প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বর্ষাকালীন ডেঙ্গুর প্রভাব মোকাবেলায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করছে রংপুর বিভাগীয় প্রশাসন। এই ব্যাপারে স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সাধারণ নাগরিকদের সচেতন থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রংপুর বিভাগীয় উপপরিচালক ডা. ওয়াজেদ আলী বলেন, ‘রংপুরে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে গত দেড় বছরে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও কমেছে। তবে এখনো পুরোপুরি ডেঙ্গু জ্বরের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়নি। ডেঙ্গু যেন না হয় সেজন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, মশা নিধন, মশারি টাঙিয়ে ঘুমানোসহ বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আর যদি ডেঙ্গু হয়েই যায় তাহলে চিকিৎসাসেবার জন্য প্রতিটি জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। রক্ত পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কিট সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে।’
ডা. ওয়াজেদ বলেন, মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি ও স্থানীয় প্রশাসন সক্রিয় ভূমিকা পালন করলে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যুর হার কমিয়ে আনা সম্ভব।
স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, সারাদেশে বর্ষা শুরুর সাথে সাথে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ বাড়তে শুরু করলেও রংপুর অঞ্চলে এখনো ডেঙ্গুর বড় কোনো প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়নি। তবে, ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় এডিস মশার ঘনত্ব এবং ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় রংপুরে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
এই পরিস্থিতিতে যে কোনো ধরনের বড় বিপর্যয় এড়াতে স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং সাধারণ নাগরিকদের আগাম সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়েছে রংপুর স্বাস্থ্য বিভাগ।
বর্ষাকালে ঝোপঝাড়ে মশার প্রজনন বৃদ্ধি পায়। এসব মশা থেকে নানা ধরনের রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই সবাইকে সতর্ক থাকার জন্য চিকিৎসকরা আহ্বান জানিয়েছেন।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, রংপুর বিভাগে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা অন্যান্য বিভাগের তুলনায় কম। তবে বর্ষা মৌসুমের এই সময়ে যে কোনো মুহূর্তে পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। বিশেষ করে ঢাকা কিংবা অন্যান্য আক্রান্ত অঞ্চল থেকে যাতায়াতকারীদের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে এডিস মশার বংশ বিস্তারের ঝুঁকি রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে ডেঙ্গুর ধরন বদলেছে। ডেঙ্গু একদিকে যেমন ভয়ংকর হয়ে উঠছে, তেমনি শহর ছাড়িয়ে ঝুঁকি বাড়িয়েছে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও। কমবেশি সারা বছরই ডেঙ্গু আক্রান্তের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। বাড়ির আশপাশে ডাবের খোসা, টায়ার, ফুলের টব বা যে কোনো পরিত্যক্ত পাত্রে যেন তিন দিনের বেশি পানি জমে না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রোগী বাড়লে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড চালু করার মতো প্রাথমিক প্রস্তুতি তাদের রয়েছে।
রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট মাহফুজ উন নবী চৌধুরী ডন জানান, ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে গত ২৫ জুন থেকে মাসব্যাপী বিশেষ মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি শুরু হয়েছে। শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে এডিস মশার বিস্তার রোধ ও লার্ভা ধ্বংস করার জন্য এই ক্রাশ প্রোগ্রাম পরিচালনা করা হচ্ছে।
রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে দুই বছরে রংপুরের আট জেলায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে সরকারি মেডিক্যালে মারা গেছেন ১৪ জন। এর বাইরে বেসরকারি মেডিক্যাল ও বাড়িতেও মৃত্যু হয়েছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২ সালে রংপুর বিভাগের আট জেলায় ডেঙ্গু জ্বরে মোট আক্রান্ত রোগী ছিল ২৬৫ জন। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন দিনাজপুরের এম আব্দুর রহিম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১৪৭ জন এবং রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৫৪ জন। এর বাইরে ঠাকুরগাঁও হাসপাতালে ১০ জন, নীলফামারী হাসপাতালে ৩২ জন, পঞ্চগড় হাসপাতালে নয় জন, লালমনিরহাটে সাত জন, কুড়িগ্রামে চার জন এবং গাইবান্ধায় দুই জন।
২০২৩ সালে এ বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল পাঁচ হাজার ৪৯৪ জন। মৃত্যু হয়েছিল ১২ জনের। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ছিল দিনাজপুরে পাঁচ জন। এরপর রংপুরে চার জন, গাইবান্ধায় দুজন ও লালমনিরহাটে একজন। ওই বছর বেশি রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন রংপুরে ১ হাজার ২৯৫ জন। এরমধ্যে স্থানীয়ভাবে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৪৬০ জন।
এছাড়া গাইবান্ধায় এক হাজার ৪৪ জন, দিনাজপুরে ৮৮৩ জন, নীলফামারীতে ৭৬৫ জন, কুড়িগ্রামে ৭০৮ জন, লালমনিরহাটে ৩০৩ জন, ঠাকুরগাঁওয়ে ৩০৯ জন এবং পঞ্চগড়ে ১৮৭ জন।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত আট জেলায় মোট আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ৪৭২ জন। এর মধ্যে বেশি রোগী দিনাজপুরে ৩৪৪ জন, নীলফামারীতে ৩০১, কুড়িগ্রামে ২১৭, গাইবান্ধায় ১৪৬, রংপুরে ১৯৭, লালমনিরহাটে ৬৩, ঠাকুরগাঁওয়ে ৭৭ এবং পঞ্চগড়ে ১১৮ জন। মৃত্যু হয়েছে দুজনের। এর মধ্যে গাইবান্ধায় একজন এবং নীলফামারীতে একজন।
২০২৫ সালে আট জেলায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ১১৮৭ জন। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী ছিল দিনাজপুরে ২৫৬ জন। এরপর রংপুরে ২৪৪ জন, নীলফামারীতে ২০৭ জন, গাইবান্ধায় ১৬২ জন, ঠাকুরগাঁওয়ে ৯৯ জন, লালমনিরহাটে ৯৬ জন এবং কুড়িগ্রামে ৩৫ জন। এ বছর কোনো রোগীর মৃত্যু হয়নি।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত বিভাগের আট জেলায় ৪৪ জন রোগী ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হন। এরমধ্যে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ জেলায় মোট ১১ জন, গাইবান্ধায় ১০ জন, লালমনিরহাট ও নীলফামারীতে আটজন, দিনাজপুরে চারজন এবং ঠাকুরগাঁওয়ে তিনজন। এই সময়ের মধ্যে ৩৭ জন রোগী চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন এবং কোনো মৃত্যু হয়নি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন