প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ফিফার পক্ষপাতিত্ব পাওয়ার গুজব এবং রেফারিংয়ে সুবিধা পাওয়ার অভিযোগ নিয়ে নানা বিতর্কের সৃষ্টি করে ফাইনালে উঠলেও, শেষ পর্যন্ত ট্রফি হাতে নেওয়ার সুযোগ মেলেনি মেসির আর্জেন্টিনার। ১২০ মিনিট জুড়ে চলা ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে দাঁড়াতে পারেনি ২০২২ এর চ্যাম্পিয়নরা।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচ থেকে শুরু করে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত আর্জেন্টিনার প্রায় প্রতিটি ম্যাচে রেফারিং নিয়ে কিছু না কিছু বিতর্কের উত্তেজনা ছিল। এমনকি ফাইনালেও স্পেনের নিকো উইলিয়ামসের গোল বাতিলের সিদ্ধান্তে ফুটবল বিশ্লেষকরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ছিলেন।
আর্জেন্টিনাকে ফিফা সুবিধা দিচ্ছে—এই বিতর্ক টুর্নামেন্ট চলাকালীন এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, মিসর ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ তোলে যে মেসিকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে এবং আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচের রেফারিং এর বিরুদ্ধে অভিযোগ জানায়। আর কিছুদিন পর একই ধরনের অভিযোগ তুলেছিল আলজেরিয়া।
আর্জেন্টিনার গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়ার আইসা মান্দিকে মেসির করা একটি ট্যাকেলে রেফারির হলুদ বা লাল কার্ড না দেওয়ার কারণে তৈরি হয় আলোচনা। পিছন থেকে ট্যাকেল করে মেসি যখন আলজেরিয়ার আইসা মান্দিকে আঘাত করেন, তখন মেসির বুট মান্দির হাঁটুর পেছনে লাগে। সাধারণত এই ধরনের ট্যাকেলে লাল কার্ড দেওয়ার প্রচলন থাকলেও ওই ঘটনায় মেসির হলুদ কার্ডও হয়নি।
ম্যাচ শেষে আলজেরিয়ার আইসা মান্দি এই ট্যাকেল নিয়ে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় অভিযোগ করেন যে, মেসি বিশ্বকাপের অন্যতম বড় তারকা হওয়ায় তিনি লাল কার্ড পাননি।
ম্যাচের দুদিন পরে করা আলজেরিয়ার অভিযোগের পর ফিফার রেফারিং কমিশনও বিষয়টিতে গুরুত্ব দেয়।
ফুটবল বিশ্লেষক এবং সাবেক ফুটবলাররা ওই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া জানান। কেউ কেউ মনে করেন ওই ট্যাকেলের জন্য মেসির লাল কার্ড হওয়া উচিত ছিল, আবার কয়েকজন বলেন ম্যাচের পরিস্থিতি এবং ট্যাকেলের গভীরতা বিবেচনা করেই রেফারি মেসিকে কার্ড দেননি। রেফারির সিদ্ধান্তের পক্ষে তাদের যুক্তি হলো, সে সময় মাঠের পরিস্থিতি দর্শকদের চেয়ে রেফারি বেশ ভালো বুঝেছিলেন।
গ্রুপ পর্বে আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় ম্যাচের ঘটনার পরপর কিছু ফুটবল বিশ্লেষক সমালোচনা করেন, তবে মূলত এই বিষয়টি আর্জেন্টিনা-মিসরের ম্যাচের পরেই আলোচনা শুরু করে। রাউন্ড অব সিক্সটিনে আর্জেন্টিনা-মিসরের ম্যাচে মিসরের একটি গোল বাতিল হওয়ার পেছনে ছিল গোলের বিল্ডআপে আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে ফাউল করা। ওই গোল বাতিল নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা উঠে আসার সময় অস্ট্রিয়া ম্যাচের আর্জেন্টিনার প্রথম গোল নিয়ে বিতর্কও আবার সামনে আসে।
অস্ট্রিয়ার সঙ্গে ম্যাচের আগে গোল করার বিল্ডআপে ম্যাক আলিস্টার ফাউল করেন শালগারকে, সেখান থেকে বল পেয়ে গোল করেন মেসি। অস্ট্রিয়ার খেলোয়াড়রা আপিল করলেও ওই ক্ষেত্রে ভিএআর রিভিউ করা হয়নি।
ম্যাক আলিস্টার-এর ওই ট্যাকেল আলোচনায় উঠে আসে এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বিতর্কের সৃষ্টি করা আর্জেন্টিনা-মিসরের রাউন্ড অব সিক্সটিন ম্যাচের পর। লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে ফাউল করার কারণে মোস্তফা জিকোর গোল বাতিল হওয়া ছাড়াও ওই ম্যাচের শেষদিকে হুলিয়ান আলভারেজের মোহাম্মদ সালাহকে বক্সের মধ্যে করা ট্যাকেলও আলোচনার অধ্যায়।
সালাহকে করা ওই ট্যাকেলের জন্য মিসরের খেলোয়াড় এবং কোচিং স্টাফ আপিল করলেও রেফারি তা আমলে নেননি। এরপর মিসরের কোচ ‘বৈষম্যমূলক’ আচরণের অভিযোগ উত্থাপন করেন এবং বলেন যে তাদের কাছ থেকে ম্যাচ ‘ছিনিয়ে’ নেওয়া হয়েছে।
কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের সাথে আর্জেন্টিনা ১-১ সমতায় থাকার সময় ব্রিল এমবোলোর দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখা নিয়েও আলোচনা সৃষ্টি হয়। এমবোলোকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখানো হয় ‘মিসটেইকেন আইডেন্টিটি রুল’ অনুযায়ী।
‘মিসটেইকেন আইডেন্টিটি রুল’ বলছে, কোনো খেলোয়াড় যদি একটি ফাউলের জন্য হলুদ বা লাল কার্ড পান, কিন্তু আসলে ফাউলটি অন্য খেলোয়াড়ের দ্বারা সংঘটিত হতে থাকে, তাহলে রেফারি দায়িত্ব পরিবর্তন করে দায়ী খেলোয়াড়কে একই শাস্তি দিতে হবে।
এই পরিস্থিতিতে রেফারি প্রথমে আর্জেন্টিনার পারেদেসকে হলুদ কার্ড দেখান এমবোলোকে ফাউল করার কারণে। কিন্তু পরে ভিএআর জানায় যে, এমবোলো আসলে ডাইভ দিয়েছেন। ফলে সাথে সাথে পারেদেসের কার্ড বদলিয়ে সেটি এমবোলোকে দেওয়া হয় এবং এমবোলোকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখানো হয় এবং তাকে মাঠ ছাড়তে হয়।
সमीক্ষকদের অনেকেই সে সময় মন্তব্য করেন যে রেফারি এমবোলোকে এই ক্ষেত্রে কার্ড না দিতে পারতেন। আবার অনেকের মতে, এমন গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে এমবোলোর অবিবেচক আচরণ শাস্তির উপযুক্ত অপরাধ। ওই ম্যাচের শেষ দিকে আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোলের সময় লাউতারো মার্টিনেজের গোল উদযাপন ঘিরে আলোচনা তৈরি হয়, কেন তাকে হলুদ কার্ড দেওয়া হয়নি।
গোল করে মার্টিনেজ মাঠের সীমানা টপকে দর্শকদের কাছে গিয়ে গোল উদযাপন করেন, যা বিশ্বকাপের নিয়ম অনুযায়ী হলুদ কার্ড দেখানোর মতো অপরাধ। আর ওই ম্যাচে আগে থেকে একটি হলুদ কার্ড নিয়ে থাকা লাউতারো দ্বিতীয় হলুদ কার্ড পানলে সেমিফাইনাল খেলতে পারতেন না এবং ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে জয়সূচক গোলও করতে পারতেন না। তবে নানা অভিযোগ, সমালোচনা এবং বিতর্ক থাকলেও পুরো বিশ্বকাপ জুড়ে আর্জেন্টিনা যে অন্যতম সেরা দল হিসাবে ফাইনাল খেলেছে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
মিসর বা ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে পিছিয়ে পরেও ম্যাচে ফেরা কিংবা কেপ ভার্ডে এবং সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে দুর্দান্ত লড়াই প্রদর্শনের মাধ্যমে তারা তাদের খেলার মান প্রমাণ করেছে। আর আর্জেন্টিনার মাঠের খেলার গুণগত মানের সবচেয়ে বড় প্রশংসা সম্ভবত করেছেন বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনের কোপ লুই দে লা ফুয়েন্তে।
ফাইনালের আগে একটি প্রেস কনফারেন্সে তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল আর্জেন্টিনা ‘ডার্টি ফুটবল’ খেলছে কি না। জবাবে স্প্যানিশ কোচ বলেছিলেন, ‘না, প্লিজ এমন মনে করবেন না। এই দলটি একটি কোপা আমেরিকা জিতে তারপর আবার বিশ্বকাপ জিতেছে।’
সেখানে আবার কোপা আমেরিকা জিতেছে এবং এখন আবার বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলতে যাচ্ছে। পাঁচ বছর ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ের ফুটবলে তারা ধারাবাহিক পারফর্ম করছে। ফুটবল ইতিহাসের খুব কম দলই এই ধরনের অর্জন করে দেখিয়েছে। তাই তাদের প্রতি আমার মধ্যে শুধু শ্রদ্ধাবোধই কাজ করে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন