প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি অবধি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল একত্রে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা শুরু করে। ইরানও তাড়াতাড়ি অভ্যন্তরীণ স্তরে পাল্টা প্রতিরোধ জোরদার করতে থাকে। ফলস্বরূপ, গোটা মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ওঠে অগ্নিগর্ভ।
যুদ্ধের সময় ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংসের বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার গুরুতর দাবি করেছেন। তবে যুদ্ধের প্রথম কয়েক সপ্তাহের পর ইরানের সামরিক সক্ষমতা যে গতিতে পুনর্গঠিত হয়েছে, তাতে হতবাক হয়ে পড়েছেন ইসরায়েলের সামরিক এবং গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। বিশেষ করে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার দ্রুত পুনর্গঠন ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা এবং গোয়েন্দা মহলে ব্যাপক উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম জেরুজালেম পোস্টের উল্লেখ করা এক প্রতিবেদনে দেয়া তথ্যমতে, যুদ্ধের মূল পর্ব শেষ হওয়ার পর ইরান যেভাবে তার সামরিক বাহিনী এবং আক্রমণাত্মক সক্ষমতা পুনর্গঠন করতে সক্ষম হয়েছে, তা ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেস (আইডিএফ)-এর প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি দ্রুত গতিতে পুনর্গঠিত হওয়ার কারণে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা অবাক হয়েছেন।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জুনের শুরুতে ইসরায়েল লক্ষ্য করে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর মাধ্যমে তাদের আক্রমণাত্মক কার্যক্রমকে তীব্র করে। জুলাইয়ের শুরুতে এ অভিযান আরও বৃদ্ধি পায় এবং ইরান অঞ্চলটির কয়েকটি আরব দেশে নতুন করে হামলা চালায় বলেও অভিযোগ ওঠে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের উপর হস্তক্ষেপের অভিযোগও তেহরানের বিরুদ্ধে আনা হয়। এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হিসেবে পরিচিত, যেখানে ইরানের নিয়ন্ত্রণ এবং প্রভাব নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমটির দাবি, ইরান কীভাবে এত দ্রুত তার আক্রমণাত্মক সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করছে, তা নিয়ে দেশটির শীর্ষ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। কর্মকর্তাদের ধারণা, ইরান তাদের অস্ত্র উৎপাদন এবং সামরিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের জন্য এমন কিছু কৌশল বের করেছে, যা আগে ইসরায়েলি মূল্যায়নে পুরোপুরি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
প্রতিবেদনে আরও বিশ্লেষণ করা হয়েছে যে, ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর সময় দেশটির হাতে আনুমানিক ১ হাজার ৩০০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছিল। তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর সময় সেটি বেড়ে প্রায় ২ হাজার ৫০০-তে পৌঁছেছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমটি আরও দাবি করেছে, কিছু জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, নতুন অস্ত্র উৎপাদনের গতি প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি হয়েছে, এবং এ বক্তব্যের সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে।
শুধু ইসরায়েল নয়, এমন উদ্বেগ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা মহলে। গত মে মাসে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেয়া বক্তব্যে চার জন মার্কিন কর্মকর্তা বলেছিলেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের গতি পূর্বাভাসকৃত সময়সীমাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে বলে তারা মনে করছেন।
এক মার্কিন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, সেই সময়ে গোয়েন্দা মূল্যায়নে ধারণা করা হয়েছিল যে, ইরান প্রায় ছয় মাসের মধ্যে, অর্থাৎ নভেম্বরের মধ্যে—তার ড্রোন হামলার সক্ষমতা পুরোপুরি পুনর্গঠন করতে সক্ষম হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে তা দ্রুত হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে চীনের সহায়তা বর্তমানেও অব্যাহত রয়েছে বলেও দাবি করেছেন দুইটি সূত্র। চীনের দ্বারা ব্যবহৃত বিভিন্ন উপাদান ইরানে সরবরাহ করা হচ্ছে, এমন খবর পাওয়া গেছে। তবে ইরানের বন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ এবং চাপ সেই সরবরাহে কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এখন, ইরানের সামরিক সক্ষমতা দ্রুত পুনর্গঠনের সাথে সঙ্গে যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ঢালাও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য, দীর্ঘ-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতের বিপরীতে অত্যন্ত কমে আসার বিষয়টি প্রকাশ করছে।
ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্সের সূত্র দাবি করেছে যে, চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে প্রায় সব এটিএসএমএস এবং প্রেসিশন স্ট্রাইক মিসাইল ব্যবহার করেছে। এর ফলে, ভবিষ্যতে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে তুলনামূলক ঝুঁকি পূর্ণ পদ্ধতির ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘপাল্লার নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্রের রیزার পরিমাণ হ্রাস পেলে লক্ষ্যবস্তুতে হামলার জন্য পাইলট পরিচালিত যুদ্ধবিমান এবং অন্যান্য বিমান হামলা বৃদ্ধি করার প্রয়োজন হতে পারে।
এটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে। তিনি যদি ইরানের বিরুদ্ধে আবারও বড় আকারের হামলা শুরুর সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে পূর্বের তুলানায় সীমিত ক্ষেপণাস্ত্র মজুতের বিষয়টি মার্কিন সামরিক পরিকল্পনায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
ইরানের সামরিক সক্ষমতা কতটা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, এই বিষয়ে উদ্বেগের মাঝেও আইডিএফ দাবি করেছে, যুদ্ধের সময় তেহরানের সামরিক সক্ষমতার বিস্তৃত পরিসরে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করা হয়েছিল।
জেরুজালেম পোস্টের প্রশ্নের জবাবে আইডিএফ জানিয়েছে যে, যুদ্ধের সময় ইরানের নানা সামরিক সক্ষমতার ওপর ‘ব্যাপক ক্ষতি’ সাধন হয়েছে। ফলে, যুদ্ধের আগে যে পরিমাণ এবং যে গতিতে এসব সক্ষমতা পুনর্গঠন করা সম্ভব ছিল, তা তখন আর সে মাত্রায় করা সম্ভব নয় বলে দাবি করেছে ইসরায়েলি বাহিনী।
আইডিএফ আরও জানিয়েছে, তারা ইরান কীভাবে তাদের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করার চেষ্টা করছে, তা ‘ঘনিষ্ঠভাবে এবং ধারাবাহিকভাবে’ পর্যবেক্ষণ করছে। এবং সেই অনুযায়ী, তাদের পরিস্থিতি মূল্যায়ন নিয়মিতভাবে হালনাগাদ করা হচ্ছে।
তবে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ইরানের পুনর্গঠনের সুনির্দিষ্ট গতি কিংবা সক্ষমতার মাত্রার বিষয়ে প্রকাশ করতে অস্বীকার করেছে। কারণ, এ ধরনের স্পষ্ট তথ্য প্রকাশিত হলে আইডিএফের গোয়েন্দা উৎস ও পদ্ধতির গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফাঁস হয়ে যেতে পারে।
আইডিএফের ভাষ্য, তাদের কাছে থাকা নতুন তথ্য ও বর্তমান পরিস্থিতির ভিত্তিতে সদা-সর্বদা তাদের মূল্যায়ন পরিবর্তন করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির জন্য তারা প্রস্তুত রয়েছে।
তবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত পুনর্গঠিত হওয়ার খবর যুদ্ধ-পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন করে জটিল করে তুলেছে। বিশেষ করে, ইরান যদি দ্রুত ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ও সামরিক অবকাঠামো পুনর্গঠন করতে সক্ষম হয়, তবে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতের নতুন সামরিক অভিযান আগের তুলনায় আরও বড় ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার মাঝে পড়তে পারে।
সূত্র: দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন