেশ করেন, তা পরিষ্কার নয়। ২০১১ সালের মার্চে সিরিয়ায় গণ-অভ্যুত্থান শুরু হলে নাজিব তখনো এই পদে ছিলেন। সেসময়, দারায় এক স্কুলের দেয়ালে সরকারবিরোধী গ্রাফিতি লেখার অভিযোগে কয়েকজন কিশোরকে গ্রেপ্তার ও নির্যাতন করা হয়। এই ঘটনাটি সিরিয়ায় বড় ধরনের সরকারবিরোধী বিক্ষোভের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হয়।
২০১১ সালের এপ্রিলে নাজিবকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর ওই বিক্ষোভটি দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে পরিণত হয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিদ্রোহীদের হাতে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের সময় আসাদ রাশিয়ায় পালিয়ে যান। শিশু নাজিবও এক পর্যায়ে সিরিয়া ছেড়ে পালিয়ে যান, কিন্তু পরে দেশে ফিরে আসেন।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে লাতাকিয়া প্রদেশে সাবেক সরকারের অনুগতদের বিরুদ্ধে অভিযানের সময় সিরিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করে। তাকে সাবেক সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মধ্যে অন্যতম বড় আটক হিসেবে দেখা হয়। তার বিরুদ্ধে হত্যা, নির্যাতন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধসহ একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে। মঙ্গলবার দামেস্কের চতুর্থ ফৌজদারি আদালত তার মামলার চূড়ান্ত শুনানি শেষে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করে।
আদালতের সিদ্ধান্ত:
সিরিয়ার বিচার ব্যবস্থা সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ, তার ভাই মাহের আল-আসাদ এবং তাদের চাচাতো ভাই আতেফ নাজিবকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছে। আদালতের রায়ে নাজিব-এর বিপুল সংখ্যক বন্দিকে নির্যাতনের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। আটক অবস্থায় অনেক বন্দির মৃত্যুর জন্যও তাকে দায়ী মনে করা হয়েছে।
মাঝের সরকারের অধীনে সাবেক আসাদ সরকারের কোনো শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এটি সিরিয়ার আদালতের প্রথম রায়। আলজাজিরার প্রতিবেদক ওবাইদা হিত্তো উল্লেখ করেন, এটি সিরিয়ার জন্য একটি ঐতিহাসিক ঘটনা, কারণ অভিযুক্তদের মধ্যে নাজিবই একমাত্র ব্যক্তি, যার সিরিয়ার ভেতরে সশরীরে বিচার হয়েছে। অন্য অভিযুক্তদের অনুপস্থিতিতেই তাদের বিরুদ্ধে রায় প্রদান করা হয়েছে।
নাজিবের বিরুদ্ধে অভিযোগ:
২০১১ সালে সিরিয়ায় গণঅভ্যুত্থানের সময় দারা প্রদেশে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংস দমন-পীড়নের নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ ছিল আতেফ নাজিবের বিরুদ্ধে। ওই দমন-পীড়নই পরবর্তীতে দীর্ঘ ১৪ বছরের গৃহযুদ্ধে রূপ নিয়েছে।
নাজিবের বিরুদ্ধে হত্যা, নির্যাতন এবং ২০১১ সালে দারা প্রদেশে গণহত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগ সহ অন্তত ১০টি অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। আদালত এসব ঘটনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করেছে। আলজাজিরা মুবাশিরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, নাজিবের বিরুদ্ধে ৭৫ জন বাদী মামলা করেছেন এবং বিচার চলাকালে তাদের মধ্যে অনেকেই আদালতে সাক্ষ্যও দিয়েছেন।
বিচারটির গুরুত্ব:
আতেফ নাজিবের এই বিচার সিরিয়ার নতুন বিচারব্যবস্থা ও অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি শো করেছে বাশার আল-আসাদ সরকারের আমলে সংঘটিত নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য যাদের দায়ী করা হবে তাদের কতটা জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
যুদ্ধের পর আস্থা বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করতে দেরি হওয়ায় অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সরকার সমালোচনার মুখে পড়েছে। ১৪ বছরের এই যুদ্ধের ফলে আনুমানিক ৫ লাখ মানুষ প্রাণ হারান। সিরিয়ান নেটওয়ার্ক ফর হিউম্যান রাইটসের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যুদ্ধের সময় ১ লাখ ৮১ হাজারেরও বেশি মানুষ জোরপূর্বক নিখোঁজ বা বেআইনিভাবে আটক হয়েছিলেন। তাদের প্রায় ৯০ শতাংশের জন্য আসাদ সরকারকে দায়ী করা হয়েছে।
আলজাজিরার প্রতিবেদক ওবাইদা হিত্তো জানান, এই মামলায় আদালতে যেসব আইনি বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে, সেগুলো ভবিষ্যতে অন্যান্য অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলার ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত তৈরি করবে। ফলে, নাজিবের রায়কে অনেকে দেখছেন, অতীতের অপরাধের বিচার করতে আহমেদ আল-শারার সরকার কতটা সক্ষমতা দেখাতে পারে, তা একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে।
সিরিয়ান নেটওয়ার্ক ফর হিউম্যান রাইটসের প্রতিষ্ঠাতা ফাদেল আবদুলগানি বলেন, এই বিচারের গুরুত্ব শুধু নাজিবকে তার অপরাধের জন্য দায়ী করা হবে কিনা, এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং ভবিষ্যতের বিচার প্রক্রিয়ার জন্য এই মামলায় যে আইনি ভিত্তি তৈরি হবে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
রায় ঘোষণার সময় দামেস্কের আদালতের বাইরে অনেক মানুষ জড়ো হন; হিত্তোর ভাষ্য অনুযায়ী, তারা এই বিচারের জন্য স্বস্তি প্রকাশ করেন। পরে অনেক সিরীয়কে রায় উদ্যাপন করতেও দেখা গেছে। হিত্তো জানান, গত প্রায় দেড় বছরে সিরিয়া আসাদ পরিবারের পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের শাসন ও স্বৈরশাসনের উত্তরাধিকার কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন