প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে সংঘাতের কারণে বিকল্প হিসেবে এই নৌপথের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেলেও, বাব আল-মান্দেবও যদি ঝুঁকিতে পড়ে, তাহলে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য এবং জ্বালানি সরবরাহে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
টিবিএস-এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, লোহিত সাগরে সংঘাত বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপগামী জাহাজগুলোকে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে যেতে হবে। এতে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ অতিক্রম করতে হবে। সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, এতে পণ্য পৌঁছাতে সময় ১৫ থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত বাড়তে পারে। একই সঙ্গে, বীমা এবং জ্বালানি খরচ বৃদ্ধির কারণে জাহাজ ভাড়া ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
২০২৩ সালে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে হামলা চালায় হুতিরা। সেই সময় থেকে অনেক আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি লোহিত সাগর এড়িয়ে কেপ অব গুড হোপ ঘুরে চলাচল করছে। চলতি বছরে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের হামলার কারণে সৌদি স্বার্থকে লক্ষ্য করে হুতিরা আবারও হামলা শুরু করেছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে অগ্রসর হয়ে হুতিরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের নিয়ন্ত্রণ আরো বৃদ্ধি করেছে।
এদিকে, ইরাক থেকে চালানো ড্রোন হামলার পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সৌদি আরব ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে।
লোহিত সাগর এবং সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যের একটি বড় অংশ পরিচালিত হয়। ফলে, এই পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানিতে সরাসরি প্রভাব পড়বে।
কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে দক্ষিণ কোরিয়াগামী জাহাজ যদি বিকল্প পথে চলে, তাহলে যাত্রার সময় ২৪ দিন থেকে বেড়ে প্রায় ৫৪ দিন হতে পারে।
এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক এবং তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক ফজলুল হক বলেন, "লোহিত সাগর বাংলাদেশের ইউরোপমুখী বাণিজ্যের প্রধান সমুদ্রপথ।"
তিনি আরও বলেন, "এ পথে সমস্যা হলে জাহাজকে কেপ অব গুড হোপ ঘুরে যেতে হবে। এতে সময় এবং ফ্রেইট খরচ দুটোই বাড়বে।" মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের ৮০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাফা) সাবেক সভাপতি কবির আহমেদ খান বলেন, "লোহিত সাগর বন্ধ হলে ইউরোপে বাংলাদেশের পণ্য পৌঁছাতে বাড়তি প্রায় ১৫ দিন লাগতে পারে।" তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, জ্বালানি এবং বীমা খরচ বৃদ্ধি পেলে জাহাজ ভাড়া ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
বাফার সাবেক সহসভাপতি খায়রুল আলম সুজন বলেন, "এখন পর্যন্ত মেইনলাইন অপারেটরদের কাছ থেকে ভাড়া বৃদ্ধি বা শিডিউল পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। তবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।"
ফ্রেইট খরচ বৃদ্ধি পেলে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়তে পারে ছোট ও মাঝারি পোশাক রপ্তানিকারকদের ওপর। এফওবি পদ্ধতিতে মূল ফ্রেইট খরচ বিদেশি ক্রেতারা বহন করলেও, ব্যয় বেড়ে গেলে তার একটি অংশ সরবরাহকারীদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করতে পারেন তারা।
বিজিএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি ইনামুল হক খান বাবলু বলেন, "ছোট ও মাঝারি রপ্তানিকারকরা অর্ডার হারানোর আশঙ্কায় বাড়তি লজিস্টিকস খরচের অংশ নিজেরা বহন করতে বাধ্য হতে পারেন।" এলডিপি পদ্ধতিতে রপ্তানির ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরো বেশি। বাংলাদেশের ৫ থেকে ১০ শতাংশ চালান এ পদ্ধতিতে যায়।
হরমুজ এবং বাব আল-মান্দেব নৌপথে সংকট তৈরি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ আরো সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গত শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৪.৬১ ডলারে উঠে গেছে। এক মাস আগে এর দাম ছিল ৮৭.০৭ ডলার। বাংলাদেশের আমদানি করা মুরবান ক্রুডের দামও একই সময়ে ৮২.২৫ ডলার থেকে বেড়ে ১১৯.৪৬ ডলারে পৌঁছেছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম তামিম বলেন, "পরিস্থিতি সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি দ্রুত জ্বালানি তেল, বিশেষ করে ডিজেলের মজুদ বাড়াতে হবে।" তিনি সতর্ক করেন যে, "বিশ্বের প্রধান তেল পরিবহনপথগুলো একসঙ্গে বাধাগ্রস্ত হলে জ্বালানি সরবরাহে বড় সংকট তৈরি হতে পারে।"
এদিকে, ইআইএর তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে দৈনিক তেল পরিবহন ২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে ২ কোটি ১৬ লাখ ব্যারেল থেকে কমে ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৪৯ লাখ ব্যারেলে নেমে আসবে। ফলে, হরমুজের পর বাব আল-মান্দেবেও সংকট তৈরি হলে বাংলাদেশের বাণিজ্য এবং জ্বালানি নিরাপত্তার ঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন