প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পালটাপালটি হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আবার বেড়ে যাওয়ার ব্যাপারে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পূর্বেই বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গত মাসে স্বাক্ষরিত সমঝোতার (এমওইউ) শর্তগুলো ওয়াশিংটন আর মানবে না। শনিবার ইরানও এমওইউ সম্পর্কে একই অবস্থানের কথা জানিয়ে দিয়েছে এবং মার্কিন বাহিনীকে সতর্ক করে দিয়েছে যে, তারা যদি দু-তিন দিন হামলা চালাতে থাকে, তবে তেহরান 'সর্বাত্মক অভিযান' শুরু করবে।গ্রাফিস্পেনযুক্তরাষ্ট্র শনিবার টানা সপ্তম দিনের মতো ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে, পারস্য উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও দেশটির বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে ইরান। গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে এমওইউ সই করেছিল। এতে বিভিন্ন ফ্রন্টে সংঘাত বন্ধ করা, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা, মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার এবং আগামী ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তির উদ্দেশ্যে আলোচনা চালানোর প্রতিশ্রুতি ছিল। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, ২২ জুন সুইজারল্যান্ডে মধ্যস্থতাকারী কাতার ও পাকিস্তানের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের নেতা ও কর্মকর্তারা আলোচনায় বসেন। বৈঠকের পরপরই দুই দেশের মধ্যে নতুন করে পালটাপালটি হামলা শুরু হয় এবং থেমে থেমে তা অব্যাহত ছিল। কিন্তু গতকাল আবারও টানা সপ্তম দিনের মতো ইরানে হামলা চলে। ইরান জানাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে শুধু সামরিক লক্ষ্যবস্তু নয়, বিমানবন্দর, রেলস্টেশন ও সেতুসহ গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোকেও নিশানা করছে। এই নতুন সংঘাত শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় অন্তত ৫০ জন নিহত হয়েছে। এদিকে, শুক্রবার জর্ডানে ইরানের হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার খবর দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গত মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে হুঁশিয়ারি দেন যে, আলোচনা না ফিরলে তারা বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে হামলা জোরদার করেছে। এসব ঘটনায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি একটি লিখিত বিবৃতিতে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বারবার সমঝোতা স্মারকের শর্ত লঙ্ঘন করছে। এর ফলে প্রমাণিত হয়, মার্কিন প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর 'মূল্যহীন ও অকার্যকর'। এদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার জ্যেষ্ঠ সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা যদি আরও দু-তিন দিন অব্যাহত থাকে, তাহলে তেহরান সর্বাত্মক অভিযান আবার শুরু করবে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) শুক্রবার রাতে টানা সপ্তম দিনের হামলায় তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ইরানের নজরদারি ব্যবস্থা, সামরিক রসদ অবকাঠামো, ভূগর্ভস্থ অস্ত্রভান্ডার ও নৌবাহিনীর অবকাঠামোকে নিয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টে বলা হয়েছে, হরমোজগান প্রদেশে সর্বশেষ মার্কিন হামলায় তিনজন নিহত ও আটজন আহত হয়েছে। ওই হামলায় দুটি সেতু, একটি সড়ক সুড়ঙ্গ ও টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে ১১৬টি টেলিযোগাযোগ টাওয়ার অচল হয়ে পড়েছে। মার্কিন হামলার জবাবে ইরান কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডানে হামলা চালিয়েছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানায়, কুয়েতের একটি তেল স্থাপনা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালানো হয়েছে। কুয়েতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার জন্য কয়েকটি উৎপাদন ইউনিট বন্ধ করতে হয়েছে। এছাড়া বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের শেখ ইসা বিমানঘাঁটির বিমান আশ্রয়কেন্দ্র, জ্বালানি সংরক্ষণাগার ও সংযোগকারী সেতুর ওপর হামলাও হয়েছে। এক্ষেত্রে জর্ডানের আল-আজরাক ঘাঁটির জ্বালানি ট্যাংকের ওপর হামলা করেছি বলে দাবি করেছে দেশটি। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় তিন মাস পর শুক্রবার প্রথমবার সৌদি আরবে হামলা চালিয়েছে ইরান। রিয়াদের কাছে আল-খারজে প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি এবং লোহিত সাগরের উপকূলের ইয়ানবু এলাকায় সতর্ক সংকেত বেজেছে। জানা গেছে যে, আল-খারজের ওই ঘাঁটিতে মার্কিন সেনারা অবস্থান করছে। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ বা ইরান হামলার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। আলজাজিরার খবরে বলা হয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন-ইসরাইলি হামলা শুরুর পর প্রথম পর্যায়ে ১৩ মার্কিন সেনা নিহত হয়। এরপর এক বিমান দুর্ঘটনায় পাইলটের মৃত্যু হয়। জর্ডানে নিহত দুজনসহ মোট নিহতের সংখ্যা বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ১৬। ইরানের খুজেস্তান প্রদেশের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ দিনে যুক্তরাষ্ট্র ১২টি শহরের ৯৫ স্থানে হামলা চালিয়েছে, ফলে অন্তত ৮ জন নিহত হয়েছেন। এই হামলার ফলে বিদ্যুৎ স্থাপনা ও পানি শোধনাগারের পাম্পে হামলা হওয়ার কারণে দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি গ্রামের সুপেয় পানির সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, নতুন করে সংঘাতের শুরুতে ৬ জুলাই থেকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় অন্তত ৫০ মানুষ নিহত এবং ৫০০-এর বেশি মানুষ আহত হয়েছে। আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাজেম গারিবাবাদি, ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী, জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারকের সব প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে চলেছে। এই কারণে তেহরানও ওই সমঝোতার আওতাধীন সব অঙ্গীকার স্থগিত করেছে। খুব দ্রুত যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পালটাপালটি হামলা এখন এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা । ইরানে টানা হামলার প্রভাব ও মাত্রা প্রতিদিন বেড়ে যাচ্ছে। আর ইরানও উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালিয়ে প্রতিউত্তর দিচ্ছে। তিন মাসের মধ্যে প্রথমবার সৌদি আরবে হামলা হয়েছে এবং সিরিয়ায়ও প্রথম হামলার খবর পাওয়া গেছে। কাতারভিত্তিক আরব পারস্পেকটিভস ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক জেইদান আলকিনানি আলজাজিরাকে বলেন, যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি খুব উদ্বেগজনক। এটি ধীরে ধীরে আরো বিশাল সংঘাতে রূপ নিচ্ছে। আলকিনানির মতে, যুদ্ধ বন্ধে জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক কোনো সংগঠনের উদ্যোগের অনুপস্থিতি এবং আঞ্চলিক মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতা অভাব খুবই উদ্বেগের বিষয়।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন