প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ইরান যুদ্ধ বর্তমানে তৃতীয় ছয় মাসে প্রবেশ করেছে। অর্থনীতির ওপর যে চাপ পড়েছে, তাও লক্ষ্যণীয়। তবে ইরান আরও কতদিন এ যুদ্ধ চালিয়ে যাবে এবং উত্তরণ কবে ঘটবে, সে সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা যায়নি দেশটির নীতিনির্ধারকদের কাছ থেকে।
যুদ্ধের কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই নয়। তেহরান হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সামরিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক মূল্য বৃদ্ধি করতে চাইছে, যাতে শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন কিছু দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়।
যাই হোক, সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন হলো- ইরান আর কতদিন এই যুদ্ধ চালাতে সক্ষম হবে?
ইরানের সামরিক শক্তি যুদ্ধটাকে দীর্ঘায়িত করতে সক্ষম হবে কিনা? ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্প এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর বেশ কয়েকটি লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার। কিন্তু এ সংক্রান্ত ক্ষতিসাধনের মাত্রা সম্পর্কে নিরপেক্ষ তথ্য এখনও হয়নি প্রকাশ। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘চ্যাথাম হাউজ’ তাদের সর্বশেষ পর্যালোচনায় জানিয়েছে, ইরানের কাছে ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা কত তা নির্ভরযোগ্যভাবে বলা সম্ভব নয়।
সময়ের সঙ্গে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের মাত্রা কমে এসেছে, তবে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা শুধু ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যার উপর নির্ভর করে না। ড্রোন এবং ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন তুলনামূলকভাবে অনেক সহজ এবং দ্রুত সম্পন্ন করতে সক্ষম। এদিকে, যুদ্ধে নিহত কমান্ডারদের বিকল্প হিসেবে নতুন কর্মকর্তাদের নিয়োগ করা হয়েছে এবং সামরিক কমান্ড কাঠামো অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে, জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক অধ্যাপক মোহাম্মদ গায়েদি বলেন, ইরান সম্ভবত দীর্ঘদিন ধরে উৎক্ষেপণ কার্যক্রম বজায় রাখতে সক্ষম হবে, যদিও তার মাত্রা কমে যেতে পারে। তারা এখনো হরমুজ প্রণালিতেও বিঘ্ন ঘটানোর সক্ষমতা রাখে।
প্রফেসর গায়েদি আরও বলেন, তেলের দামে যুদ্ধের প্রভাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তেহরানে কিছু আশার সৃষ্টি হয়েছে। তারা মনে করছে, ওয়াশিংটনকে নিজেদের কিছু শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করা যাবে।
তেহরানের লক্ষ্য যে যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিকভাবে পরাজিত করা নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী এবং ব্যয়সাপেক্ষ একটি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া, তাই মনে হচ্ছে। এটি একটি চাপ তৈরির পন্থারূপে কাজ করতে পারে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এমন কোনো ইঙ্গিত নেই, যা দেখায় যে শুধুমাত্র সামরিক সীমাবদ্ধতার কারণে ইরান যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য হবে।
কতদিন টিকবে ইরানের অর্থনীতি?
যুদ্ধের শুরু হওয়ার পূর্বে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং নিজেদের মুদ্রা 'রিয়াল'-এর মূল্য হ্রাস পাওয়ার মতো একাধিক সমস্যায় ভুগছিল ইরানের অর্থনীতি।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ইরানের অর্থনীতি প্রায় ২.৭ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে এবং এই অর্থবছরের শেষের কিছু সপ্তাহের মধ্যেই যুদ্ধের প্রভাব দেখা গেছে। এই যুদ্ধ পরিস্থিতি নতুনভাবে নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, সে দেশে বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার ৬২ শতাংশে পৌঁছেছে।
ইরানের শ্রম উপমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য মতে, কর্মসংস্থানের দিক থেকে ১০ লাখেরও বেশি পদের ওপর যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে। এছাড়া প্রায় ২০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বেকার হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) পূর্বাভাস দিয়েছে যে, ২০২৬ সালে ইরানের অর্থনীতি প্রায় ৫.৪ শতাংশ সংকুচিত হবে এবং মূল্যস্ফীতি ৬৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
তেহরানে যুদ্ধের সময়সীমা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় দরকষাকষির দায়িত্বে থাকা দলের মূখ্য সদস্য মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ আগে থেকেই সতর্ক করেছিলেন যে ইরান যেন কোনোভাবেই ‘দীর্ঘস্থায়ী ও ক্ষয় সৃষ্টিকারী সংঘাতের’ ফাঁদে না পড়ে। যাঁরা এসব আলাপের বিরুদ্ধে, তাদেরও সমালোচনা করেছেন তিনি।
তবে এই মতপার্থক্যকে শুধু ‘যুদ্ধের সমর্থক’ ও ‘শান্তির সমর্থক’ এই দুই শিবিরে করা যায় না। এদিকে, মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ ঘোষণা করেছেন যে, ইরানের অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো চুক্তি তিনি মেনে নেবেন না।
ইরানের জনগণ কী ভাবছে?
যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার প্রতিটি বিষয়ে ইরানের নাগরিকদের মতামত নিয়ে নিরপেক্ষ ও নির্ভরযোগ্য জনমত জরিপ নেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সারা সমাজের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে না। তবে একটি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকারে ইরান-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং ‘জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্স’-এর ভিজিটিং ফেলো হামিদরেজা আজিজি জানিয়েছেন, এ ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য তাদের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিই শেষ পর্যন্ত ‘সবচেয়ে বিপজ্জনক ফ্রন্ট’ হয়ে উঠতে পারে।
যুদ্ধ থেকে বেরোনোর কৌশল
দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে ইরানের আঞ্চলিক পর্যায়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তেহরান উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সাথে- বিশেষ করে সৌদি আরবে সম্পর্ক উন্নত করার চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু এসব দেশে অবস্থিত সামরিক ঘাঁটি, অবকাঠামো ও নৌ-চলাচলের পথে চলমান হামলা সেই প্রচেষ্টাকে নষ্ট করতে পারে।
ইরানের কাছে যুদ্ধের একটি গ্রহণযোগ্য সমাপ্তি ঘটাতে পারে এমন চুক্তির মানে কী হতে পারে এবং তাতে কীভাবে পৌঁছান সম্ভব, এ সম্পর্কে এখনও সামান্য তথ্যই বের হয়েছে।
তবে তেহরান পৃথিবীজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত করতে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের বড় মাশুল দিতে বাধ্য করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে সংঘাতপূর্ণ অবস্থায় টিকে থাকার উপায় সম্পর্কে অনিশ্চয়তা এখনো রয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন