প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য চিকিৎসকদের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করেছে স্বাস্থ্যবিভাগ। এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং করপোরেট হাসপাতালের চিকিৎসকরা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং মৃত্যুহার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার জন্য ঢাকা ও ঢাকার বাইরের সব বিভাগ ও ডেঙ্গু প্রবণ জেলার চিকিৎসকদের এই প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। এর মূল লক্ষ্য হলো দেশের প্রতিটি চিকিৎসককে জাতীয় প্রোটোকল অনুযায়ী ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত, ট্রায়াজ (রোগীর গুরুত্ব বিবেচনায় চিকিৎসার অগ্রাধিকার নির্ধারণ) এবং সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার উপযুক্ত নির্দেশনা দেওয়া।
ডেঙ্গুর ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট বিষয়ক জাতীয় প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের (ট্রেনিং অব ট্রেইনার্স-টিওটি) দ্বিতীয় ব্যাচ ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিন সম্পন্ন করেছে। দুই দফায় রাজধানীতে প্রায় ১৩৫ জন চিকিৎসককে এই প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে এ প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে সহযোগিতা করছে বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিন, রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ইউনিসেফ বাংলাদেশ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিন (বিএসএম)-এর আহবায়ক কমিটির সদস্য ডা. মো. ইলিয়াস ভূঁইয়া বাসস’কে জানান, রাজধানীতে দুই দিন ধরে ১৩৫ জন চিকিৎসককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম দিনে ৬৮ জন সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক এবং দ্বিতীয় দিনে ৬৭ জন বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।
খুব শিগগিরই ৮ বিভাগে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য চিকিৎসকদের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করা হবে। তিনি বলেন, আমরা ৮ বিভাগের প্রতিটি থেকে ৭০ জন করে প্রশিক্ষণ দেব এবং শিগগিরই এই কার্যক্রম শুরু হবে।
এছাড়া, ডেঙ্গু প্রবণ জেলাগুলোতেও চিকিৎসকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। তিনি জানান, ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি এমন ৮ থেকে ১০টি জেলায় ৬০ থেকে ৭০ জন চিকিৎসককে প্রথম ধাপে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পরে পর্যায়ক্রমে বাকী ডেঙ্গুপ্রবণ জেলাগুলোয় এই প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
গত ৭ জুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বাংলাদেশে ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা বিষয়ক জাতীয় প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।
সেই অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ডেঙ্গু এখন দেশের জন্য একটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা হাসপাতালের একার দায়িত্ব নয়; দেশের প্রতিটি নাগরিককে এতে অংশ নিতে হবে।’
বিগত তিন বছর ডেঙ্গু আক্রন্তের হার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৩ সালে ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং ১ হাজার ৭০৫ জন মারা যান। ২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন, মৃত্যু ৫৭৫ জন। আর ২০২৫ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন এবং মারা যান ৪১৩ জন।
অন্যদিকে, ডেঙ্গু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও যথাসময়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে রোগনিয়ন্ত্রণ শাখা (সিডিসি), রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর), এমআইএস ও হাসপাতাল শাখার পরিচালকদের নিয়ে একটি সেল গঠন করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর মার্চ মাস থেকেই ডেঙ্গু প্রতিরোধের ওপর জোর দিয়েছে। প্রতিষ্ঠান বা বাড়ি বাড়ি পরিদর্শন করে এডিস মশার লার্ভা শনাক্ত করার জন্য সরকার ভ্রাম্যমাণ আদালত গঠন করেছে। উপজেলা হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু কর্নার স্থাপন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। অধিক রোগীর চাপ সামাল দিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মাঠে একটি ‘ফিল্ড হসপিটাল’ তৈরি করা হয়েছে। প্রয়োজনে এ ধরনের হাসপাতাল আরও করা হবে বলেও স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বাসস’কে বলেন, বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে ১০ শতাংশ শয্যায় বিনা মূল্যে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দিতে এবং রোগনির্ণয় কেন্দ্রগুলোকে ডেঙ্গু ও ডেঙ্গু রোগ সংক্রান্ত পরীক্ষায় ৮০ শতাংশ ছাড় দিতে বলা হয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ মেডিসিন সোসাইটির সহায়তায় ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসার সমন্বিত গাইডলাইন হালনাগাদ করা হয়েছে। সেই গাইডলাইন ধরে সারা দেশের চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ প্রদান শুরু হয়েছে। এই প্রশিক্ষণে সহায়তা করছে ইউনিসেফ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় (২২ জুন পর্যন্ত), এ বছর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ ঢাকা বিভাগে ১ হাজার ৭৪৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বরিশাল বিভাগে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ৩৪৩, চট্টগ্রাম বিভাগে ৯৮৬, খুলনা বিভাগে ৫৫৮, রাজশাহী বিভাগে ১৭৯, ময়মনসিংহ বিভাগে ১৪০, রংপুর বিভাগে ৩০ জন এবং সিলেট বিভাগে ৩০। ২০২৬ সালে ডেঙ্গুতে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে চলতি জুন মাসেই মৃত্যু হয়েছে ৫ জনের।
এছাড়াও এ বছরের জানুয়ারিতে ১ হাজার ৮১ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৪০৯ জন, মার্চে ৩৫৩ জন, এপ্রিলে ৬৪০ জন, মে মাসে ৭১৪ জন এবং জুনে (২২ জুন পর্যন্ত) ১ হাজার ৮৪২ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন