প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
জবের আলী তিস্তাপারে বসবাস করেন। ২০২০ সালে কুড়িগ্রামের রাজারহাটের বুড়িরহাট ক্রসবাঁধের একটি অংশ ভেঙে যাওয়ার পর খিতাবখা গ্রামের জবের আলীর ভিটে তিস্তার গর্ভে চলে যায়। এরপর থেকে ৮৫ বছর বয়সী এই বৃদ্ধ বাঁধের ধারে মাথা গুঁজে রয়েছেন।
সপ্তাহ দুয়েক আগে হঠাৎ করে তিস্তা ফুঁসে ওঠার ফলে ক্রসবাঁধের কিছু অংশ বিলীন হয়ে যায়। এরপর আতঙ্ক আবারও জবের আলীর চোখে-মুখে দেখা দেয়। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখার পর, এই প্রবীণ ব্যক্তি ভেবেছিলেন যে এবার খনন এবং পাড় বেঁধে তিস্তাকে নিয়ন্ত্রণে আনা হবে; যাতে তারা ভিটেমাটি সুরক্ষিত করে চাষবাস করে জীবনধারণ করতে পারেন।
কিন্তু পোড়খাওয়া এই বৃদ্ধ প্রতিশ্রুতি এবং আশ্বাসে আর ভরসা করতে পারছেন না। তিনি বলেন, "এই তিস্তা হামার দুঃখ। যখন ব্যারাজের গেট ছাড়ি দেয়, নদী পাক দেয়, ডুকরি ওঠে। হামার বুক কাঁপে। চপুর আইত নিন্দ হয় না (সারা রাত ঘুম ধরে না)। শুনি বোলে তিস্তা বাইন্ধবে। সগাই (সবাই) আশা দেয়, কাম হয় না।"
৩০ বছর আগে ভিটে হারিয়ে রাজারহাটের তিস্তাপারের রামহরি গ্রামের আব্দুল মজিদ বাঁধের ধারে বসতি গড়েছেন। তবে তিস্তার চোখ রাঙানিতে তার বসতিও বিপন্ন। ফসলি জমি তিস্তার গর্ভে চলে গেছে। মহাপরিকল্পনা তাদের জমি ফিরিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিল, কিন্তু তিনি ভরসা পাচ্ছেন না।
হতাশা নিয়ে আব্দুল মজিদ বলেন, "৩০ বছর ধরি শুনি নদী খুঁড়বে, পাড় বাইন্ধবে। সরকার আইসে, সরকার যায়—হামার আশা পূরণ হয় না।"
নির্বাচনের আগে তিস্তার পাড়ে ‘জাগো বাহে তিস্তা বাঁচাই’ নামে একটি বড় আন্দোলনে তিস্তাপারের মানুষ অংশগ্রহণ করেছিলেন। মশাল মিছিল, গানের সুরে জেগে উঠেছিল তিস্তাপার। তবে সেই আন্দোলনের সফলতা নিয়ে মানুষের সংশয় কাটেনি। খিতাবখা গ্রামের গৃহবধূ মমতা বেগম তাই আক্ষেপ করে বলেন, "ভোটের আগে তিস্তা বাঁচাই। ভোট বের হইলে তিস্তা মরে।"
রাজারহাটের গতিয়াশাম, রামহরি, খিঁতাবখা, গাবুরহেলান, ডাংরা, রতি, উলিপুরের ঠুটাপাইকর, হোকডাঙা, চিলমারীর চর বজরা- এসব গ্রামে ভাঙনের আতঙ্ক বিরাজমান। এসব গ্রামের অনেকগুলো শুধু নামেই টিকে আছে, বেশিরভাগই তিস্তার গর্ভে চলে গেছে। বাকি অংশের মানুষও সব সময় ভাঙন আতঙ্কে থাকে, ঘর-বাড়ি হারানোর ভয়ে।
কয়েকদিন আগে বুড়িরহাটের ক্রসবাঁধের ৪০ মিটার অংশ ভেঙে যায়। এর ফলে ভাটির দিকে ৮-১০টি গ্রামে ভাঙন আতঙ্ক দেখা দেয়। পানি উন্নয়ন বোর্ড জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙা অংশ মেরামতের কাজ করছে। নাজিমখান ইউনিয়নের সোমনারায়ণ পলাশপুর গ্রামের বিস্তীর্ণ ধানি জমি বিলীন হয়ে যাচ্ছে। প্রবল স্রোতে নদীর তীর ধরে প্রবাহিত হচ্ছে। হাসারপাড় এলাকার উজান ও ভাটিতে প্রতিনিয়ত ভাঙন হচ্ছে।
তিস্তাপারের মানুষ বলছেন, দীর্ঘদিন খননকাজ না করায় নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। ফলে মে মাস থেকে অধিকাংশ সময় তিস্তার পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি থাকে। এতে কুড়িগ্রামের অংশের ২০ কিলোমিটার এলাকা ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জিও ব্যাগ দিয়ে ভাঙন ঠেকানোর প্রাণান্ত চেষ্টায় ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। কিন্তু কোথাও কোথাও জিও ব্যাগ, ক্রসবাঁধে ধস নামায় আতঙ্ক কাটেনি।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানান, ১৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা করা হচ্ছে। বর্তমানে তিস্তার আরো ৫-৬টি পয়েন্ট ভাঙনপ্রবণ। অর্থ বরাদ্দ সাপেক্ষে সেসব পয়েন্টে ভাঙনরোধের চেষ্টা করা হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন