প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়নের লক্ষ্যে যোগাযোগ অবকাঠামো শক্তিশালী করতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬০ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন। বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ ছিল ৪৮ হাজার ২৯২ কোটি টাকা।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেলে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী এই বিশাল অঙ্কের টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব উত্থাপন করেন।
সড়ক ও সেতু অবকাঠামো বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা, যোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ এবং নগর পরিবহন ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে সরকার।
একইসঙ্গে নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও প্রযুক্তিনির্ভর পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, এর মধ্যে মহাসড়ক উন্নয়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডোর চার লেনে উন্নীতকরণ এবং সমন্বিত যোগাযোগ কাঠামোর মাধ্যমে একটি মাল্টিমোডাল হাব গড়ে তোলা।
সড়ক নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে ৯৪টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ‘সেফটি সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ ভিত্তিক বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পের কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হয়েছে।
তিনি বলেন, পাশাপাশি অটোমেটেড ফিটনেস সার্টিফিকেট ব্যবস্থা ও পেশাজীবী চালকদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও জোরদার করা হচ্ছে। প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার জাতীয় এক্সপ্রেসওয়ে গ্রিড গড়ে তুলতে সম্ভাব্য করিডোর চিহ্নিত করা হয়েছে।
ঢাকার যানজট নিরসনে রিং রোড ও রেডিয়াল রোড নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ছয়টি মেট্রোরেল লাইনের সমন্বয়ে আধুনিক গণপরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগও রয়েছে।
পুরোনো বাস পর্যায়ক্রমে ইলেকট্রিক বাস দ্বারা প্রতিস্থাপন, দ্বিতীয় যমুনা সেতু, তৃতীয় মেঘনা সেতু এবং ঢাকা–চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
ইলেকট্রনিক টোল ও স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রেলপথের বিষয়ে আরেক বার আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, নিরাপদ, আধুনিক ও দক্ষ রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার রেলওয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তঃদেশীয় সংযোগ সম্প্রসারণে বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে।
একইসঙ্গে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে রেলপথকে অধিক কার্যকর ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলার লক্ষ্যে সকল জেলাকে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনে।
বন্দরসমূহের সঙ্গে রেল সংযোগ সম্প্রসারণ, আধুনিক লোকোমোটিভ, ক্যারেজ ও ওয়াগন সংগ্রহ, সৈয়দপুর ও পাহাড়তলী রেলওয়ে ওয়ার্কশপের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয়ভাবে কোচ ও লোকোমোটিভ সংযোজন, ডুয়াল গেজ ডাবল লাইন নির্মাণ ও আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা চালু করার মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
এছাড়া, ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন ও উচ্চগতির রেল সংযোগ চালুর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, ঢাকা–চট্টগ্রাম রেলপথের ঢাকা–কুমিল্লা অংশে কর্ডলাইন নির্মাণ করা হবে, যার ফলে এ পথের দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার কমে আসবে।
একইসঙ্গে ঢাকা–চট্টগ্রাম রেলওয়ে করিডোর প্রতিষ্ঠা এবং চট্টগ্রামকে লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
নৌপথ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যয়-সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও দক্ষ পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার নৌপরিবহন খাতের অবকাঠামো উন্নয়ন, বন্দর আধুনিকায়ন এবং অভ্যন্তরীণ নৌপথের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে।
নৌপরিবহন খাতের অবকাঠামো উন্নয়ন ও অভ্যন্তরীণ নৌপথের উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে।
ড্রেজিং কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং কন্টেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিং দক্ষতা উন্নয়ন, নদীবন্দর ও লঞ্চঘাট আধুনিকায়ন, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর বাস্তবায়নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ট্রান্সশিপমেন্ট সক্ষমতা বৃদ্ধি।
মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজন, জেটি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন এবং কার্গো হ্যান্ডলিং কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বে-টার্মিনাল, পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল ও লালদিয়া কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে ড্রেজিং ও খনন কার্যক্রম জোরদার করে নৌপথ সচল রাখার উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়েছে।
এরপর বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন খাতের বিষয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে রূপান্তর এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বেসামরিক বিমান চলাচল খাতে সমন্বিত উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এর মধ্যে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রধান এভিয়েশন হাবে উন্নীত করার উদ্যোগ এবং জাতীয় এয়ার কানেকটিভিটি গ্রিড গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে পূর্ণাঙ্গ লজিস্টিকস ও যাত্রী হাবে উন্নীতকরণ এবং কক্সবাজার, যশোর, রাজশাহী ও সৈয়দপুরকে আন্তর্জাতিক গেটওয়ে হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও আছে।
এছাড়া, বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি আধুনিক উড়োজাহাজ ক্রয়ের লক্ষ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের পাশাপাশি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল শিগগিরই চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিমানবন্দরের প্রায় ৯৪ হাজার বর্গমিটার এলাকায় ওয়াইফাই নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, পর্যটন খাতকে জিডিপিতে ৬-৭ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছে এবং বৃহৎ পর্যটন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই খাতে পর্যটক আকৃষ্ট করা ও বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার লক্ষ্য নিয়ে বিনিয়োগ রোডম্যাপ প্রণয়ন করা হচ্ছে।
এছাড়া, বাংলাদেশ বিমানের আন্তর্জাতিক সংযোগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি যাত্রীসেবা ও কার্গো ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, সরবরাহ ব্যবস্থা ইত্যাদির গুরুত্ব বিবেচনায় যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন বাবদ আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬০ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব পেশ করছি।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট বরাদ্দ ছিল ৪৮ হাজার ২৯২ কোটি টাকা। এর আগে, বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেল ৩টার দিকে জাতীয় সংসদে স্পিকার ড. হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বাজেট উত্থাপন শুরু করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। তার আগে সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়।
প্রসঙ্গত, ১৯৭২ সালে ৭৮৬ কোটি টাকার বাজেট দিয়ে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ। পাঁচ দশকের বেশি সময়ের এই যাত্রায় দেশের অর্থনীতির পরিধি যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে উন্নয়ন কর্মসূচি ও রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের আকারও।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের পর বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম বাজেট এটি। বিশাল নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রতিগুলো পূরণে দেশের ইতিহাসে এবার সবচেয়ে বড় বাজেট তৈরি করেছে সরকার।
টাকার অঙ্কে প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। বিরাট এই বাজেটে মোট রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা।
বাকি অর্থ সংগ্রহ করা হবে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা থেকে। বাজেট ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। ব্যয় সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও দক্ষ পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার নৌপথের অবকাঠামো উন্নয়ন ও সম্পূরক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে, যা দেশের যোগাযোগ পেশার উন্নয়নে সহায়তা করবে।
নতুন এ বাজেটের মাধ্যমে সরকারের লক্ষ্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনা, ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বাংলাদেশকে ‘ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির’ পথে এগিয়ে নেওয়া।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন