প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ভারতীয় রেল কর্তৃপক্ষ নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি স্বয়ংক্রিয় ট্রেন সুরক্ষা ব্যবস্থা ‘কবচ ৪.০’ এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৫৬৯ রুট কিলোমিটারে কার্যকর করেছে। পাশাপাশি আরো ২১ হাজার ৮৫৮ রুট কিলোমিটারে এই প্রযুক্তি স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে।
লোকসভায় সংসদ সদস্য ডি. রবি কুমারের এক প্রশ্নের জবাবে ভারতীয় রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব এই তথ্য তুলে ধরেন। রেলমন্ত্রী উক্ত তথ্য জানিয়ে বলেন যে, বর্তমানে যেখানে ট্র্যাকসাইডে ‘কবচ’ ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে, তার মধ্যে ১২ শতাংশ রুটে সর্বশেষ ‘কবচ ৪.০’ সংস্করণ কার্যকর হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রিসার্চ ডিজাইনস অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অর্গানাইজেশন (আরডিএসও) এই নতুন সংস্করণের অনুমোদন দেয়। নতুন এই সংস্করণ ট্রেনের অবস্থান আরো নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রেল মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২০ জুলাই পর্যন্ত চালু হওয়া ২ হাজার ৫৬৯ রুট কিলোমিটারের মধ্যে দিল্লি-মুম্বাই করিডোরে ১ হাজার ৪২৩ কিলোমিটার এবং দিল্লি-হাওড়া করিডোরে ১ হাজার ১৪৬ কিলোমিটার রুটে ‘কবচ ৪.০’ কার্যকর করা হয়েছে। এর পাশাপাশি গোল্ডেন কোয়াড্রিল্যাটারাল, গোল্ডেন ডায়াগোনাল ও হাই-ডেনসিটি নেটওয়ার্কে মোট ২১ হাজার ৮৫৮ রুট কিলোমিটারে ‘কবচ’ প্রযুক্তি স্থাপনের কার্যক্রম চলেছে। সাউদার্ন রেলওয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রুটেও এই প্রযুক্তি বসানোর কাজ দ্রুত এগিয়ে হচ্ছে।
এ পর্যন্ত এই প্রকল্পের জন্য ১১ হাজার ২৫৩ কিলোমিটার অপটিক্যাল ফাইবার কেবল, ১ হাজার ৬৬৮টি টেলিকম টাওয়ার এবং ৯৮৮টি স্টেশনে ডেটা সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি ৭ হাজার ৭২৬ রুট কিলোমিটারে ট্র্যাকসাইড সরঞ্জাম বসানো হয়েছে। বর্তমানে ৬ হাজার ১৫৩টি লোকোমোটিভে ‘কবচ’ প্রযুক্তি চালু রয়েছে। আরো ৭ হাজার ৩২৭টি লোকোমোটিভ এবং ১ হাজার ২০০টি ইএমইউ ও মেমু ট্রেনে এই প্রযুক্তি স্থাপনের কাজ চলছে।
রেল মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রযুক্তি স্থাপনের পাশাপাশি জনবল প্রশিক্ষণও জোরদার করা হয়েছে। ইন্ডিয়ান রেলওয়েজ ইনস্টিটিউট অব সিগন্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশনসের সহযোগিতায় প্রায় ৫৭ হাজার লোকো পাইলট ও সহকারী লোকো পাইলটসহ ৯৪ হাজারের বেশি টেকনিশিয়ান, অপারেটর ও প্রকৌশলীকে ‘কবচ’ পরিচালনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ‘কবচ’ প্রকল্পে ৩ হাজার ৮৭৪ কোটি রুপি ব্যয় হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য আরো ২ হাজার ৬৬৬ কোটি রুপি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রকল্পের অগ্রগতির ভিত্তিতে এই অর্থ ছাড় করা হচ্ছে। বর্তমানে ট্র্যাকসাইড অবকাঠামো স্থাপনে প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ৫০ লাখ রুপি এবং প্রতিটি লোকোমোটিভে ‘কবচ’ বসাতে প্রায় ৮০ লাখ রুপি খরচ হচ্ছে। নতুন বরাদ্দের ফলে প্রকল্পের কাজ আরো দ্রুত এগোবে বলে আশা করছে রেল মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয় জানাচ্ছে, ‘কবচ’ ভারতীয় রেল নিরাপত্তা আধুনিকায়নের একটি বিশাল উদ্যোগ হিসেবে কাজ করছে। রেল নিরাপত্তায় ব্যয়ের পরিমাণ ২০১৩-১৪ অর্থবছরের ৩৯ হাজার ২০০ কোটি রুপি থেকে বেড়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১ লাখ ২০ হাজার ৩৮৯ কোটি রুপি পৌঁছেছে।
এ পর্যন্ত ৬ হাজার ৬৭১টি স্টেশনে ইলেকট্রনিক ইন্টারলকিং ব্যবস্থা চালু হয়েছে। একই সংখ্যক স্টেশনে সম্পূর্ণ ট্র্যাক সার্কিটিং এবং ১০ হাজার ৩৯৫টি লেভেল ক্রসিং গেটে ইন্টারলকিং সম্পন্ন করা হয়েছে। এছাড়া উন্নতমানের রেললাইন ও দীর্ঘ রেল প্যানেলের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
রেল নিরাপত্তা জোরদারে কুয়াশায় ট্রেন চলাচলের নিরাপত্তা যন্ত্রের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। ২০১৪ সালের মার্চে যেখানে এ ধরনের যন্ত্র ছিল মাত্র ৯০টি, ২০২৬ সালের মার্চে তা বেড়ে ৩১ হাজার ৬৯৩টিতে পৌঁছেছে। একই সময়ে ইলেকট্রনিক ইন্টারলকিং সুবিধাসম্পন্ন স্টেশনের সংখ্যা ৮৩৭ থেকে বেড়ে ৩ হাজার ৬৯১টিতে উন্নীত হয়েছে।
রেল মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতির ফলে দুর্ঘটনার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে রেললাইনের ওয়েল্ডিং ত্রুটির ঘটনা ছিল ৩ হাজার ৬৯৯টি, যা ২০২৫-২৬ সালে কমে ২৭২টিতে নেমে এসেছে। একই সময়ে রেললাইন ভাঙার ঘটনা ২ হাজার ৫৪৮টি থেকে কমে ২০৮টিতে দাঁড়িয়েছে। দুই ক্ষেত্রেই ৯০ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে।
গুরুতর ট্রেন দুর্ঘটনার সংখ্যাও ২০১৪-১৫ সালের ১৩৫টি থেকে কমে ২০২৫-২৬ সালে ১৬টিতে নেমে এসেছে। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত মাত্র দুটি গুরুতর ট্রেন দুর্ঘটনার খবর পাওয়া গেছে।
রেল মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আলট্রাসনিক পরীক্ষার মাধ্যমে রেললাইন পরীক্ষা, নিয়মিত ট্র্যাক পর্যবেক্ষণ, ট্রেনের প্রতিরোধমূলক রক্ষণাবেক্ষণ, পুরোনো আইসিএফ কোচের পরিবর্তে এলএইচবি কোচ চালু এবং সব অনিরাপদ ব্রডগেজ লেভেল ক্রসিং তুলে দেওয়ার মতো পদক্ষেপ দুর্ঘটনা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এলএইচবি কোচের উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০০৪-০৫ থেকে ২০১৩-১৪ সময়ে ২ হাজার ৩৩৭টি কোচ তৈরি হলেও, ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৫-২৬ সময়ে এই সংখ্যা বেড়ে ৪৯ হাজার ৩৬৬টিতে পৌঁছেছে।
রেল মন্ত্রণালয়ের মতে, দিল্লি-মুম্বাই ও দিল্লি-হাওড়া করিডোরে ‘কবচ’সহ আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার দুর্ঘটনা কমাতে ইতিবাচক ফল দিচ্ছে। তবে পরিকল্পনা অনুযায়ী দেশের পুরো রেল নেটওয়ার্কে এই প্রযুক্তি চালু করার জন্য এখনো অনেক কাজ বাকি রয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন