প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বিদেশ সফর করতে গিয়ে একের পর এক নতুন পদক ও সম্মাননা আহরণ করে ঝুলি ভারী করছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ২৭ থেকে ২৯ জুন সেশেলস সফরকালে তিনি লাভ করেছেন গার্ডিয়ান অব দ্য ব্লু হরাইজন নামক একটি ট্রফি ও সম্মাননা। তবে এই নতুন পদকপ্রাপ্তি বিশ্বমঞ্চে প্রশংসার চেয়ে অধিক কৌতুক এবং সমালোচনা কুড়িয়েছে। কারণ, মোদির সফরের মাত্র তিন দিন আগে দ্রুতগতিতে এই পুরস্কার তৈরি করা হয় এবং এর সার্টিফিকেটটি বানান ভুলে ভরা ছিল।
পুরস্কার প্রদানকারী দেশটি নিজেদের নামই ভুল করে লিখেছে, রিপাবলিক অব সেশেলসের বদলে লেখা হয়েছে রিপাবলিক অব সেশেলিস। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে মোদির এই পদক কূটনীতির পেছনের আসল রহস্য উন্মোচন করা হয়েছে।
সেশেলসের প্রেসিডেন্ট প্যাট্রিক হারমিনি মোদিকে পরিবেশবান্ধব অবদানের জন্য পদকটি প্রদান করলেও, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ছবিগুলি প্রকাশ পেতেই শুরু হয় তীব্র সমালোচনা। শুধুমাত্র বানান ভুলই নয়, বিভিন্ন সফটওয়্যার ব্যবহারের মাধ্যমে পরীক্ষা করে দেখা গেছে সার্টিফিকেটটি মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দ্বারা তৈরি।
এরেই প্রেক্ষাপটে ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেসের নেত্রী সুপ্রিয়া শ্রীনাতে মন্তব্য করেছেন, বিশ্ব এখন মোদিকে চিনে গেছে, যেকোনো একটি পুরস্কারের লোভ দেখে দৌড়ে চলে আসবেন, এতটাই তাড়াহুড়ো ছিল যে সেশেলস নিজেদের দেশের নামটাই ভুল লিখে ফেলেছে। তীব্র বিতর্কের মুখে সেশেলস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকাশ করেছে যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যে বিষয়টি ছড়িয়েছে সেটি একটি ওয়ার্কিং ড্রাফট বা খসড়া ছিল, আসল সনদটি নির্ভুল।
বিশেষ করে মোদির জন্য তৈরি হয় বিশেষ পদক। যুক্তরাজ্যের ওয়েস্টমিনস্টার ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক নিতাশা কাউল আলজাজিরাকে বলেন, এই পুরস্কারগুলোর সঙ্গে ভারতের বৈদেশিক কূটনীতির কোনো সম্পর্ক নেই, এগুলো একমাত্র মোদির ব্যক্তিগত ইমেজ তৈরির প্রচারণা। তার ১২ বছরের শাসনামলে মোদি ৩০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন, যার অনেকগুলোই বিশেষভাবে তার সফরের ঠিক আগে তৈরি হয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে মোদির ইসরায়েল সফরের ঠিক আগে সেখানে পার্লামেন্টের স্পিকার অব দ্য নেসেট মেডেল নামক একটি সম্পূর্ণ নতুন পুরস্কার তৈরি করা হয়, যা মোদি ছাড়া এখন পর্যন্ত আর কোনো বিশ্বনেতা পাননি। গত জুন মাসে স্লোভাকিয়া সফরকালে মোদিকে সে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা অর্ডার অব দ্য হোয়াইট ডাবল ক্রস ফার্স্ট ক্লাস দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া, ইন্দোনেশিয়া সফরেও তিনি বিনতাং আদিপূর্ণা পদক পেয়েছেন।
ফিলিপ কোটলার পুরস্কারের অদ্ভুত ইতিহাসও রয়েছে। ২০১৯ সালে মোদি ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং সামিটের প্রথম ফিলিপ কোটলার প্রেসিডেন্সিয়াল অ্যাওয়ার্ড পান, যা প্রতি বছর বিশ্বনেতাদের দেওয়ার কথা থাকলেও মোদির পর গত সাত বছরে আর কোনো বিশ্বনেতাকে এই পদক দেওয়া হয়নি।
ভিন্নমত ব্যক্ত করতে গিয়ে মোদি ও তার দল বিজেপি সবসময় দাবি করে, এই আন্তর্জাতিক পদকগুলো ১৪০ কোটি ভারতবাসীর সম্মান। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা এতে কোনো কূটনৈতিক বা অর্থনৈতিক সুবিধার চিহ্ন পান না। অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ইয়ান হল বলেন, নয়াদিল্লি যুক্তি দিতে পারে যে এগুলো বিশ্বমঞ্চে ভারতের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের প্রমাণ, কিন্তু সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক বা কৌশলগত স্বার্থে এর কোনো বাস্তবিক অবদান নেই। বরং এটি প্রমাণ করে যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী আসল কাজের চেয়ে নিজেদের প্রচারণায় বেশি মনোযোগী।
মোদির জীবনীকার নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের মতে, এই পুরস্কারের মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের ভক্ত ও ভোটারদের কাছে নিজেকে একজন বিশ্বনেতা হিসেবে জাহির করা। তবে সেশেলসের মতো দেশগুলোতে দ্রুত বানান ভুল এবং এআই দ্বারা তৈরি সার্টিফিকেট গ্রহণের এই প্রবণতা আন্তর্জাতিক মহলে ভারতকে সম্মানিত করার চেয়ে বেশি হাস্যরসের খোরাক যোগাচ্ছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন