প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বেইজিং বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে।
গতকাল বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এ প্রস্তাবটি দেওয়া হয়।
বৈঠক শেষ হওয়ার পর বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই হোটেলে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন এ তথ্য দেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চারদিনের চীন সফরের শেষে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতেও এ তথ্য প্রকাশ পায়।
মালয়েশিয়া ও চীন সফরের উদ্দেশ্যে গত ২১ জুন ঢাকা ত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রথমে মালয়েশিয়া সফর শেষ করে ২২ জুন চীনে যান তিনি। সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এই সফরটি ছিল তার প্রথম সরকারি সফর এবং গতকাল রাতে তিনি বেইজিং থেকে দেশে ফিরে আসেন।
বেইজিংয়ে সংবাদ সম্মেলনে মাহদী আমিন বলেন, ‘কানেক্টিভিটি নিয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি ইকোনমিক করিডোর তৈরির প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। এই ইকোনমিক করিডোরের মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের অর্থনীতির ব্যাপ্তি বাড়ানো, ট্রানজ্যাকশনের বৃদ্ধি, এবং মাল্টিমোডাল পরিবহণের উন্নয়ন ঘটানো।’
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র জানায়, চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়নে চীন কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তিনি বলেন, ‘আমরা কীভাবে এই বন্দরের আধুনিকায়ন করে এটিকে একটি রিজিওনাল হাব হিসেবে তৈরি করতে পারি—যেটি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, অন্যান্য দেশের জন্যও সার্ভ করবে—এ বিষয়ে আমরা কাজ করতে চাই।’ একইসঙ্গে মোংলা পোর্টের উন্নয়ন ও আরো বেশি প্রগ্রেসিভ এবং সার্ভিস-ওরিয়েন্টেড করার জন্যও চীন আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
চীন সফরের শেষ দিন গতকাল স্থানীয় সময় সকালে, বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব পিপলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রশংসা করেন চীনের প্রেসিডেন্ট, এবং বাংলাদেশের উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদী সহযোগিতার আশ্বাস দেন। বৈঠকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানসহ উভয় দেশের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকের বিস্তারিত তুলে ধরে মাহদী আমিন বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে পিপল টু পিপল কানেক্টিভিটি জোরদার করতে চাই। সংস্কৃতি, মিডিয়া, প্রযুক্তি, সামগ্রিকভাবে জ্ঞান স্থানান্তর এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি নিয়ে উভয় দেশের মধ্যে সম্পর্ক আরও বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘শিক্ষা ব্যবস্থায় তৃতীয় ভাষা হিসেবে ম্যান্ডারিন ভাষাকে প্রায়োরিটাইজ করা হচ্ছে এবং টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল এডুকেশনকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। চীন এই দুই ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের সহায়তা করতে ইচ্ছুক। চীনা ভাষা শিক্ষার জন্য তারা আমাদের শিক্ষক ও অবকাঠামো সহায়তা দেবে।’
ভিসা প্রসেসিং সহজীকরণের বিষয়ে চীন সরকার সহযোগিতা করবে বলে জানান মাহদী আমিন। তিনি বলেন, ‘হেলথকেয়ারের ক্ষেত্রে আমরা কীভাবে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি, বিভিন্ন ধরনের রোবটিক সার্জারি এবং হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয়ে চীন তাদের আগ্রহ প্রকাশ করেছে।’ বাংলাদেশ থেকে অনেকেই বিদেশে চিকিৎসা নিতে যান। এ ক্ষেত্রে চীন ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করে বাংলাদেশীদের জন্য তাদের দ্বার উন্মোচন করতে ইচ্ছুক।
মাহদি আমিন রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে চীনের সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান খুব স্পষ্ট। আমরা চাই, তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। এ বিষয়ে কোনো সংলাপের প্রয়োজন হলে চীন আমাদের সহযোগিতা করতে ইচ্ছুক।’
তিনি আরো বলেন, ‘পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়েছে। আগামী দিনে এ বিষয়ে দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের মধ্যে নিয়মিত ভিত্তিতে ডায়ালগ শুরু হবে। এই বিষয়ে বিস্তারিত কার্যক্রম আছে।’
ব্রিকসে বাংলাদেশের যোগদানের ইচ্ছাকে চীন স্বাগত জানিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন মাহদী আমিন। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি জাহিদুল ইসলাম রনি উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী তার চীন সফরের শেষ দিনটা দেশটির ঐতিহাসিক তিয়েনআনমেন স্কয়ারে অবস্থিত স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শুরু করেন। চীনের স্থানীয় সময় সকাল সোয়া ৯টায়, তিনি দেশটির বীরদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এ সময় দুই দেশের জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয় এবং বিউগলে বাজানো হয় করুণ সুর। পুষ্পস্তবক অর্পণের পর প্রধানমন্ত্রী কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে চীনের বিপ্লবী বীরদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। এরপর গ্রেট হল অব দ্য পিপলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাউ লেজির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
বেইজিংয়ে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) ইতিহাস ও ঐতিহ্যবাহী জাদুঘরও পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি সিপিসির জাদুঘর পরিদর্শনে যান। জাদুঘরের কিউরেটর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান এবং পুরো জাদুঘরটি ঘুরিয়ে দেখান। প্রধানমন্ত্রী তার সফরসঙ্গীদের নিয়ে জাদুঘরের গ্যালারিগুলো ঘুরে দেখেন এবং একটি ইমার্সিভ অডিও-ভিজুয়াল কোস্টার শো উপভোগ করেন। পরিদর্শন শেষে জাদুঘরের পরিদর্শন বইয়ে স্বাক্ষর করেন।
এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি; প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, হুমায়ুন কবির, মাহদী আমিন; প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন প্রমুখ।
প্রধানমন্ত্রী তার ছয়দিনের চীন ও মালয়েশিয়া সফর শেষে গতকাল রাতে বেইজিং থেকে দেশে ফিরেছেন। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সফরসঙ্গীদের বহনকারী ফ্লাইট বাংলাদেশ সময় রাত পৌনে ৮টায় ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। সেখানে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান সরকারের মন্ত্রিপরিষদের কয়েকজন সদস্য, উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য এবং সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন