প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাত বন্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পথে রয়েছে, এই কথা জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি। তিনি উল্লেখ করেছেন, চুক্তি কার্যকর হলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি আবার পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে।
এছাড়া, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও নৌ অবরোধ ধাপে ধাপে তুলে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আরাগচি বলেন, চুক্তির মূল বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে অবরোধ প্রত্যাহার এবং যুদ্ধ-পরবর্তী উত্তেজনা কমানো। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা পরবর্তী ধাপে শুরু হবে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারাও চুক্তির ব্যাপারে আলোচনা অগ্রগতির কথা স্বীকার করেছেন। তারা জানিয়েছেন যে, ইরান চুক্তির শর্ত বাস্তবে কার্যকর করলেই কেবল অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে। এটি শুধুমাত্র প্রতিশ্রুতি নয়, বরং বাস্তব পদক্ষেপই হবে সুবিধা পাওয়ার ভিত্তি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরানকে ঘিরে একটি বড় ধরনের সামরিক সংঘাত শুরু হয়। এর প্রতিক্রিয়ায়, ইরান ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালানো শুরু করেছে। একই সময়, কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হয় হরমুজ প্রণালি, যা বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ।
এপ্রিল মাসে উভয় পক্ষ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও পুরোপুরি উত্তেজনা কমেনি। গত কয়েক মাস ধরে একাধিকবার হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে। চলতি সপ্তাহেও দুই দফা সামরিক সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই বৃহস্পতিবার, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, তিনি ইরানের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত একটি সামরিক হামলা স্থগিত করেছেন।
তার ভাষ্য, আলোচনা অংশ নেওয়া প্রতিনিধিরা একটি সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেছেন এবং খুব শিগগিরই চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে। শুক্রবার, ইরানের কয়েকটি সংবাদমাধ্যম কথিত ১৪ দফা চুক্তির কিছু তথ্য প্রকাশ করেছে। তবে ট্রাম্প এসব তথ্যকে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, প্রকাশিত শর্তগুলোর সঙ্গে প্রকৃত আলোচনার কোনো সম্পর্ক নেই।
একই দিনে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানান, তার দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে। তার মতে, দুই দেশ একটি সমঝোতা স্মারক বা এমওইউর বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। এখন শুধু চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষা।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি বলেন, দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের ভেতরে চুক্তির শর্ত নিয়ে এখনো মতপার্থক্য রয়েছে। কিছু লোক সমর্থন করছেন, আবার কেউ আপত্তি তুলেছেন। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তিনি বলেন, অনুমোদন পাওয়া গেলে দূর থেকেই চুক্তি স্বাক্ষর করা হবে এবং তা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে। তাদের আশা, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে পারে।
বর্তমান আলোচনায়, ইসরায়েল সরাসরি অংশ নিচ্ছে না। আলোচনার প্রধান লক্ষ্য হলো যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো, উত্তেজনা কমানো এবং পরবর্তী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে আলোচনা শুরু করা। এর মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিও রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা দেশগুলো অভিযোগ করে আসছে যে, ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে। তবে ইরান বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে, বলছে যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শুধুমাত্র বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার মতো শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানি জাহাজ চলাচলের ওপর থাকা অবরোধ তুলে নেওয়ার বিনিময়ে হরমুজ প্রণালি আবার আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। তাদের মতে, চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর এসব পদক্ষেপ প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বাস্তবায়ন শুরু হবে। এরপর শুরু হবে ৬০ দিনের একটি নতুন আলোচনা পর্ব। সেখানে মূল আলোচনা বিষয় হবে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত। এই উপাদান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, এসব উপাদান ইরানের ভেতরেই ধ্বংস করা হবে এবং পরে সেগুলো সরিয়ে নেওয়া হবে। তবে কী পদ্ধতিতে তা করা হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। অর্থনৈতিক সুবিধার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট করে বলেছে, চুক্তির শুরুতেই ইরানকে কোনো অর্থ দেওয়া হবে না। বরং ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সম্পদ পর্যায়ক্রমে মুক্ত করা হতে পারে। এর মাধ্যমে তারা কিছু ইরানি গণমাধ্যমের খবর কার্যত নাকচ করে দেন। ওই সব খবরে বলা হয়েছিল, বড় ধরনের আলোচনা শুরুর আগেই ইরানের কিছু আটকে থাকা সম্পদ মুক্ত করা হবে।
চুক্তির খসড়ায় ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন প্রক্সি গোষ্ঠীর প্রতি আর্থিক সহায়তা বন্ধ করার আহ্বানও রাখা হয়েছে। এর মধ্যে লেবাননের হিজবুল্লাহসহ ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিষয়টি রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মার্কিন কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন, এই সমঝোতা কোনো বিশ্বাস বা মৌখিক প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর করছে না। বরং, ইরান বাস্তবে কী পদক্ষেপ নেয়, তার ওপরই সমস্ত ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা নির্ভর করবে।
বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নেয়ার ইলন মাস্ক
যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, পাকিস্তান এবং মধ্যস্থতায় সহায়তাকারী কাতারের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হলেও চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার আগে এখনো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বাকি রয়েছে। গত কয়েক মাসে একাধিকবার এমন সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হলেও শেষ মুহূর্তে তা ভেস্তে গেছে। তবে এবারের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন বলে মনে করছে যুক্তরাষ্ট্র। তারা মনে করেন, এবারের আলোচনা অগ্রগতি এবং আশাবাদ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। উভয় পক্ষ এখন চুক্তির বিষয়গুলো নিয়ে অনেক বেশি খোলামেলা আলোচনা করছে।
আরাগচি বলেছেন, আলোচনা এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে খুব দ্রুত চুক্তি স্বাক্ষর ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে।
হরমুজ প্রণালি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা আগের মতো থাকবে না। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সাধারণত এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। সেজন্য এই পথের স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরায় চালু হওয়া বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। প্রণালি বন্ধ করার পর থেকে ইরান সেখানে চলাচল করতে চাওয়া জাহাজগুলোর কাছ থেকে ফি দাবি করে আসছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো, সব জাহাজের জন্য এই পথ উন্মুক্ত ও বাধাহীন থাকা উচিত।
আরাগচি আরো জানান, সমঝোতা স্মারকে লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যকার সংঘাত কমানোর বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যদিও আগে কিছু মার্কিন প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, লেবাননের বিষয়টি হয়তো আলোচনার অংশ হবে না।
এদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সতর্ক করে বলেছেন, উত্তর ইসরায়েলে হামলা অব্যাহত থাকলে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানো হবে। ফলে, চুক্তি চূড়ান্ত হলেও মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন