প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চাপ অগ্রাহ্য করে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বন্ধের জন্য এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র দুই মাসের মধ্যে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছেন। মিলিব্যান্ডকে সাম্প্রতিক দশকগুলোর মধ্যে অন্যতম দৃঢ়চেতা ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, কারণ তিনি যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ব্রিটিশ রক্ষণশীল মহলের চাপের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থানে অনড় রয়েছেন।
মিলিব্যান্ড মঙ্গলবার ইসরাইলের অবৈধ বসতিগুলো থেকে পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিতে পারেন। ব্রিটিশ সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) ২০২৪ সালের জুলাইয়ের পরামর্শমূলক রায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনতে নেওয়া হচ্ছে। আইসিজের ওই মতামতে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের দখলদারিত্বকে অবৈধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পক্ষ থেকে মিলিব্যান্ডের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিক্রিয়া এসেছে। ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগ তুলেছেন। উল্লেখযোগ্য যে, মিলিব্যান্ড নিজেও ইহুদি। এর আগে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ব্রিটেনকে ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ব্রিটেন’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সা'রও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ব্রিটেন যদি ইসরাইলের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়, তাহলে ইসরাইলও ব্রিটেনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।
নেতানিয়াহুর ছেলে ইয়ার নেতানিয়াহু ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়ে ব্রিটেনের বিরোধিতা করে আর্জেন্টিনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, আর্জেন্টিনা ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জে হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেনকে সমর্থন নাও করতে পারে। ব্রিটিশ রক্ষণশীল বিরোধী দল ও দেশটির ডানপন্থী সংবাদমাধ্যমের একটি অংশও মিলিব্যান্ডের পরিকল্পনার তীব্র সমালোচনা করছে। ছায়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী টম টুগেনহাট ইসরাইলের অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে দাবি করেছেন, বসতি নিষেধাজ্ঞার কারণে ব্রিটেনের জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এদিকে ‘কনজারভেটিভ ফ্রেন্ডস অব ইসরাইল’ মিলিব্যান্ডের পরিকল্পনাকে নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য এবং ইসরাইলকে এককভাবে নিশানা করার পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
অবস্থানে অনড় মিলিব্যান্ড
এত চাপের মধ্যেও ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজের অবস্থান থেকে সরে আসছেন না। গত মঙ্গলবার পার্লামেন্টে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে প্রথম বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন, ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের জন্য দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান ধ্বংস হতে দেওয়া হবে না। গাজা পরিস্থিতি নিয়ে মিলিব্যান্ড আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর ও আবেগপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করেছেন। সম্প্রতি গাজায় থাকা মানুষের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি সেখানকার পরিস্থিতিকে ‘ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ সরকারকে এখন আরো দৃঢ়ভাবে এবং আরো দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
ব্রিটিশ সরকারের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর দাবি, বসতি স্থাপনের বিরুদ্ধে প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলোর অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি মিলিব্যান্ড নিজেই। তার পূর্ববর্তী দুই লেবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি ও ইয়েভেট কুপার গাজার পরিস্থিতি নিয়ে কঠিন ব্রিফিং পেলেও মিলিব্যান্ডের মতো প্রকাশ্য ও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাননি। একজন লেবার সূত্রের ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিলিব্যান্ড ইসরাইল-ফিলিস্তিন পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ সরকারের নীতিতে ‘ব্যাপক পরিবর্তন’ আনার বিষয়টি তুলে ধরতে যাচ্ছেন।
ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের অন্যতম দাবি হলো ইসরাইলি বসতি থেকে পণ্য আমদানির ওপর পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে শুধু পণ্য নয়, বসতিগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সেবা ও ব্যবসায় বিনিয়োগও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনতে হবে এবং তা বাস্তবায়নের জন্য শক্তিশালী আইনগত ব্যবস্থা থাকতে হবে। আয়ারল্যান্ড, স্পেন ও বেলজিয়াসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে ইসরাইলি বসতিগুলোর বিরুদ্ধে একই ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে ব্রিটিশ সরকারি সূত্রগুলোর দাবি, যুক্তরাজ্যের পরিকল্পিত নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর হতে পারে।
ইসরাইলের নতুন ‘ই১’ বসতি প্রকল্পকে ঘিরেও পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জেরুজালেমের পূর্বদিকে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে অধিকৃত পশ্চিম তীর কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যেতে পারে, যা একটি কার্যকর ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে আরো সংকুচিত করবে।
ইসরাইলপন্থী সমালোচকেরা প্রায়ই অভিযোগ করেন, ব্রিটেনের মুসলিম জনগোষ্ঠীর চাপের কারণে মিলিব্যান্ড এই অবস্থান নিয়েছেন। তবে বিভিন্ন জনমত জরিপে এমন দাবির পক্ষে শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায় না। একটি জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ১৬ শতাংশ ব্রিটিশ নাগরিক ইসরাইলি বসতি থেকে পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করেন। লেবার পার্টির ১৪০ জনের বেশি এমপিও বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যে পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞার আহ্বান জানিয়েছেন। চলতি বছরের শুরুতে লেবার সদস্যদের মধ্যে পরিচালিত এক জরিপে ৮৭ শতাংশ নিষেধাজ্ঞার পক্ষে মত দেন। ফলে মিলিব্যান্ডের অবস্থান কেবল দলের একটি অংশের দাবি নয়; তা ব্রিটিশ জনমতের সঙ্গেও অনেকাংশে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
মিলিব্যান্ডের বর্তমান অবস্থান হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। ২০১৪ সালে লেবার নেতা থাকাকালে গাজায় ইসরাইলি সামরিক অভিযানে বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার পর তিনি তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের নীতির কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। সেসময় তিনি প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের ইসরাইলি সামরিক অভিযানের বিষয়ে ‘নীরবতা’র সমালোচনা করেন এবং ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের হত্যার ঘটনায় সরকারের অবস্থানকে ভুল বলে মন্তব্য করেন। একই বছর তিনি একতরফাভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার পক্ষেও অবস্থান নেন। গত বছরও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগকারী মন্ত্রীদের মধ্যে মিলিব্যান্ড অন্যতম ছিলেন বলে সরকারি সূত্রের দাবি।
মিলিব্যান্ডের সাম্প্রতিক পদক্ষেপকে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রনীতির বৃহত্তর পরিবর্তনের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। এর আগে রক্ষণশীল সরকারের সময় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের ইসরাইলবিষয়ক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্রিটেনের অবস্থান নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল। স্টারমার সরকারের আমলে ইসরাইলের বিরুদ্ধে কিছু সীমিত পদক্ষেপ নেওয়া হলেও সেগুলোকে অনেক ক্ষেত্রে অর্ধেক-সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হয়েছে। অস্ত্র রপ্তানিতে সীমিত নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলেও পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়নি। গাজার ওপর নজরদারি কার্যক্রম নিয়েও ব্রিটিশ সরকারের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ অবস্থায় মিলিব্যান্ডের প্রস্তাবিত নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়িত হলে তা শুধু ইসরায়েল-ফিলিস্তিন নীতিতে পরিবর্তনই আনবে না, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে ব্রিটেনের ঐতিহ্যগত ঘনিষ্ঠতারও পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চাপের মুখে ব্রিটিশ সরকার যদি প্রস্তাবিত নিষেধাজ্ঞা দুর্বল করে, তাহলে তা আগের নীতির ধারাবাহিকতা হিসেবেই বিবেচিত হবে। কিন্তু মিলিব্যান্ড ও প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী কঠোর পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করেন, তাহলে তা বিশ্বমঞ্চে ব্রিটেনের আরও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এই কারণে ইসরাইল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে মিলিব্যান্ডের বর্তমান অবস্থানকে শুধু একটি নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়, বরং ব্রিটিশ পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন