প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দুবাইয়ে থাকা সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদকে কিভাবে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে, সেটিই বর্তমানে দেশের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। সরকার ইতোমধ্যে বেনজীরকে ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুতির কাজ শুরু করেছে।
দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রত্যর্পণ প্রস্তাব প্রস্তুত করার কাজ চলছে। প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াটি সহজ করতে, প্রস্তাবে শুধু দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা পাসপোর্ট জালিয়াতি ও দুর্নীতির ৬টি মামলার নথিপত্র যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের কাছ থেকে সব নথিপত্র পাওয়ার পর, আমিরাতের আদালত বেনজীরকে ফেরানোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন। নথি সংক্রান্ত জটিলতার কারণে যাতে বেনজীরের দেশে ফেরা আটকে না যায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।
নথিগুলো প্রস্তুত হওয়ার পর, সেগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখায় পাঠানো হবে। এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রস্তাবটিতে সেগুলো যুক্ত করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। পরে সেই প্রস্তাব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পৌঁছানো হবে। গতকাল সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
দেশে ফিরে আসার জন্য, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, আমিরাতের কর্তৃপক্ষ প্রথমে প্রত্যর্পণ অনুরোধটি যাচাই করবে। তারা দেখবে, যে অপরাধের অভিযোগে বাংলাদেশ বেনজীর আহমেদকে ফেরত চায়, সেটি কি আমিরাতের আইনের অধীনে অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। যদি আমিরাতের আদালত মনে করে যে, বাংলাদেশে বেনজীরের ন্যায্য বিচার হবে এবং তাকে ফেরত দেওয়া উচিত, তাহলে বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সম্ভব হবে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানিয়েছে, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ১৭টি, দুদকের ৬টি ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) ৩টি পরোয়ানা রয়েছে। দুদকের ৬টি মামলার মধ্যে একটি মামলায় পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের অভিযোগের তালিকায় রয়েছে গুম কমিশনের দেওয়া অভিযোগ, শাপলা চত্বরে গণহত্যা এবং দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের গুরুতর অভিযোগ। তবে, বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য যে প্রত্যর্পণের প্রস্তাব দুবাইয়ে পাঠানো হবে, সেখানে শুধুমাত্র দুদক কর্তৃক দায়ের করা দুর্নীতি ও জালিয়াতির নথিপত্র অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এছাড়াও, দুদকের যে মামলায় পরোয়ানা জারি হয়েছে সেটাও সঙ্গে থাকবে। এই বিষয়ক পরোয়ানার কপি ইতোমধ্যে আরবিতে অনুবাদ করা হয়েছে। মামলার নথিগুলো প্রস্তুত হয়ে গেলে, সেগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখায় পাঠানো হবে। রাজনৈতিক অধিশাখা কাগজগুলো যাচাই করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। এরপর, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটি দুবাইয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে।
একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, আগামী বুধবার বা বৃহস্পতিবার দুবাইয়ে চিঠি পাঠানো হতে পারে। তবে, বুধবারই চিঠি পাঠানোর সম্ভাবনা বেশি। প্রত্যর্পণের প্রস্তাবে বৈষম্যবিরোধী মামলা ও ট্রাইব্যুনালের পরোয়ানা যুক্ত করার বিষয়টিতে পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দাবি করেছেন যে, বৈষম্যবিরোধী মামলায় ঢালাও আসামি করার প্রবণতা আলোচনা শুরু হয়েছে। যদি নথিটি পাঠানো হয়, তবে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনে মামলাগুলো করা হয়েছে বলে দুবাই বিবেচনায় নিতে পারে। একই সঙ্গে ট্রাইব্যুনালে অতীতের (শেখ হাসিনার আমলের) রায় নিয়ে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাগুলোতে অসন্তোষও রয়েছে। এর ফলস্বরূপ, ট্রাইব্যুনালের পরোয়ানাগুলোও দেওয়া হবে না। ওই কর্মকর্তা আরও জানিয়েছেন, সরকার নিশ্চিত করতে চায় যে, বেনজীরের ফেরার পথে যেকোন তথ্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না হয়। এজন্য, পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) শাখার একটি টিম দুদকের সাথে নথি প্রস্তুতিতে সহযোগিতা করছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী জানিয়েছেন, ৩০ দিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ (এক্সাডেশন) অনুরোধ পাঠাতে হবে এবং এটি দ্রুত পাঠানো হবে। বাংলাদেশের সঙ্গে প্রত্যর্পণ চুক্তি নাই, এ বিষয়ে সচিব মন্তব্য করেন যে, চুক্তি না থাকলেও তারা পারস্পরিক আইনি সহায়তার (মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট-এমএলএআর) মাধ্যমে কার্যক্রম এগিয়ে নেবেন। এই প্রক্রিয়াটি দুই দেশের সরকার এবং তদন্ত সংস্থাগুলো একে অপরের কাছে তথ্য, প্রমাণ এবং পলাতক আসামির প্রত্যর্পণের জন্য আইনি সহায়তা প্রদান করে। পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, বেনজীরকে ফেরাতে পুলিশের বেশি কিছু কাজ নেই। এনসিবি শাখা থেকে রেড নোটিস জারি করার পরেই তাদের কাজ শেষ হয়ে যাবে। এখন, দুদক নথিপত্র প্রস্তুত করবে এবং বাকিটা স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেখবে।
৬ মামলার নথি প্রস্তুত করছে দুদক : বেনজীরের বিরুদ্ধে পাসপোর্ট জালিয়াতি ও দুর্নীতির মামলাগুলোর তথ্যপ্রমাণসংবলিত নথি চূড়ান্ত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কূটনৈতিক চ্যানেলে পাঠানোর জন্য উদ্যোগ নিয়েছে দুদক। দুদক সূত্রে জানা গেছে, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, মানি লন্ডারিং, পাসপোর্ট জালিয়াতি সহ মোট ৬টি মামলা রয়েছে। এসব মামলার নথি এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত একত্র করে দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকতারুল ইসলাম জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে বেনজীর আহমেদকে ফেরানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শিগগিরই আরব আমিরাত সরকারকে অনুরোধ চিঠি পাঠানো হবে, যা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কূটনৈতিক চ্যানেলে পাঠানো হবে।
ট্রাইব্যুনালে ১০ মামলায় তদন্ত চলছে : গতকাল নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন যে, দুবাইয়ে গ্রেপ্তার সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ শুধু শাপলা চত্বরের মাস্টারমাইন্ড নয়, বরং তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ১০টির মতো মামলায় তদন্ত চলছে। তার একটি দম্ভোক্তি এবং বডি ল্যাঙ্গুয়েজ সব মিলিয়ে তখন বাংলাদেশে আমাদের শেখ হাসিনার চেয়েও অধিক পরিচিত ছিলেন। এই পরিচিতির কারণ ছিল যে, তিনি হেন কোনো দুষ্কর্ম নেই যা তার কর্মজীবনে করেননি।
র্যাবের তখনকার গুমের মামলার বিচার এখনও চলমান। শাপলা চত্বরের মামলায় তিনি অন্যতম কুশীলব ছিলেন। কক্সবাজারের কাউন্সিলর একরাম হত্যাকাণ্ডের সাথে তার সরাসরি যোগাযোগ ছিল। যখন আইজিপি ছিলেন, তখন অসংখ্য অপরাধে জড়িত ছিলেন। ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় বিতর্কিত নির্বাচনের সময় তাঁর ভূমিকা ছিল বিতর্কিত। বাংলাদেশে আনা হলে, সেই ট্রাইব্যুনালের মামলাতেও তাঁকে হাজির করা হবে। কার্যক্রম চলমান বিষয়গুলোতে তাঁর জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন