প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মালয়েশিয়ায় বসবাসকারী ১২ বছর বয়সী রোহিঙ্গা শরণার্থী নুর গত জুন মাস থেকে আর স্কুলে যাতায়াত করতে পারছে না। স্কুলে যেতে যেতে দুই ব্যক্তি তার ওপর মারধরের হুমকি দেয়। এই ঘটনার পর তার পরিবার তাকে স্কুলে পাঠানো বন্ধ করে দেয়।
নুর জানায়, ওই দুই ব্যক্তি তাকে বলেছিল, "তুমি স্কুলে যেতে চাও কেন? আমাদের দেশ দখল করতে চাও?" নিরাপত্তার কারণে নুরের পরিবারের সদস্যরা তার পুরো নাম প্রকাশ করতে চাননি। অধিকার কর্মী ও শিক্ষকদের ভাষ্য, নুরের মতো আরো অনেক রোহিঙ্গা শিশুকে একই ধরনের হুমকি ও ভয়ের মুখে পড়তে হচ্ছে। এর ফলস্বরূপ মালয়েশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে শরণার্থীদের জন্য পরিচালিত একাধিক শিক্ষা কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশে বেড়ে ওঠা রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী শারিফা শাকিরাহ বলেন, অনেক শিশু ভয়ে এতটাই আতঙ্কিত হয়ে গেছে যে তারা ঘরের বাইরেও বের হতে চাচ্ছে না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, একটি শিশুকে কয়েক দিনের জন্য ভয় দেখানো মানে শুধু ওই সময়টুকুর ক্ষতি নয়। এতে তাদের মনে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক আঘাত তৈরি হয়।
রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রোহিঙ্গাবিরোধী ঘৃণামূলক প্রচারণা ছড়িয়ে পড়ার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত নয়টি শরণার্থী স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। অনলাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ভুয়া তথ্য, উসকানিমূলক পোস্ট এবং বিদ্বেষমূলক প্রচারণা ছড়ানোর ফলে তাদের ওপর নজরদারি ও প্রশাসনিক তৎপরতাও বেড়েছে। স্কুল বন্ধ হওয়া ও এসব ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলেও মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো মন্তব্য করেনি। মালয়েশিয়া সরকার রোহিঙ্গাদের আনুষ্ঠানিকভাবে শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। এদেশটি তাদের অবৈধ অভিবাসী হিসেবে বিবেচনা করে। তবে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) হিসাবে, বর্তমানে মালয়েশিয়ায় প্রায় এক লাখ ২০ হাজার নিবন্ধিত রোহিঙ্গা রয়েছেন।
মালয়েশিয়া দীর্ঘ সময় ধরে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে মিয়ানমারের নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছিল। কিন্তু করোনা মহামারির সময় পরিস্থিতি বদলে যায়। তখন রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে করোনা ছড়ানোর, স্থানীয় সংস্কৃতিকে অসম্মান করার এবং চাকরির প্রতিযোগিতা বাড়ানোর মতো অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে। গত সপ্তাহে মালয়েশিয়ার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী লুকানিসমান আওয়াং সাউনি সংসদে বলেন, রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে ঘিরে সমস্যা তৈরি হওয়ায় দেশের মানুষ নিজেদের ওপর অতিরিক্ত চাপ অনুভব করছেন।
গোটা জুন মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রোহিঙ্গাবিরোধী প্রচারণা পুনরায় বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। মেটার ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও থ্রেডস এবং বাইটড্যান্সের টিকটকে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক পোস্ট ছড়িয়ে পড়েছে। এসব পোস্টে একটি রোহিঙ্গা গোষ্ঠীর কোরবানির সময় গরু জবাই করার ধর্মীয় রীতিকে পরিচ্ছন্নতা-সংক্রান্ত অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। জুন মাসে মালয়েশিয়া সরকারকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দেশ থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্যে একটি অনলাইন আবেদন চালু হয়েছিল। পরবর্তীতে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগের কারণে সেটি সরিয়ে ফেলা হয়। কিন্তু এর আগেই সেখানে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ স্বাক্ষর করে ফেলেছিল। শারিফা শাকিরাহ বলেন, এখন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা করোনা মহামারির কাল থেকে অনেক বেশি উদ্বেগজনক।
রয়টার্সের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু পোস্টে রোহিঙ্গাদের, এমনকি শিশুদের বিরুদ্ধেও সহিংসতার আহ্বান জানানো হয়েছে। মেটার মালিকানাধীন থ্রেডসে একটি আলোচনার শিরোনাম ছিল 'লেমপাং রোহিঙ্গা', যার অর্থ মালয় ভাষায়, 'রোহিঙ্গাকে চড় মারো'। কিছু জনপ্রিয় অনলাইন ব্যক্তিত্ব মানুষকে রোহিঙ্গা বসতি ভিডিও ধারণ করতে এবং তাদের অবস্থান কর্তৃপক্ষকে জানানোর জন্য উৎসাহিত করেছেন। তবে জুন মাসে মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাইফুদ্দিন নাসুতিওন ইসমাইল বলেছেন, সরকার চাইলে ইচ্ছেমতো শরণার্থীদের দেশ থেকে বের করে দিতে পারে না। তিনি বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা ও মানবিক দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য রেখেই সরকার ব্যবস্থা নিতে চায়।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংগঠন 'আর্টিকেল ১৯' বলেছে, অনলাইনে ছড়ানো বিদ্বেষমূলক প্রচারণার কারণে রোহিঙ্গাদের ওপর নজরদারি বেড়েছে। এর ফলে তদন্ত, অভিযান এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘটনা ঘটছে। তবে মানবাধিকারভিত্তিক কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না বলে সংগঠনটির অভিযোগ। তাদের একজন মুখপাত্র বলেন, সরকারের শাস্তিমূলক পদক্ষেপ পরিস্থিতি শান্ত করার বদলে আরো উত্তেজনা সৃষ্টির কারণ হচ্ছে। অন্যদিকে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা জানিয়েছে, রোহিঙ্গা ও অন্যান্য শরণার্থীদের বিরুদ্ধে বাড়তে থাকা ঘৃণামূলক বক্তব্য, ভুয়া তথ্য ও মানবিক মর্যাদা অস্বীকারের প্রচারণা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। সংস্থাটি বলছে, তারা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছে এবং শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা জনগণের ঝুঁকি কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগে সহায়তা করছে। তবে বিবৃতিতে স্কুল বন্ধের ব্যাপারটি উল্লেখ করা হয়নি।
মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ বলছে, অনুমতি ছাড়া পরিচালনার কারণে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। দেশটিতে শরণার্থীদের আইনগতভাবে কাজ করার অনুমতি নেই। তাদের সন্তানরাও সরকারি স্কুলে ভর্তি হতে পারে না। ফলে তারা মূলত বেসরকারি সংস্থা পরিচালিত শিক্ষা কেন্দ্র ও অনানুষ্ঠানিক স্কুলের ওপর নির্ভরশীল। নুরের ঘটনার পর তার স্কুলের শিক্ষক নিরাপত্তার কারণে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস বন্ধ করে দেন। একই এলাকার আরো দুটি শরণার্থী স্কুলও বন্ধ হয়ে যায়।
স্কুলের শিক্ষক জানান, অনেক সময় রোহিঙ্গা শিশুদের সরকারি খেলার মাঠ থেকেও তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি ২০২২ সালে এই শিক্ষা কেন্দ্র চালু করেছিলেন, যা ছিল শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে, যাতে ভবিষ্যতে তারা অন্য কোনো দেশে পুনর্বাসিত হতে পারে অথবা নিরাপদে নিজ দেশে ফিরে যেতে পারে। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন, তার স্কুল রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে মালয়েশিয়ায় বসবাসে উৎসাহিত করে না বা স্থানীয়দের চাকরি নিতে সহায়তা করে না। নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, এই স্কুলের মাধ্যমে তিনি শিশুদের আইন মেনে চলতে শেখানোর চেষ্টা করছেন।
উত্তরাঞ্চলের কেদাহ রাজ্যের একটি শরণার্থী স্কুলও চলতি মাসে কর্তৃপক্ষ বন্ধ করে দেয়। এভাবে প্রয়োজনীয় অনুমতির অভাবের কারণে বন্ধ হয়েছে। এর আগে স্কুলটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের নেতা ও শিক্ষকদের তথ্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ ওঠার পর নিরাপত্তাজনিত কারণ বা প্রশাসনের সিদ্ধান্তে অন্তত নয়টি শরণার্থী স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। এখনো চালু থাকা কয়েকটি স্কুল নিরাপত্তার জন্য নতুন ব্যবস্থা নিয়েছে। শিক্ষার্থীদের ইউনিফর্ম পরতে নিষেধ করা হয়েছে এবং সব ধরনের বাইরের কার্যক্রমও বন্ধ রাখা হয়েছে।
অধিকারকর্মী শারিফা শাকিরাহ সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকলে ভবিষ্যতে সামাজিক সমস্যা আরো বাড়বে। তার মতে, এতে রোহিঙ্গা কিশোরীদের অল্প বয়সে বিয়ের ঝুঁকি বাড়বে। একই সঙ্গে অনেক শিশু রাস্তায় ঘুরে বেড়াবে অথবা ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়তে পারে। তিনি বলেন, অনেকেই অভিযোগ করেন যে রোহিঙ্গা শিশুরা রাস্তায় ভিক্ষা করে। কিন্তু স্কুল বন্ধ থাকলে এমন শিশুর সংখ্যা বাড়বে। অধিকারকর্মীদের মতে, এই ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলে দিয়েছে যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো ঘৃণামূলক বক্তব্য ও সহিংসতামূলক কনটেন্ট কতটা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে। 'আর্টিকেল ১৯' জানিয়েছে, তাদের অভিযোগের পর মেটা ও টিকটক কিছু পোস্ট সরিয়ে ফেলেছে, কিন্তু অনেক পোস্ট এখনো অনলাইনে রয়েছে।
রয়টার্সের পাঠানো ১০টি পোস্টের মধ্যে মেটা ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও থ্রেডস থেকে সাতটি সরিয়েছে। টিকটক ১১টি পোস্টের মধ্যে আটটি সরিয়ে দিয়েছে। 'আর্টিকেল ১৯' এর ভাষ্য, নীতিমালা থাকলেও এসব প্ল্যাটফর্মে তার প্রয়োগ সব সময় একরকম নয়। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থা অনেক সময় সাংকেতিক ভাষা, ছবি বা স্থানীয় ভাষার সূক্ষ্ম অর্থ বুঝতে পারে না। মেটা ও টিকটক জানিয়েছে, তারা ঘৃণামূলক বক্তব্য ঠেকাতে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও মানব পর্যালোচনা—দুই পদ্ধতিই ব্যবহার করছে। টিকটক আরো জানায়, ক্ষতিকর মন্তব্য করার আগে ব্যবহারকারীদের সতর্ক করার ব্যবস্থা তাদের প্ল্যাটফর্মে রয়েছে।
এখন নুরের মতো অনেক শিশুর সামনে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কান্নাজড়িত কণ্ঠে নুর রয়টার্সকে বলেন, 'আমি যদি স্কুলে যেতে না পারি, তাহলে কিছুই শিখতে পারব না। আর জীবনে কিছুই হতে পারব না।'
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন